আশ্চর্য ধৈর্য মকবুলের! এরপরেও তাই সে ঝাঁপ দিয়ে পড়েনি ইদ্রিশ মিয়ার ঘাড়ের উপর, চড়চড় করে টেনে ছিঁড়ে দেয়নি তার মেহেদি-রাঙানো দাড়িগুলো। শুধু রক্তচোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিঃশব্দে চলে এসছে সামনে থেকে।
সুধাকর জানে, সবই জানে। বুঝতে পারে দিনের পর দিন কী অসহ্য হিংস্রতায় মকবুলের বুকের ভেতরটা জ্বলে যেতে থাকে। কিন্তু সহানুভূতি বোধ করা ছাড়া আর কীই-বা উপায় আছে তার। তার নিজের ঘরের মেঝেতে যে মেটেহাঁড়িটা পোঁতা রয়েছে, বড়োজোর চার গন্ডা টাকা মিলতে পারে তার ভেতর। কিন্তু পাঁচকুড়ি তার থেকে অনেক দূরে।
মকবুল বললে, তার চাইতে শহরে যাওয়াই ভালো। স্টিমারঘাটে মুটের কাজ করলেও পাঁচকুড়ি টাকা জমে যাবে এক বছরে।
তা হয়তো যাবে। কিন্তু ততদিন রোকেয়া বিবি তোমার জন্যে পথ চেয়ে বসে থাকবে না।
থাকবে না? মকবুলের দৃষ্টি হিংস্র হয়ে উঠল, না থাকে বয়ে গেল। আরও অনেক রোকেয়া জুটে যাবে দুনিয়ায়!
এইটে কিন্তু একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে ভাই। এত দুঃখেও হাসি এল সুধাকরের, মেয়ে হয়তো গন্ডা গন্ডা জুটবে, কিন্তু রোকেয়া বিবি দুটি জুটবে না।
মকবুল ছাড়া এত বেশি করে আর কে জানে সেকথা? এমন করে আর কে সেটা অনুভব করে রক্তে রক্তে, নাড়িতে নাড়িতে?
কিছুক্ষণ চুপচাপ। জোয়ারের জল কল্লোল তুলছে। ইটের পাঁজার ওপরে একটা সবুজ লতা দুলছিল, আস্তে আস্তে ঢুকতে লাগল ফাটলের ভেতরে। লাউডগা সাপ একটা।
ও মাঝি, কেরায়া যাবে?
আচমকা ডাক উঠল, যেন মাটি খুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়াল একটা লোক। গায়ে ছিটের শার্টের ওপরে একখানা গামছা, এক হাতে পুঁটলি আর এক হাতে জুতো এক জোড়া।
মকবুল উঠে পড়ল, ওই নাও তোমার সওয়ারি এসে গেছে।
যেমন হঠাৎ এসেছিল, তেমনি হঠাৎ লাফিয়ে নেমে পড়ল নৌকা থেকে। তারপর ডাঙা ধরে হাঁটতে শুরু করে দিলে।
সুধাকর ভ্রকুটি করল। যদিও সওয়ারির জন্যেই সকাল থেকে সে অপেক্ষা করে আছে, তবু মনে হল যেন এ সময়ে না এলেই ভালো করত লোকটা। কেমন বিশ্রীভাবে রসভঙ্গ করে দিলে।
লোকটা আবার অধৈর্যভাবে বললে, যাবে নাকি কেরায়া?
কেন যাব না? যাওয়ার জন্যেই তো বসে আছি। কোথাকার কেরায়া?
মুরাদপুর।
দেড় টাকা দেবেন। দেড় টাকা?
এই তিন মাইল রাস্তা দেড় টাকা?
তবে অন্য নৌকা দেখুন।
কিন্তু লোকটা বোকার মতো এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে রাজি নয়। দশ জায়গায় দর করে বেড়ানোর চাইতে এক জায়গায় দামদস্তুর করাই ভালো। রফা হল এক টাকায়।
সওয়ারি তুলে নিয়ে সুধাকর যখন নৌকা ভাসাল, তখন তার চোখে পড়ল মকবুল জলে ছিপ ফেলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে আছে।
জোয়ারের জলে মাছ উঠবে না, তা ছাড়া মাছের দরকারও নেই ওর। তবু!
২.
কিন্তু মকবুলের জন্যে মিথ্যে দুঃখ করে কী হবে সুধাকরের? তার নিজের কথাই কি সে ভাববার সুযোগ পেয়েছে এ পর্যন্ত?
ওপরে আকাশ, নীচে গাং, মাঝখানে ডিঙি। সুধাকরের জীবনে এ ছাড়া কোথায় কী আছে আর? ঘর আছে, সে ঘরে থাকে তার বুড়ি পিসি। সে-ই চারদিক আগলে রাখে, যক্ষের মতো পাহারা দেয় কয়েকটা সুপুরি গাছ। রাত্রে কান পেতে থাকে পুকুরের দিকে। মাছেরই দেশ, তবু লোকের স্বভাব যাবে কোথায়? চুরি করতে না পারলে পেটের ভাত যাদের হজম হয় না–রাতবিরেতে তারা আসে। ঝপাং করে জাল ফেলে পুকুরে—মোচা চিংড়ি, পোনা মাছ, কাঁকড়া যা পায় তাই নিয়েই পালায়। পুকুর-ভরতি কলের কাঁটা ফেলেও নিস্তার নেই তাদের হাত থেকে। তাই বুড়ি সারারাতই কানখাড়া করে থাকে, জলে একটা গোসাপ পড়লেও হুড়মুড় করে ছুটে যায় ঠ্যাঙা নিয়ে। আর সারারাত পড়ে কফফলের মন্ত্র :
কফফল, কফফল, কফফল—
চোরের রাত্তির নিষ্ফল!
সাপা, চোরা, বাঘা না-বাড়াইয়ে পাও—
যদ্দূরে যায় কফফলের রাও!
কিন্তু কফফলকে পাহারা দেওয়ার দরকার হয় না। বুড়ি একাই যথেষ্ট।
এক-একদিন চটে যায় সুধাকরের ওপর। প্রাণখুলে গাল দিতে শুরু করে।
বিয়ে করবে না, সংসার করবে না, রাতদিন নৌকা আর নৌকা। আমারই-বা এমন কোন দায়টা ঠেকেছে সংসার আগলে থাকার? আমারও শ্বশুরবাড়ি আছে, ঘরদোর আছে। একদিন চলে যাব সেখানেই।
শুনে সুধাকরের হাসি পায়।
যাও-না, সেখানেই যাও।
যাবই তো। ভয় করি নাকি তোকে?
আমাকে ভয় করবে কেন খামোখা? কিন্তু আমি বলছিলাম কে আছে তোমার শ্বশুরবাড়িতে? সব তো কবে মরে হেজে শেষ হয়ে গেছে। গিয়ে দ্যাখো, ভিটের ওপর এখন শেয়াল চরে বেড়াচ্ছে, ডিম পাড়ছে গোখরো সাপে।
তা হোক, তা হোক। তবু এই অলক্ষীর সংসারের চাইতে সেই জঙ্গলই আমার ঢের ভালো।
সুধাকর জানে বুড়ি কোনোদিন যাবে না, সে-প্রশ্ন ওঠেও না। তবু মধ্যে মধ্যে তারও কি মনে হয় না এ তার অলক্ষীর সংসার? বউ আসবে, ধানের পালা সাজাবে, চিড়ে কুটবে চেঁকিতে, শাঁখ বাজাবে সন্ধে বেলায়, বাড়ি ফিরলে মুখ ধোয়ার জলের ঘটি আর গামছা এগিয়ে দেবে, আর যখন রাত হবে…
যখন রাত হবে, তখন এই ভাঙা ঘরকেই মনে হবে যেন সায়েস্তাবাদের নবাববাড়ি। খড়ের ওপরে ছেঁড়া কাঁথার বিছানায় নেবে আসবে স্বর্গ। একটা রাত শেষ হয়ে যাবে এক পলকে সুপুরি বনের মাথার ওপর থেকে এক ডুবে চাঁদটা নদীর ওপারে গিয়ে ভেসে উঠবে।
কিন্তু সে আর হয় না। সুর কেটে গেছে।
মকবুলের মতো নয়, তার কারণ অন্য।
