বড়োবিবি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মাঝখানের দুটি ছায়ামূর্তির মতো অবান্তর। মহিষীর মর্যাদা যে সগৌরবে ভোগ করে থাকে সে হল ছোটোবিবি বা লালবিবি। বছর সতেরো আঠারো বয়েস, ছিমছাম চেহারা, মাজা শ্যামলা রং। আদরে-আবদারে-অভিমানে হাবিব মিয়ার সমস্ত মন-প্রাণকে একেবারে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। এক মুহূর্তের জন্যে লালবিবিকে চোখের আড়াল করতে পারেন না তিনি। তাই কানের গোলাপি আতর আজকাল আরও বেশি করে গন্ধ ছড়ায়, শহর থেকে জর্দা কিমাম আনানোর খরচটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে, চোখের কোলে কোলে গাঢ় হয়ে পড়ছে সুর্মার রেখা। আগের চাইতে আজকাল আরও বেশি করে হাসেন হাবিব মিয়া, ভুড়িটা আগের চাইতে আরও বেশি দোল খায়, গালের গোলাপি রঙে আরও বেশি করে যেন যৌবনের আমেজ।
তা সুখী হওয়ার আইনসঙ্গত অধিকার আছে বই কী হাবিব মিয়ার। মস্ত জোত, খেতির সময় বারোখানা লাঙল নামে। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার, ফুড কমিটির সভাপতি। যা যা দরকার কোনোটার অভাব নেই।
সব ভালো, তবে সন্ধের দিকে একটু আফিং খান। হজমের গোলমালের জন্যে ধরেছিলেন গোড়াতে, এখন পাকাঁপাকি নেশা হয়ে গেছে। ঘণ্টা দু-তিন চোখ বুজে নিশ্চিন্তে ঝিমুতে মন্দ লাগে না একেবারে। নেশার আমেজের সঙ্গে নবযৌবনা লালবিবির ধ্যানটা একটা মধুর আরামে আচ্ছন্ন করে রাখে।
বলা বাহুল্য, এই সময় বেরসিকের মতো কেউ ডাকাডাকি করলে ভালো লাগবার কথা নয়। হাবিব মিয়ার মেজাজটা যতই ভালো হোক-না কেন, ইচ্ছে করে রসভঙ্গকারী বেয়াদবকে পায়ের চটিটা খুলে ঘা-কতক পটাপট বসিয়ে দিতে। খাঁটি সৈয়দের বংশধর হিসেবে গর্জন করে উঠতে ইচ্ছে হয়, চুপ রহো গোলামকা বাচ্ছা।
আপাতত মগজের ভেতরে সেই সৈয়দের মেজাজটা পাক খাচ্ছিল। হাবিব মিয়া গাল দিয়ে উঠলেন না বটে, কিন্তু চোখ না মেলেই দুরন্ত জবানিতে আমিরি ভাষায় প্রশ্ন করলেন, আবে কৌন চিল্লাতা?
আমি ধলা মন্তাই, জনাব!
এ এমন একটা লোক যাকে হুংকার দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া চলে না, দেখানো চলে না আমিরি মেজাজের উত্তাপ। অত্যন্ত বদরাগি গোঁয়ার লোক, খেপে গেলে সৈয়দ-মৌলবি কোনোটাই মানবে না। সুতরাং অত্যন্ত অনিচ্ছায় এবং গভীর বিরক্তির সঙ্গে চোখ মেলতে হল। লালবিবির রঙিন স্বপ্নটা আপাতত মিলিয়ে গেল বাতাসে।
জোর করে মুখে হাসি টেনে আনলেন হাবিব মিয়া, তারপর কী খবর?
দাওয়ার সামনে চাটাইটার ওপরে বসল মন্তাই, আজ্ঞে বারণ করে দিলাম।
তারপর?
গন্ডগোল পাকাবে। বিকেলে দেখেছি দল বেঁধে জটলা করছিল।
তোমরা কী করবে? ভয় পেয়ে সব পিছিয়ে যাবে নাকি ছাগীর বাচ্ছার মতো?
আল্লার কসম! পিঁজরার পোষ-না-মানা বাঘের মতো একটা চাপা গর্জন করলে ধলা মন্তাই, আমি জাত পাঠান জনাব। ধরে ধরে এক-একটাকে কোতল করে দেব তা হলে।
হাবিব মিয়ার কন্ঠস্বর বিশ্বস্ত শোনাল। সব ওই ব্যাটা ঠাকুরের জন্যে। ও-ই হচ্ছে ওদের মাথা।
মাথার মাথাটা কেটে নিতে আমার এক লহমা সময় লাগবে না জনাব। তারপরে লাশ গুম করে দেব মধুমতীর জলে। কাকে অবধি টের পাবে না।
শাবাশ!
হাবিব মিয়া চুপ করে গেলেন। মুখে আবার এক টুকরো হাসি দেখা দিল, কিন্তু এ হাসি জোর-করা নয়, সহজ প্রসন্নতার। এতদিনে কাজ হাসিল হবে মনে হচ্ছে। ষাঁড়ের শক্ত বাঘে মারবে। নিজে থেকে কিছু করতে গেলে অনর্থক দাঙ্গা-ফৌজদারির ঝামেলা বাঁধত, কিন্তু এ যা হচ্ছে তা যেমন নিরাপদ তেমনি মোক্ষম। জগন্নাথ ঠাকুরকে ভালো করেই জানেন হাবিব মিয়া, সহজে তার ন্যায্য দাবি থেকে বাঁধের দেড় বিঘে ধানিজমি ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু যে-মন্ত্র দেওয়া হয়েছে তাতে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে জগন্নাথ ঠাকুরের মাথাটা উড়ে যাবে ধড় থেকে এবং তারপরে…
একেই বলে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। ভাগ্যিস মৌলবিসাহেব এসে সেদিন ওইরকম গরম গরম বুলি শুনিয়ে গেলেন, নইলে কি এমন সুযোগ মিলত কোনোদিন! মনে মনে নিজের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন হাবিব মিয়া, তারিফ করলেন নিজেকে। সকলকে লেলিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করার চাইতে বুদ্ধিমানের কাজ সংসারে আর কী আছে।
ধলা মন্তাই বললে, মামলা-মোকদ্দমা যদি বাঁধে তাহলে আপনি তো আমাদের পিছে। আছেন জনাব?
আলবাত। হাবিব মিয়া সোৎসাহে বললেন, সেকথা কি আর বলতে হবে?
আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই, বক্তব্যও নেই। তবু দ্বিধা করতে লাগল ধলা মন্তাই, আঙুল দিয়ে চাটাইটাকে খুটতে লাগল। আরও কী-একটা তার বলবার আছে কিন্তু সাহস সঞ্চয় করতে পারছে না, বলতে পারছে না সহজ ভাষাতে। বাধা আছে, সংকোচ আছে।
জনাব!
কী বলছিলে?
বলছিলাম… মন্তাই আবার চুপ করে গেল।
এতক্ষণে অস্বস্তি বোধ হতে লাগল হাবিব মিয়ার। লক্ষণটা খারাপ। সাধারণত এইসব নীরবতার ভূমিকার পরেই আসে প্রার্থীর দরবার— দু-কাঠা ধান চাই, দু-কুড়ি টাকা ধার চাই। এত বড়ো জোয়ান মানুষটা এমন সংকুচিত হয়ে গেলেই সন্দেহ দেখা দেয়।
কী বলবে, বলেই ফ্যালো-না মিয়া।
জি… চোয়াড়, রুক্ষদর্শন লোকটার মুখ-চোখ লজ্জিত আর করুণ হয়ে উঠল।
জি, ঘরের জরু-বিটির যে ইজ্জত রইল না।
ইজ্জত রইল না! বল কী হে? তোমার ঘরের ইজ্জতে হাত দেবে এমন বুকের পাটা কার আছে?
আজ্ঞে সেকথা নয়। কারও হাত দিবার ব্যাপার নয়, দু-একখানা কাপড়…
কাপড়! হাবিব মিয়া প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, কাপড়!
