আর নিজের ভয়াবহ মনোমন্থনের মধ্যে মধ্যে ভবতোষ ভেবেছে তার নিজের অক্ষমতা সংসারে তো এতটুকুও ফাঁকার সৃষ্টি করেনি। এতবড়ো যন্ত্রটার একটা চাকাও কোথাও অচল হয়ে যায়নি তো। এক বারও তো কিরণলেখা মুখ ফুটে বলেনি, সংসারে বড্ড টানাটানি যাচ্ছে আজকাল। তাহলে কি ভবতোষ আদৌ না থাকলেও কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটত না কিরণলেখার? কল্পনা করতেই আহত পুরুষ আর্তনাদ করে উঠেছে বুকের ভেতরে। একটা তীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় চমকে মনে হয়েছে—তাহলে আজ সে শুধুই ভার, একটা অনাবশ্যক বোঝা ছাড়া কিছুই নয়।
শেষপর্যন্ত চোখ পড়েছে কিরণলেখার। ভবতোষের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ডাক্তার এসেছে বাড়িতে।
চেঞ্জে নিয়ে যান। একটা টনিকের সঙ্গে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন।
চেঞ্জে! উচ্চকিত হয়ে প্রতিধ্বনি করেছে ভবতোষ। ফুটবল ম্যাচ দেখা ছেড়ে দেবার পর এত জোরে সে কখনো আর চিৎকার করে ওঠেনি।
চোখের দৃষ্টিতে স্তব্ধ উগ্রতাটাকে উগ্রতর করে তাকিয়েছে কিরণলেখা। শীতল কণ্ঠে বলেছে, সে যা করার আমি করব। তোমাকে ভাবতে হবে না।
ভাবতেও হয়নি ভবতোষের। কোথা থেকে টাকা জোগাড় করেছে, ঘরভাড়া করেছে, তারপর এই গরমের ছুটিতে ভবতোষকে নিয়ে এসেছে দার্জিলিঙে। সেসব কিরণলেখার একার দায়িত্ব। একটা টাকার হিসাব করতে হয়নি, এমনকী পথে কুলির সঙ্গে দরাদরি পর্যন্ত করতে হয়নি ভবতোষকে। চুক্তির পর্ব শেষ হয়ে গেছে, এখন বশ্যতার পালা। আগে নিজের ব্যক্তিত্বকে তলোয়ারের মতো শান দিয়ে রাখতে হত, এখন চলছে কাটা সৈনিকের ভূমিকা। কিরণলেখার স্নেহচ্ছায়ায় এখন তার তিলে তিলে নির্বাণ আর অলস কল্পনায় ইন্ধন দিয়ে দিয়ে ভাবা নিজের সমাধিফলকে উৎকীর্ণ করবার মতো দুটো ভালো কবিতার লাইন কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
মেঝে থেকে এক বার খবরের কাগজটাকে কুড়িয়ে নেবার কথা ভাবল ভবতোষ, কিন্তু উৎসাহ পেল না। নিস্তব্ধ ঘরের শীতল অবসাদের মধ্যে সে তলিয়ে রইল, আর তাকিয়ে দেখতে লাগল বাইরের নীলাভ কুয়াশার আবছা রেখায় আঁকা নিস্পন্দ ইলেকট্রিকের তার, একটা পাইন গাছের কালির ছোপ, একটা ভাঙা মোটরের হুড আর…
কিরণলেখা জানত রণজিৎ অপেক্ষা করবে। কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, এমনকী এক বিন্দু আভাস পর্যন্ত দেয়নি কিরণলেখা। তবু লাডেন লা রোডের রেলিং ধরে রণজিৎ দাঁড়িয়ে ছিল। এই অল্প অল্প বৃষ্টি, থেকে থেকে ঘনিয়ে আসা কুয়াশা, কোনো এক কাক-জ্যোৎস্নায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা কবরের মতো নীচের বাড়িগুলো আর দূরের ঝাপসা বিষণ্ণ পাহাড়—এরা এমন কিছু আকর্ষণের বস্তু নয় রণজিতের কাছে। প্রায় নির্জন পথের ওপর রণজিতের মূর্তিটা কুয়াশায় অদ্ভুত দীর্ঘকায় মনে হল। যেন বিরাট কোনো এক সমাধিভূমিতে একটা প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে।
এই বৃষ্টির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন?
কেমন চমকে উঠল রণজিৎ। কেন, কে জানে! হয়তো আগে থেকে কিরণলেখাকে দেখতে পায়নি, সেইজন্যেই; হয়তো কিরণলেখা আসতে পারে এই কল্পনাতেই তদগত হয়ে ছিল সে—এসে পড়ার বাস্তবতাকে ঠিক সহজভাবে মেনে নিতে পারল না।
রণজিৎ বললে, আপনি?
অভিনয়। কিরণলেখা অল্প একটু হাসল। মাছের সন্ধানে বেরিয়েছি। যাব বাজারের দিকে।
মাছ? এই দুপুর বেলায়?
দার্জিলিঙের বাজারে এই সময়েই মাছ আসে। আপনি হোটেলে থাকেন, তাই এসব খবর জানবার দরকার হয় না। কিন্তু এই বৃষ্টির ভেতরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছেন আপনি?
আমি? রণজিৎ কেমন ঘোলা চোখে তাকাল। অথবা ওর চশমার কাচের ওপর রেণু রেণু বৃষ্টি জমেছে বলেই অমন আবছা দেখাল ওর চোখ। দার্জিলিঙে এমনি অল্প অল্প বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে।
অভিনয়? কিরণলেখা এবার আর হাসল না, ফেলল শান্ত বিশ্লেষণের দৃষ্টি।
কিন্তু ঠাণ্ডা লাগতে পারে। জ্বর হয়ে বসতে পারে চট করে।
জ্বর? আজ কুড়ি বছরের মধ্যে এক দিনও আমার মধ্যে ধরেনি। বেশ ভরাট পরিতৃপ্ত গলায় বললে রণজিৎ। আবার খানিকটা কুয়াশা এসে রণজিৎকে আড়াল করে দিলে, আবার তাকে অদ্ভুতরকম দীর্ঘকায় বলে মনে হল কিরণলেখার।
কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হল। হঠাৎ যেন কিরণলেখা অনুভব করল, এখনই দুটো বিশাল বলিষ্ঠ বাহুতে রণজিৎ তাকে তুলে নিতে পারে। তারপর নিছক খেয়ালের প্রেরণায় ছুড়ে দিতে পারে সামনের কোনো একটা অতল শূন্যতার ভেতরে। এবং পরক্ষণেই যেন একটা প্রকান্ড কৌতুকের ব্যাপার ঘটেছে এমনিভাবে ওই কুয়াশা, ওই বাড়িগুলো, দূরের ওই বিষণ্ণ পাহাড় সব কিছুকে চকিত করে দিয়ে হেসে উঠতে পারে হা-হা করে।
কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাইল কিরণলেখাই। আর কতদিন থাকবেন এখানে?
কিছু ঠিক করিনি এ পর্যন্ত। এখনও লম্বা ছুটি রয়েছে হাই কোর্টের। যদি ভালো লাগে হয়তো আরও দু-সপ্তাহ কাটিয়ে যেতে পারি।
পোস্টগ্র্যাজুয়েটের সে-রণজিৎ নয়—কিরণলেখা ভাবল। কোনো মেয়ে কাছে গিয়ে লেকচার-নোটের খাতা চাইলে যে-রণজিতের মুখের রং বদলাত বহুরূপীর মতো, করিডোরে কথা কইতে গেলে যার কপালে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করে উঠত, টেলিফোনে কিরণলেখাকে প্রেমের কথা বলতে গিয়ে যে নিজে তিন-তিন বার কানেকশন কেটে দিয়েছে, সেই লাজুক শান্ত ছাত্রটির সঙ্গে কোনো মিল নেই এই রণজিতের। জীবনের নতুন নাটকে আজ সম্পূর্ণ নতুন ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটেছে তার। এখন সে হাই কোর্টের অ্যাডভোকেট। আত্মবিশ্বাস এসেছে, এসেছে আত্মপ্রকাশের শক্তি। জনশ্রুতি শোনা যায়, ভবতোষের সঙ্গে কিরণলেখার বিয়ের পরে সমানে তিন দিন ধরে বেহালা বাজিয়েছিল রণজিৎ। আজ সেই বেহালার স্মৃতিচিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো এখন রিভলবারের লাইসেন্স নিয়েছে রণজিৎ, হয়তো আজকাল সে গ্রে-হাউণ্ড পোষে বাড়িতে।
