চাচার কথা! কেমন চমকে উঠল মকবুল। তার চাচা জয়নালও একদিন গ্রাম-দেশ ছেড়ে শহরে গিয়েছিল। দিন কয়েক ঘোরাঘুরি করেই পেয়ে গেল রিকশা টানার কাজ। তারপরে মনে হত জয়নালের মতো সুখী বুঝি বিশ্বসংসারে কেউ নেই। সারাদিনে রোজগার বেশ ভালোই হয়, মালিকের জমার পয়সা মিটিয়ে দিয়েও বেশ উদবৃত্ত থাকে হাতে। তাই থেকে প্রায়ই বাড়িতে পাঁচ-দশটা টাকা পাঠায় জয়নাল, ফর্সা লুঙ্গি পরে, সন্ধ্যা বেলায় এক-আধটু ফুরতি করতেও যায় দু-চার দিন। বছর খানেক এইভাবেই চলল।
কিন্তু হোটেলের কলে-ছাঁটা ভাত, জলের মতো ডাল, দু-এক টুকরো মাছ আর কালেভদ্রে এক-আধ খন্ড মাংস—এতে পেট হয়তো ভরতে পারে, কিন্তু শরীরের তাগিদ মেটে না। যে শক্তি আসে সীমানাহীন নদীর অপর্যাপ্ত জোলো-হাওয়ার উচ্ছাস থেকে; যে-প্রাণ আসে চন্দ্র সূর্য-তারার অবারিত আলোর ঝরনায়; মুঠো মুঠো রাঙা মোটা চালের ভাত, টাটকা নদীর মাছ আর শাকসবজি শরীরে যে-সঞ্জীবনী জাগিয়ে রাখে; রেঙ্গুন চালের ভাতে আর মাপা তরকারিতে তা কোথায় পাবে জয়নাল? প্রথমে বেরিবেরি ধরল, হাত-পা ফুলে দিন কয়েক কষ্ট হল খুব। তারপর থেকেই কেমন যেন নিষ্প্রাণ মনে হতে লাগল শহরের আলো। রিকশা নিয়ে ছোটবার সময় কেমন ঝাঁঝাঁ করতে লাগল কানে, হঠাৎ এক-এক সময় ধড়ফড় করতে লাগল বুকের ভেতরে। শহরে তখন সাইকেল-রিকশা আসতে শুরু হয়েছে, জয়নাল ভাবল ওর একটা জমা নিতে পারলে ঢের বেশি রোজগার করা যাবে। কিন্তু সাইকেল-রিকশার ওপরে বাবুদের ঝোঁক বেশি, কাজেই জমা নিতে গেলে আগাম চায় মালিক। অতএব টাকা জমাবার জন্যে প্রাণপণ পরিশ্রম শুরু করল জয়নাল। তারপর একদিন যখন সদর রোড থেকে সওয়ারি নিয়ে চলেছে কাশীপুরের দিকে, তখন নথুল্লা বাজার পুলের উপরে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল সে। সেই যে পড়ল—আর উঠতে পারল না, মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল খোয়া-ওঠা পথের ওপর। হাসপাতালে নিয়ে আসার পরে দু-ঘণ্টার বেশি বাঁচেনি জয়নাল।
এক বার এক পলকের জন্যে সেই স্মৃতিটা চমকে গেল মকবুলের মনের ওপর। শহর! সেখানে টাকা পাওয়া যায়, সাইকেল-রিকশা টানা চলে, কুলিগিরি করা যায়, একটা পান বিড়ির দোকান দিয়ে বসলেও নেহাত মন্দ হয় না। বায়োস্কোপ দেখা যায়, নানারকম ঘূর্তি করাও চলে, কিন্তু…
কিন্তু!
মকবুল জাকুটি করে জোয়ারের ফুলে-ওঠা জলের তরঙ্গোচ্ছাস দেখতে লাগল। কতকগুলো কুমিরের ছানার মতো একঝাঁক খরশুলা মাছের পোনা জলের উপর বড়ো বড়ো চোখ তুলে ভেসে বেড়াচ্ছে। উড়ন্ত মাছরাঙার লোলুপ দৃষ্টি আছে ওদের ওপর, কিন্তু সহজে ধরা দেবার পাত্র নয় ওরা। ছোঁ মেরে ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই টুপ করে ডুবে যাবে জলের মধ্যে। মকবুল একটা কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে ছুড়ে দিলে ওদের দিকে। ছলাৎ করে লঘু শব্দ হল একটু,মাছগুলো চক্ষের পলকে মিলিয়ে গেছে। মকবুল বললে, তা হোক। শহরই আমার ভালো।
যেরকম খেপে গেছ, এরপরে খুনখারাপি করবে মনে হচ্ছে। সুধাকর হাসল।
খুন করতে আর পারছি কই। তাহলে তো বেঁচে যাই। ইচ্ছে করে কাল্লাটা নামিয়ে দিয়ে ধড়টাকে পুঁতে দিই কচুরিপানার ভেতরেশেয়াল-কুকুরে টেনে খাক।
এত রাগ তাহলে ইদ্রিশ সাহেবের ওপরেই?
ইদ্রিশ সাহেব! মুখটা বিকৃত করলে মকবুল, বাঁদির ব্যাটা, চুরি-ছ্যাঁচড়ামি করে দুটো পয়সা জমিয়েই সাহেব হয়ে বসেছে। এখন আমাকে বলে বান্দা! বলে, আমি ওর জুতোর চাকর!
বান্দা তো বটেই—সুধাকর ভাবল। মকবুলের নৌকা তার নিজের নয়, ইদ্রিশ মিয়াই তার মালিক। প্রতিটি পাইপয়সার হিসেব দিতে হয় তাকে। আর আশ্চর্য খরশান দৃষ্টি ইদ্রিশ মিয়ার! তিন টাকার সওয়ারি বয়ে দুটো টাকা বলে পার পাওয়ার জো নেই। কী করে টের পায় সে-ই জানে। মকবুল বলে, লোকটার ইবলিশের চোখ আছে।
মকবুল বলে চলল, আমারও দিন ছিল। আমার বাপ-দাদা যদি দাঙ্গাবাজি আর মামলা করে ফতুর না হত, তাহলে কে পরোয়া করত ওই ইদ্রিশ মিয়াকে? এই আমাকেই তবে পোলাও খাওয়ার নেমন্তন্ন করত, ফরাশে বসিয়ে বলত, আসুন মিয়াভাই আসুন—এই নিন ফরসি। কী করব, সবই নসিব।
নসিব বই কী? কী আর নসিব ছাড়া? নইলে গোলাম আলি সর্দারের মেয়ে রোকেয়াকে দেখে এমন করে মন মজবে কেন মকবুলের? যে-মকবুলের মাথা গোঁজবার গোলপাতার ছাউনিটুকু পর্যন্ত একটা দমকা হাওয়ার ভর সয় না—তার কেন হবে বিয়ে করে ঘর বাঁধবার শখ? আর গোলাম আলি সর্দারই-বা কেন এমন হতে যাবে, যার চোখের চামড়া বলে কোনো জিনিস নেই! তারও তো সম্বলের মধ্যে বিঘে তিনেক জমি, তাও চাষ করতে হয় ইদ্রিশ মিয়ার কাছ থেকে বলদ ধার করে। যদিও নামেই সর্দার, তবু তার ঘর থেকেও তো দিনের সূর্য আর রাতের চাঁদ দেখা যায়। তবু সেই গোলাম আলিই-বা জেনেশুনে কেন পাঁচকুড়ি টাকার দেনমোহর চেয়ে বসবে মকবুলের কাছে?
ঘর নেই, জমি নেই, খোরাকি ছাড়া তিন টাকা মাইনে। লুঙ্গি কিনতে হলে এক মাস বিড়ি না খেয়ে থাকতে হয়। সেই মকবুল কিনা রোকেয়াকে দেখে দিশেহারা হয়ে গেল। তারপর ইদ্রিশ মিয়ার কাছে গিয়ে দরবার করে বললে, মিয়া সাহেব, যদি পাঁচকুড়ি টাকা কর্জ দেন…
পাঁচকুড়ি টাকা! ইদ্রিশ মিয়া হা-হা করে হেসে উঠেছিল, শোধ করবি কী করে? বিবি বাঁধা দিয়ে না কি?
