চা করতে হবে। কিরণলেখা স্টোভ ধরাতে বসল। পাশের ঘরে এক মারাঠি ভদ্রলোক আছেন—এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। তাঁর একপাল ছোটা ছেলে-মেয়ে লাফালাফি করছে সমানে। হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে মশলা-মেশানো রসুনের উগ্র গন্ধ, কী-একটা ভালো জিনিস রান্না হচ্ছে ওখানে। মোটা গলায় ধমক দিচ্ছেন ভদ্রলোকের স্ত্রী। জানালার বাইরে একটু দূরের রাস্তায় ভুটিয়া ঘোড়ায় চেপে চলেছে দুটি অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ছেলে-মেয়ে। স্টোভে পাম্প করতে করতে এক বার ভবতোষের দিকে তাকিয়ে দেখল কিরণলেখা। নিঃসাড় হয়ে এলিয়ে আছে বিছানায়, কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে দু হাতের শীর্ণ আঙুলগুলোকে।
ঘরটা খালি, বিশ্রী রকমের খালি। পাশের ঘরে মারাঠি বাচ্চাগুলোর চিৎকার। ভারি একা একা লাগল কিরণলেখার। স্টোভে কেটলি চাপিয়ে বিছানার পাশে বেতের চেয়ারটায় এসে বসল।
ভবতোষ চোখ মেলল। ঝিমুচ্ছিল? জেগেই ছিল? কে জানে।
কিরণলেখা আস্তে আস্তে বললে, তোমার সিগারেট এনেছি—আর ব্লেড।
আচ্ছা।
আর এই আজকের খবরের কাগজ।
দাও।
হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল ভবতোষ। কিন্তু পড়ার আগ্রহ দেখা গেল না। নিরাসক্ত শান্তিতে মেলে রাখল বুকের ওপর।
এক বার কিরণলেখার মনে হল, কথাটা বলবে ভবতোষকে? বলবে কাল শেষরাত্রে রণজিতের সঙ্গে টাইগার হিলে যাওয়ার প্রোগ্রামের কথাটা? জিজ্ঞাসা করবে তুমিও যাবে নাকি এক বার? রাতদিন তো ঘরেই শুয়ে থাকা, এমন করলে শরীর ভালো হবে কী করে? চলো
ঘুরে আসবে একটু? কিন্তু বলেই-বা কী হবে, কিছুতেই জাগানো যাবে না ভবতোষকে। একটা অতল নির্বেদের মধ্যে সে নিঃশেষিত। সেখান থেকে কিছুতেই উঠে আসতে চাইবে না। এমনকী কাল শেষরাতে রণজিতের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার মধ্যে কুৎসিত কল্পনার যে সুযোগ আছে, তাই নিয়ে এক বারও চঞ্চল হয়ে উঠবে না ভবতোষ। মনে মনেও না।
এক বার হয়তো চোখ মেলে তাকিয়ে দেখবে—হয়তো তাও না। হয়তো লেপটাকে আরও বেশি করে মুখের ওপরে টেনে আনবে। জিজ্ঞাসাও করবে না কোথায় যাচ্ছ, কখন ফিরবে, অথবা আদৌ আর ফিরবে কি না।
একেই কি নার্ভাস ব্রেকডাউন বলে?
শক্ত পুরুষালি চেহারার কিরণলেখা শিউরে উঠল এক বারের জন্যে। ঘরটা খালি—বিশ্রী রকমের খালি। চার বছর পরে বিয়ের চার বছর পরে এই প্রথম ভবতোষের উপস্থিতি অসহ্য লাগল তার কাছে।
পরক্ষণেই নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিরণলেখা, যেন মুক্ত করে নিলে দুঃস্বপ্নের হাত থেকে। চায়ের কেটলিতে জলটা টগবগ করে ফুটছে।
পরদিন কিরণলেখার ঘুম ভাঙল ভোর চারটের আগেই।
চোখ মেলতেই দৃষ্টি পড়ল পাশের টিপয়ের ওপর। ভবতোষের রেডিয়াম ডায়াল ঘড়িটা ঝকঝক করছে ওখানে। কাচের আড়াল থেকে কতগুলো সবুজ অগ্নিবিন্দু হিংস্রভাবে জ্বলজ্বল করছে। রণজিতের আসতে পনেরো মিনিট দেরি আছে এখনও।
সহজ স্বাভাবিক নিশ্বাস পড়ছে ভবতোষের। হয়তো সেই বর্ণহীন ঘুমে তলিয়ে আছে সে। সেখানে আলো নেই, আকাশ নেই, কিরণলেখা নেই—কেউ নেই। শুধু ছায়ার মতো কতগুলো ছাড়া ছাড়া স্বপ্ন আছে অথবা তাও নয়। যাহোক, সেখানে কিরণলেখা নেই—না থাকলেও ক্ষতি নেই।
এক বার রূঢ় একটা ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করল ভবতোষকে, একটা অর্থহীন কান্নায় ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তার চাইতেও সহজ কাজ নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে যাওয়া। কিরণলেখা তাই করল।
ঘরের কোন জিনিসটা কোথায় আছে তার নির্ভুল হিসেব জানে কিরণলেখা। খাট থেকে নেমে তিন-পা বাঁ-দিকে গেলে আলনা, হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে নীলরঙের শাড়িটা। তার পাশেই ঝুলছে ওভারকোট। রিস্টওয়াচটা কোর্টের পকেটেই আছে। ভবতোষের রেডিয়াম ডায়াল ঘড়িটার পাশেই পড়ে আছে হাতব্যাগ। বর্ষাতি রয়েছে দরজার কাছেই। রাত্রে চুল বেঁধে শুয়েছে—তার জন্যেও কোনো ভাবনা নেই। কসমেটিকস সে ব্যবহার করে না—প্রশ্নই ওঠে না তার।
এখন শুধু অপেক্ষা করা, শুধু কান পেতে থাকা রণজিতের মোটরের হর্নের জন্যে। ভবতোষের ঘড়িতে সবুজ অগ্নিকণায় আরও পাঁচ মিনিট বাকি।
নিঃশব্দে দরজা খুলল কিরণলেখা। বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
বাইরের ঠাণ্ডাটা যেন প্রচন্ড একটা আঘাতের মতো চোখে-মুখে এসে পড়ল। ইলেকট্রিকের আলোগুলো যেন হা-হা করে উঠল নিঃশব্দ নিষ্ঠুর হাসিতে। শীতল কালো আকাশ অসংখ্য ভয়ংকর কুটিতে কিরণলেখার মুখের দিকে তাকাল।
তারপরেই চমকে উঠল সে।
কোথা থেকে তীক্ষ্ণ হাওয়ার ঝলক বয়ে এল একটা। পথের ওপাশে দীর্ঘ পাইন গাছটার চুড়ো মর্মরিত হল—যেন একটা অতিলৌকিক ছায়া কেঁপে উঠতে লাগল থরথরিয়ে। ইলেকট্রিকের তারগুলিতে শাঁ-শাঁ করে কান্নার মতো শব্দ বাজল। আর কিরণলেখার মনে হল ইলেকট্রিকের আলোয় রণজিতের দীর্ঘ দেহ কীরকম ছায়া ফেলবে কে জানে! ওইরকম অলৌকিক-ওইরকম বিরাট, আর সঙ্গে সঙ্গে উচ্চকিত আতঙ্কে তার মনে হবে এই মুহূর্তে একটা ছোটো পাখির মতো তাকে মুঠোয় করে তুলে নিতে পারে রণজিৎ—ছুড়ে ফেলে দিতে পারে কোনো অতলস্পর্শ খাদের ভেতরে, আর তারপর হো-হো করে একটা প্রচন্ড কৌতুকের হাসিতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে রাত্রির অন্ধকারকে।
ভয়। এবার আর নিজের কাছে মন লুকোতে পারল না কিরণলেখা। ভয়। শীতল নিষ্ঠুর অন্ধকার, অসংখ্য নক্ষত্রের ভয়ংকর কুটি, পাইন গাছের চুড়োটার অলৌকিক দোলা, আর–আর…
