একটা পৈশাচিক আর্তনাদ করে বাইরে লাফিয়ে পড়ল রণজিৎ, কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না। সামনে-পিছনে দু-দিকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে পথের রেখা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। অতল অন্ধকারে দুরে-কাছে ক্রমাগত ধস ভাঙতে লাগল। মানুষের চিৎকার, বুকফাটা কান্না, মৃত্যুযন্ত্রণার গোঙানি, সব একসঙ্গে মিলে একটা বীভৎস নরকের মধ্যে পৌঁছে দিলে রণজিৎকে।
রণজিৎ দাঁড়াতে পারল না। হাঁটুতে এক বিন্দু শক্তি কোথাও অবশিষ্ট নেই। চোখ বুজে বসে পড়ল পথের ওপরে। এই দ্বীপের মতো জায়গাটুকু যেকোনো সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। যতক্ষণ না যায় ততক্ষণ…
ততক্ষণ বাড়িটার ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে কিরণলেখার আর্তনাদ তার কানে এসে ঘা দিতে লাগল— আমাকে ভোলো, আমাকে তোলে এখান থেকে। আমি এখনও বেঁচে আছি।
উঠে দাঁড়াতে চাইল রণজিৎ-সাধ্য কী! সমস্ত শরীর যেন পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গেছে তার। অসহ্য বিষাক্ত যন্ত্রণায় সে কান পেতে শুনতে লাগল কিরণলেখার আকুতি–ওগো কোথায় তুমি? আমি যে এখনও বেঁচে আছি…
চোখ দুটো বোজবার আগে দেখতে পেল রণজিৎ—অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেল। কিরণলেখার কাছে যার কথা শুনেছিল, একটা শবদেহের মতো যাকে পড়ে থাকতে দেখেছিল বিছানায়, সেই ভবতোষ একটা প্রচন্ড দানবের মতো ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে প্রাণপণে। এত শক্তি, এমন অমানুষিক শক্তি কোথায় পেল ভবতোষ? কী করে এমন ভয়ংকরভাবে বেঁচে উঠল সে যে কিরণলেখাকে সে বাঁচিয়ে তুলবেই?
একটা বিদ্যুৎচমকের মতো রণজিৎ অনুভব করল, অনেক বর্ষা, অনেক শরৎ, অনেক সূর্যের আলো আর অনেক অন্ধকার তিলে তিলে এই শক্তি দিয়েছে ভবতোষকে। একটা আকস্মিক আবেগ নয়, একটা উন্মত্ততা নয়; এ শক্তির মধ্যে অনেক প্রতীক্ষা, অনেক সংযম, অনেক নিঃশব্দ প্রস্তুতি। তার মৃত্যু হয়নি, শুধু আত্মপ্রকাশের জন্যে একটা উপলক্ষ্যের প্রয়োজন ছিল। জড়তা ছিল কঠিন, তাই তার আবরণ ভাঙবার জন্যে প্রয়োজন হল এমন ভয়াবহ চরম মুহূর্তের।
আমায় বাঁচাও, আমায় বাঁচাও তুমি…।
উন্মত্ত দানবীয় শক্তিতে কাঠ সরাচ্ছে ভবতোষ। দাম্পত্যজীবনের যে-প্রেম তিলে তিলে সংগ্রহ করেছে সূর্য আর নক্ষত্রের অগ্নিকণা, তাই এখন বজ্রপ্রদীপ হয়ে জ্বলছে ভবতোষের রক্তে। কিরণলেখাকে সে-ই বাঁচাবে, সে-ই শুধু বাঁচাতে পারে। সীমাহীন দীনতায় হাঁটুর মধ্যে মুখ লুকিয়ে রণজিৎ নিশ্চেতনার গভীরে তলিয়ে গেল।
ধানশ্রী
বন্দরের ঘাট থেকে এক্সপ্রেস স্টিমার ছেড়ে চলে গেল। সুধাকর মাঝি অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল সেদিকে। জাহাজ তো নয় একটা প্রকান্ড দৈত্য যেন! কীর্তনখোলার জল তোলপাড় করে, চারদিক ফেনায় ফেনাময় করে দিয়ে বাঁকের মুখে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু বহুক্ষণ ঢেউয়ের দোলায় দুলতে লাগল সুধাকরের কেরায়া নৌকা।
কোথায় যায়, কত দূরদূরান্ত থেকে আসে। এত বড়ো রাক্ষসী নদীটাকে গ্রাহ্যও করে না। রোদ-বৃষ্টি-তুফান কোনোটাতে ভ্রূক্ষেপ মাত্র নেই। উত্তরের আকাশে মেঘ জমে, নদীর বুকে কাজলবরণ ছায়া ছড়িয়ে পড়ে, ঢেউ উলাস দেয়। হুশিয়ার মাঝিরা সঙ্গে সঙ্গে কূলের দিকে পাড়ি জমায়। কিন্তু ওই জাহাজটা নির্বিকার। ও জানে পাগলা নদীর মাতাল ঢেউ মিথ্যে আক্রোশেই বার বার ওর গায়ে এসে ভেঙে পড়বে, এতটুকুও ক্ষতি করতে পারবে না।
জাহাজটা আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু কানে আসছে দুটো প্রকান্ড চাকার হুস হুস করে জল ভাঙবার আওয়াজ। শোনা যাচ্ছে বাঁশির গম্ভীর সুর। সুধাকর অন্যমনস্ক হয়ে রইল। ওই জাহাজটার দিকে তাকালে ভারি ছোটো মনে হয় নিজের জীবনকে, মনে হয় ভারি সংকীর্ণ। কখনো কখনো ইচ্ছে করে জাহাজের খালাসি হয়ে চলে যায় সে—যেখানে হোক, যত দূরেই হোক।
সুধাকরের দীর্ঘশ্বাস পড়ল একটা।
এইবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে। অধিকাংশ কেরায়া নৌকাই তেমনি সারবেঁধে দাঁড়িয়ে, সওয়ারি জোটেনি। পুজোর মরশুম শেষ হয়ে গেছে, এখন আর ঘরমুখো যাত্রীর ভিড় নেই, সব ফিরে চলেছে কলকাতার দিকে। স্টিমার থেকে মাত্র সামান্য ক-টি লোক নেমেছিল, অধিকাংশই বন্দরের মানুষ। দূরের কেরায়া নেই বললেই চলে।
অতএব এখন আর হাতে কোনো কাজ নেই, চুপচাপ ঘাটেই অপেক্ষা করা। এর মধ্যে যাত্রী জোটে তো ভালোই, নইলে সন্ধ্যার মেল পর্যন্ত দেখে তবে ঘরে ফেরা।
গোটা কয়েক ইলিশ মাছের নৌকা আসছিল ঘাটের দিকে। সুধাকর ডাকল, আছে?
আছে।
দরদাম কীরকম?
বারো আনা, চৌদ্দ আনা, এক টাকা।
বলে কী! একটা ইলিশ মাছ বারো আনা। মগের মুল্লুক ছাড়া একে আর কী বলা যায়।
কীসের মাছ তোমার? সোনার না রুপার? সুধাকর রসিকতা করতে চেষ্টা করল।
তুমি আদার ব্যাপারী, সে-খোঁজে তোমার কী দরকার? চটাং করে উত্তর এল ইলিশ মাছের নৌকা থেকে।
মুখের মতো জবাব পেয়ে চুপ করে গেল সুধাকর। তারপর বিড়বিড় করে বকতে লাগল, ইস, বারো আনায় ইলিশ মাছ বেচবেন! সেদিন আর নেই, কলকাতার বাবুরা সব ফিরে গেছে এখন। ওই ইলিশ মাছ নৌকাতেই পচবে, এ আমি বলে দিচ্ছি।
তা নাহয় পচুক, কিন্তু তাতে সুধাকরের কোনো সান্ত্বনা নেই। আপাতত রান্না চাপাতে হবে এবং কিছু মাছ দরকার। কিন্তু নৌকার দর শুনেই আর গঞ্জের দিকে এগোতে সাহস হচ্ছে না। এক টাকা, পাঁচ সিকের কমে মাছ ছোঁয়াই যাবে না হয়তো। তার চেয়ে…
