কিরণলেখা বলে ফেলল, চলুন, আমাকে এগিয়ে দেবেন বাজার পর্যন্ত।
কথাটা বলেই মনের মধ্যে সংকীর্ণ হয়ে গেল কিরণলেখা। এই প্রস্তাবটা আসা উচিত ছিল রণজিতের কাছ থেকেই। মোলায়েম বিনীত গলায়, কুণ্ঠিত মিনতিতে। তারপর এক মিনিট চুপ করে থেকে প্রস্তাবটা বিবেচনা করার ভঙ্গিতে শেষপর্যন্ত স্মিত হাসিতে কিরণলেখা বলত, বেশ চলুন।
কিন্তু কেমন উলটো হয়ে গেল ব্যাপারটা। কে জানত, পোস্টগ্র্যাজুয়েটের ক্লাসঘরে কুঁকড়ে থাকা অঙ্কুরটা দার্জিলিঙের কুয়াশায় পাইন গাছের মতো মাথা তোলে! তেমনি ঋজু, তেমনি ঊর্ধ্বমুখী!
যে-হাসিটা কিরণলেখার ছিল, নিজের পৌরুষে সেইটে কেড়ে নিয়ে রণজিৎ বললে, চলুন-না, ভালোই তো।
বৃষ্টি থেমে গেছে। এক ফালি মেঘভাঙা রোদ পড়ল চকচকে পথের ওপর। মেঘ আর কুয়াশায় মিলে আকাশ-মাটি ছাওয়া সাদা পর্দাটা ক্রমশ সরে যাচ্ছে দূরে। রণজিৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।
চা খাবেন?
থাক এখন।
থাকবে কেন? আসুন-না। কীরকম কনকনে ঠাণ্ডা দেখেছেন! একটু চা নইলে উৎসাহ বোধ হচ্ছে না।
ঠিক তাই। নিজেকে কেমন স্তিমিত মনে হল কিরণলেখারও। প্রতিবাদ করল না। রাস্তার ডান দিকে এক ধাপ নেমে সাজানো ছোটো একটা রেস্তরাঁ। শোকেসে একখানা অতিকায় পাউরুটি, রংবেরঙের কেক। সবুজ পর্দা-ঢাকা ছোটো ছোটো কেবিন। প্লাস্টিকের বিচিত্র টেবিল ক্লথের উপর রেডিয়োর অনুকরণে অ্যাশট্রে। ফুলদানি থেকে সুইট-পির একটা হালকা আতরের গন্ধ।
দুজনে মুখোমুখি। চা-স্যাণ্ডউইচ।
স্যাণ্ডউইচের একটা কোনা দাঁতে কেটে রণজিৎ বললে, আপনার ওখানে এক দিনও যাওয়া হল না।
টিপটের নল থেকে উঠে আসা বাদামি ধোঁয়াটিকে লক্ষ করতে করতে কিরণলেখা বললে, এলেই তো পারেন।
বিনা নিমন্ত্রণে যাব? রণজিৎ হাসল।
তা বটে। একথা আজকের রণজিৎ বলতে পারে, বলতে পারে অ্যাডভোকেট রণজিৎ। কিন্তু কয়েক বছর আগে কি এ দাবিটা জোর করে করতে পারত সে? সেদিন একটুখানি প্রশ্রয়ের হাসিই ছিল যথেষ্ট, আজ সেখানে আগবাড়িয়ে নিমন্ত্রণ করতে হবে কিরণলেখাকে।
কিরণলেখা জবাব দিল না, কেমন উত্তেজিত হয়ে উঠল মনের ভেতরে। একেবারেই কি সে ফুরিয়ে গেছে, সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে গেছে রণজিতের কাছে? তার কঠিন চোখ, তার পুরুষালি চেহারা, তার কাটছাঁটা বৈষয়িক কথার ভঙ্গি, এরা সবাই মিলে কোনো প্রতিক্রিয়াই আর সৃষ্টি করে না রণজিতের মনে? এত শক্তি কি সত্যিই কোথাও ছিল তার?
বেশ ভালোই আছেন আজকাল? হঠাৎ একটা বেখাপ্পা প্রশ্ন এল রণজিতের কাছ থেকে।
তীব্র প্রতিবাদের ভঙ্গিতে কুঁজো ঘাড়টাকে সোজা করে বসল কিরণলেখা। ধারালো গলায় বললে, খারাপ থাকবার কী কারণ আছে বলুন?
আঘাতটা কি লাগল রণজিৎকে? বোঝা গেল না। একটা চুরুট ধরাতে ধরাতে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে কাঁধটা ঝাঁকাল এক বার, না, এমনিই জিজ্ঞাসা করছিলাম।
ও।
আবার চুপচাপ। টিপটের নল দিয়ে রেশমি সুতোর মতো বাদামি রঙের ধোঁয়া। সুইট-পির গন্ধ। প্লাসটিকের টেবিল ক্লথে বিচিত্র কারুকাজ। রাস্তায় মোটরের হর্ন।
ঠোঁট থেকে চুরুটটা নামিয়ে তার সোনালি লেবেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রণজিৎ। তারপর, টাইগার হিল থেকে সানরাইজ দেখেছেন?
না।
যাবেন কাল? রণজিৎ হঠাৎ ঝুঁকে পড়ল সামনে।
এতক্ষণে নিজের মধ্যে একটা উত্তাপ অনুভব করল কিরণলেখা, এতক্ষণ পরে বুঝি চায়ের প্রতিক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। চশমার কাচের তলায় দেখা যাচ্ছে রণজিতের চোখ। ব্রিফ নয়, হাই কোর্ট নয়, এই মুহূর্তে কি নিজের হারিয়ে-যাওয়া ধূলিধূসর বেহালাটাকে মনে পড়ল রণজিতের?
কাল কখন? চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে কিরণলেখা জানতে চাইল।
অন্তত রাত চারটের মধ্যে বেরুতেই হবে। নইলে দেরি হয়ে যাবে পৌঁছুতে।
অত রাতে?
রণজিৎ হাসল, ভয় করবে?
ভয়! আবার ছাড়িয়ে যেতে চাইছে রণজিৎ, আবার মাথাটা তুলতে চাইছে অনেক ওপরে। কিন্তু বাইরে এখন আর কুয়াশা নেই। হঠাৎ রোদ উঠেছে—তীব্র খরধার রোদ। এই রোদে মনে পড়ে কলকাতাকে। কলেজস্ট্রিট। ডবলডেকার। ইউনিভার্সিটি—লিফট। পেছন থেকে বাংলা ডিপার্টমেন্টের কবি কবি চেহারার হ্যাংলা ছেলেটার ছুড়ে-দেওয়া মন্তব্য। একটা ঘৃণার দৃষ্টি ফেলতেও অনুকম্পা হয়।
বেশ, যাব।
রণজিৎ বললে, ধন্যবাদ। ক-দিন থেকেই প্ল্যান করছি, কিন্তু একা একা যেতে কিছুতেই উৎসাহ হয় না। তাহলে কাল ভোরেই আমি গাড়ি নিয়ে আসব লাডেন লা রোডে। হর্ন দেব। আপনি রেডি হয়ে থাকবেন।
আচ্ছা।
কিন্তু ভবতোষের কথা কেউ তুলল না। রণজিৎ বলল না, মনে করিয়ে দিল না কিরণলেখা। রণজিতের সঙ্গে এই শক্তিপরীক্ষায় কোথাও কোনো ভূমিকা নেই ভবতোষের। এমনকী দর্শকেরও না। শুধু এক বারের জন্যে কিরণলেখা ভাবল, ভবতোষের দাড়িগুলো বড়ো হয়ে গেছে, হয়তো একখানা ব্লেড দরকার ওর। আর দরকার এক টিন সিগারেট, আজকের খবরের কাগজ।
কিরণলেখা বললে, চলুন, ওঠা যাক এবার। আর বেশি দেরি হলে বাজারে ভালো মাছ কিছুই পড়ে থাকবে না।
লেপমুড়ি দিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে ভবতোষ। ঘুমুচ্ছে কি না ঠিক বোঝা যায় না। অথবা রাত্রের ঘুমটাকে দিন-রাত্রির একটা ক্লান্তিকর ঝিমুনির মধ্যে প্রসারিত করে নিয়েছে সে। এক বার ইচ্ছে করল মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় একটুখানি। কিন্তু বাইরে থেকে ঘুরে আসা ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া হয়তো ভালো লাগবে না ভবতোষের।
