কিরণলেখা ছুটে ঘরের মধ্যে পালিয়ে এল। এক কোণে ছুড়ে দিলে ওভারকোটটা। তারপর পলাতক একটা খরগোশ যেমন করে তার গর্তের মধ্যে এসে লুকোয়, তেমনি করে ডুবে গেল লেপের ভেতরে।
আর আশ্চর্য, এরই জন্যে কি অপেক্ষা করছিল ভবতোষ? সে কি জানত, এমনই একটা কিছু ঘটবে? নইলে আজ দু-বছর পাশে পাশে শুয়েও ঘুমের ঘোরে যে-ভবতোষ কিরণলেখাকে স্পর্শ করেনি, সে কেন তাকে এমন করে জড়িয়ে নিলে বুকের মধ্যে?
বাইরের রাস্তায় একটা মোটর থামল। দু-বার হর্ন বাজল। কিরণলেখা আরও বেশি করে সরে এল ভবতোষের বুকের মধ্যে, ভবতোষের হাতটা আরও বেশি করে সাঁড়াশির মতো শক্ত হয়ে উঠতে লাগল।
তারপর কত বার হর্ন বাজল, কতক্ষণ ধরে অধৈর্য প্রতীক্ষায় বাজতে বাজতে থেমে গেল, কিরণলেখা টেরও পেল না। সমস্ত রাতে বিনিদ্র অস্বস্তির পরে এইবার প্রথম তার চোখ ভরে ঘুম নেমে এল।
কিরণলেখা জানত রণজিৎ ক্ষমা করবে না। একবার যখন দাবি করতে শিখেছে, তখন সহজে সে দাবি ছেড়ে দেবে না কিছুতেই। পোস্টগ্র্যাজুয়েটের নিরীহ নিস্তরঙ্গ রণজিতের মধ্যে একটা উগ্র ক্ষুধার্ত জাগরণের পালা শুরু হয়েছে। আর সে বেহালা বাজায় না, হয়তো রিভলবারের লাইসেন্স নিয়েছে এখন।
দু-দিন ইচ্ছে করেই সে এড়িয়ে গেল লাডেন লা রোড, ম্যাল, দারোগা বাজারের রাস্তা। যে নেপালি কাঞ্ছাটা দু-বেলা বাসন মাজে, ঘরদুয়ার পরিষ্কার করে বাজার করাল তাকে দিয়েই। আধখানা বুনে রাখা স্কার্ফটাকে টেনে খুলে ফেলল, তারপর সকাল-বিকেল বসে গেল সেইটেকে নতুন করে বুনতে।
কী ভাবল ভবতোষ? কিছু কি ভাবল? দাড়ি কামাল, পর পর কয়েকটা সিগারেট খেল, এমনকী নিজেই বেরিয়ে গিয়ে কিনে আনল খবরের কাগজ। বাত্রিতে কিরণলেখার ওই আত্মসমর্পণের মধ্যে কোনো অর্থ কি খুঁজে পেয়েছে ভবতোষ? নিজের ভেতরে কোথাও কি এতটুকু শক্তিকে আবিষ্কার করেছে সে?
দুটো দিন—দুটো তীক্ষ্ণ রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। কোথায় মিলিয়ে গেল কুয়াশা, কোথায় হারিয়ে গেল শীতার্ত বিষণ্ণতার কুহক। পাথর গরম হয়ে উঠল। উদয়াস্ত ঝকঝক করলে লাগল কাঞ্চনজঙ্ঘা, চারিদিকের নানা রঙের বাড়িগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল নিষ্ঠুর নগ্নতায়। এই আলোয় এত প্রখর সূর্যকিরণের মধ্যে কোথায় তলিয়ে গেল রণজিৎ। এই রোদে ঝকঝক করে ওঠে ইউনিভার্সিটির প্রকান্ড সাদা বাড়িটা, হেদুয়ার জল, কলেজস্ট্রিট, কলকাতা। এ আলোয় রণজিতের কুঁকড়ে লুকিয়ে থাকার পালা। আর কিরণলেখার বসে বসে ভাবা–এতখানি প্রশ্রয় কী করে সে দিয়েছিল রণজিৎকে! কেমন করে সে বলতে পেরেছিল, আমাকে এগিয়ে দেবেন বাজার পর্যন্ত?
রণজিৎ এল আরও দু-দিন পরে।
এতটা দুঃসাহস কোথা থেকে এল রণজিতের যে অসংকোচে চলে আসতে পারল সেখানে —যেখানে ভবতোষ আছে? কেমন করে সে দুম দুম করে ঘা দিতে পারল দরজায়? যেন দরকার হলে ভেঙে ফেলবে।
তার কারণ ছিল বৃষ্টি-–অশ্রান্ত বৃষ্টি। উজ্জ্বল তীক্ষ্ণআকাশ পোড়া ছাইয়ের মতো রং ধরেছিল দিনের বেলা, রাত্রির অন্ধকারে তা আলকাতরার মতো কালো হয়ে উঠল। সামনের পাইন গাছটায় আছড়ে পড়তে লাগল ঝোড়ো হাওয়ার ঝলক। শনশন করে আর্তনাদ করে চলল ইলেকট্রিকের তার। আর সেই সময় প্রচন্ডভাবে দরজায় ঘা দিলে রণজিৎ।
হাতের বোনাটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিরণলেখা, যেন ভূত দেখল। বিছানার ওপরে ওঠে বসল ভবতোষ। রণজিতের ওয়াটারপ্রুফ থেকে স্রোতের মতো জল গড়িয়ে পড়ছে কার্পেটের উপর, বৃষ্টিতে চকচক করছে পায়ের কালো গাম বুট। ওয়াটারপ্রুফটাকে এক পাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে শব্দ করে একটা চেয়ারের ওপরে বসে পড়ল। আজ বিনা নিমন্ত্রণেই সে এসেছে।
তারপর সহজ স্বাভাবিক গলায় বললে, অনেক দিন পরে দেখা হল ভবতোষ, ভালো আছ তো?
কী-একটা বলতে চাইল ভবতোষ—বলতে পারল না। শুধু দুটো কোটরে-বসা চোখের ভেতর থেকে স্তিমিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রণজিতের দিকে। সে-দৃষ্টিকে রণজিৎ গ্রাহ্য করল না। কিরণলেখা দেখল, বাঘের মতো দপদপিয়ে উঠেছে রণজিতের চোখ।
রণজিৎ বললে, সেদিন কথা দিয়েও কেন গেলেন না আপনি? প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে মোটরের হর্ন বাজিয়েছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে…
বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ, ইলেকট্রিক তারের গুঞ্জন, পাইন গাছটার আর্তনাদ। কী ভয়ংকর—কী অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব নিয়ে এসেছে রণজিৎ। এই দুর্যোগের পটভূমিতে যেন হিংস্র একটা বন্য শক্তির মতো আবির্ভূত হয়েছে সে। কে জানে তার ওভারকোটের পকেটে একটা রিভলবারও আছে কি না।
হয়তো হাঁটু ভেঙে বসে পড়ত কিরণলেখা, হয়তো বলেও বসত–ক্ষমা করো আমাকে, এমন অপরাধ আমি আর করব না। হয়তো রণজিৎ যদি তখন তার হাত ধরে এই ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যেত, এক বিন্দু প্রতিবাদের শক্তি থাকত না কিরণলেখার।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই বৃষ্টি আর হাওয়ার সমস্ত কলরবকে ছাপিয়ে ভয়ংকর গুরুগুরু শব্দ উঠল একটা। সে-শব্দ আকাশে নয়—মাটিতে। একটা প্রচন্ড ভূমিকম্পের মতো দুলে উঠল ঘরটা।
খাটের ওপর থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল ভবতোষ। ধস নামছে!
আবার সেই গুরুগুরু ধ্বনিটা কানে এল। আরও তীব্র, আরও ভয়াল। দপ করে নিভে গেল ঘরের ইলেকট্রিকের আলোটা। মেঝেটা দুলতে লাগল। পাশের মারাঠি পরিবারের থেকে শোনা গেল আকুল কান্নার শব্দ। মড়মড় করে পাইন গাছটা ভেঙে পড়ল। ঘরের পিছন দিকটা হঠাৎ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে টুকরো টুকরো কাঠের মতো ঢালু বেয়ে গড়িয়ে চলল।
