গলুইয়ের পাটাতন সরাল সুধাকর। ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে একটা আওয়াজ উঠল সেখান থেকে। নড়ে উঠল বেজির মতো একটা মেটে রঙের প্রাণী—উদবেড়াল একটা।
আয় জুয়ান (জোয়ান), আয়। উদবেড়ালের গলার লম্বা দড়িটা ধরে টান দিলে সুধাকর। উদ-টা উঠে এল পাটাতনের ওপর। পোষা বেড়ালের মতোই সুধাকরের চারদিকে সে ঘুরতে লাগল, মাথা ঘষতে লাগল তার হাঁটুতে। সুধাকর একটা সংকেত করলে, যা—
উদ আর অপেক্ষা করলে না। ওস্তাদ সাঁতারুর মতো ঝুপ করে ঘোলাটে নীল জলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কয়েকটা চ্যালা মাছ ঝাঁক বেঁধে নৌকার আশপাশে ঘুরছিল, একরাশ খইয়ের মতো চারদিকে সভয়ে ছিটকে পড়ল তারা। হাতের দড়িটা শক্ত করে ধরে জলের দিকে তাকিয়ে রইল সুধাকর। উদের মেটে রঙের শরীরটা কখনো জলের তলায় নিঃশেষে মিলিয়ে যাচ্ছে, কখনো-বা নিশ্বাস নেওয়ার জন্যে এক-এক বার ভেসে উঠছে ওপরে। সুধাকর অপেক্ষা করতে লাগল।
ওদিকের একটা নৌকা থেকে মকবুল মাঝি ছিপ ফেলেছিল। বিরক্ত হয়ে ছিপ তুলে নিয়ে বললে, আবার উদ নামিয়েছ জলে? একটা মাছও ধরা যাবে না আর! সুধাকর জবাব দিল না, তার দৃষ্টি তখনও জলের দিকে। জলের তলায় উদ ঘুরে বেড়াচ্ছে; কখনো টান পড়ছে হাতের দড়িতে, কখনো ঢিলে হয়ে যাচ্ছে তার আকর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা হুটোপুটি টের পাওয়া গেল। সুধাকর রইল উৎকর্ণ হয়ে।
একটু পরেই উদ ভেসে উঠল জলের ওপর। তার ধারালো দাঁতে আন্দাজ একপো একটা রুপালি মাছ ছটফট করছে প্রাণপণে। হাত বাড়িয়ে জানোয়ারটির ভিজে মসৃণ শরীর সুধাকর তুলে নিলে নৌকার ওপরে।
শেষপর্যন্ত বোয়াল মাছ ধরলি জুয়ান।
জুয়ান এক বার মনিবের মুখের দিকে তাকাল। তারপর আবার জলে ঝাঁপ দেওয়ার উদ্যোগ করল।
থাক থাক, ওতেই হবে। গলার দড়িতে একটা ঝাঁকুনি দিলে সুধাকর।
পাটাতনের ওপর বসে উদ এবার নিজের শরীর পরিষ্কার করতে লেগে গেল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাতে লাগল সুধাকরের দিকে। সে-দৃষ্টিতে একটা গভীর আত্মপ্রসাদ।
বিকেলে একটা ইলিশ ধরতে হবে বুঝলি? বেশ বড়ো ইলিশ মাছ। তুই আর আমি ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাব রাত্রে। বুঝলি তো?
উত্তরে জুয়ান মনিবের হাঁটুতে ভিজে মাথাটা ঘষে দিলে।
কী মাছ আনল তোমার জুয়ান? মকবুল মাঝির জিজ্ঞাসা শোনা গেল।
বোয়াল। ভাগ নেবে নাকি?
থাক, আমি এক গন্ডা ট্যাংরা ধরেছি।
উদকে খানিকটা কাঁচা মাছ কেটে দিয়ে তোলা-উনুন ধরিয়ে নিলে সুধাকর। বেলা বাড়ছে, জোয়ার আসছে নদীতে। ঘোলাজল ফুলে ফুলে ওদিকের ইটের ভাঁটা পর্যন্ত পৌঁছেছে। কেরায়া নৌকা দুলছে, স্টিমার ঘাটের পন্টুন দুলছে। গাংশালিক উড়ছে দল বেঁধে। মন্থর শান্ত গতিতে একটা ডেসপ্যাঁচ চলেছে মাঝনদী দিয়ে, এ ঘাটে ওটা ভিড়বে না। স্টিমারঘাটের সামনে একটা মিঠাইয়ের দোকানের কাছে কুকুরে ঝগড়া করছে তারস্বরে।
শুধু সুধাকরের নয়, সব নৌকাতেই প্রায় রান্না চড়েছে এখন। জলের গন্ধ, কাদার গন্ধ, কাছ দিয়ে ভেসে-যাওয়া একঝাঁক নিরাশ্রয় কচুরিপানার গন্ধ। তার সঙ্গে রসুন, মশলা আর ফুটন্ত ভাতের গন্ধ মিশে গেছে। রোদটা সম্পূর্ণ উত্তপ্ত হয়ে ওঠবারও সুযোগ পাচ্ছে না, নদীর ভিজে হাওয়ায় জুড়িয়ে যাচ্ছে বার বার।
সুধাকর খেতে বসেছে, এমনসময় ডাঙা দিয়ে ঘুরে ওর নৌকায় মকবুল এসে উঠল।
কী, খাওয়া হয়নি এখনও?
না, রান্না চাপাতে দেরি হল একটু। রসুনের ঝোলমাখা ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে তুলতে সুধাকর বললে, একটু বসো ভাই। তামাক খাও।
মকবুল তামাকের সরঞ্জাম বের করে টিকে ধরাতে বসে গেল।
এই হয়ে এল আমার। বড়ো বড়ো গ্রাস মাখতে লাগল সুধাকর।
আস্তে আস্তে খাও-না, ব্যস্ত হওয়ার কী আছে? টিকেতে ফু দিতে দিতে মকবুল বললে, বিকেলের আগে তো কোনো সওয়ারি পাওয়ার আশা নেই। খাও নিশ্চিন্ত হয়ে।
হয়ে গেছে আমার। প্রায় চক্ষের পলকে পেতলের থালাখানা পরিষ্কার হয়ে গেল সুধাকরের। দুটি-চারটি ভাতের অবশেষ সে নদীর মধ্যে ছড়িয়ে দিলে। ভালো করে সেগুলো জলে পড়বার আগেই ঝাঁকে ঝাঁকে চ্যালা মাছ তা যেন লুফে নিতে লাগল।
থালা মেজে, হাঁড়ি-কড়াই গলুইয়ের ভেতরে সাজিয়ে রাখতে আরও সময় গেল খানিকটা। ততক্ষণে হুঁকোয় একটা শালপাতার নল গুঁজে তামাক টানতে শুরু করেছে মকবুল। মুখের ওপর দুশ্চিন্তার ছায়া।
কী হল? মেজাজ খারাপ নাকি?
নলটা খুলে নিয়ে সুধাকরের দিকে হুঁকো এগিয়ে দিলে মকবুল, নাও।
কড়া দা-কাটা তামাকে টান দিয়ে চোখ দুটো প্রায় তৃপ্তিতে বুজে এল সুধাকরের। বেশ আমেজ লাগিয়ে দিয়েছে মকবুল–কলকেতে গনগন করছে টিকের আগুন।
আয়েশ-জড়ানো গলায় সুধাকর আবার বললে, কী হয়েছে? অমন কেন মুখের চেহারা?
মকবুল জাকুটিভরা চোখে তাকিয়ে ছিল জলের দিকে। কপালটা কোঁচকানো, অন্যমনস্কভাবে হাতের শালপাতার নলটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ছে।
আর ভালো লাগছে না, এবার চলে যাব শহরে।
শহরে?
সেই কথাই ভাবছি। মুখ ফিরিয়ে মকবুল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, স্টিমারঘাটে কুলিগিরি করব, রিকশা টানব তা নইলে।
কেন, আর বুঝি নৌকা বাইতে মন চায় না?
কী হবে? এও তো কুলির কাজ। যেখানেই যাই আমার অবস্থা সমান। বরং শহরে দুটো পয়সা বেশি আসবে। রিকশা টানতে পারলে আরও বেশি হবে রোজগার।
সুধাকর আস্তে আস্তে বললে, কিন্তু চাচার কথাটা এক বার ভেবে দ্যাখো তোমার।
