ঘরটা চুপচাপ এইবার। আঙুলের চাপে একটুও খরখর করে উঠল না কাগজটা। বাইরে নিঃশব্দ বৃষ্টি। সব চুপ। কাচের জানলার বাইরে আবছা আবছা পেনসিলের টানের মতো ইলেকট্রিকের তারগুলো, একটা মেঘলা পাইন গাছের চুড়ো, রাস্তার ওপারে একখানা ভাঙা মোটরের হুড—সব কিছু যেন নিঝুম হয়ে গেল একসঙ্গে। আধশোয়া শরীরে একটা স্তব্ধ সমকোণ রচনা করে জুতোর বিজ্ঞাপনে ডুবে রইল ভবতোষ।
আর কী করতে পারে, কী করবার আছে ওর। দেড় বছর যদি চাকরি না থাকে, যদি দৈনিক কয়েকটা সিগারেটের পয়সার জন্যে হাত পাততে হয় স্ত্রীর কাছে, যদি জীবনটা চারদিক থেকে একটা শক্ত থাবার মতো কুঁকড়ে আসতে থাকে—তাহলে? তাহলে তিন দিনের পুরোনো একটা খবরের কাগজকে পরীক্ষার পড়ার মতো লাইনে লাইনে মুখস্থ করা ছাড়া কী করা চলে আর! সিনেমার খবর, জুতোর দাম, পাটের বাজার, জেনেভা বৈঠক আর সুন্দরবনের দুর্ভিক্ষ সমস্ত একাকার হয়ে যায়। শুধু থেকে থেকে গালে দু-দিনের দাড়ি অস্বস্তির চমক দিয়ে ওঠে, মুহূর্তের জন্যে তালগোল পাকিয়ে যায় খবরের কাগজের লাইনগুলো, আর মনে হয় বলা যায় না, ছ-পয়সার একখানা ব্লেডের কথা কিছুতেই বলা যায় না কিরণলেখাকে।
আশি ডিগ্রির বিস্তৃতি থেকে এবার ষাট ডিগ্রিতে নিজেকে সংক্ষিপ্ত করে আনল ভবতোষ। কাগজটা খসে পড়ল মেঝের উপর। আবার খানিকটা খচ খচ খরখর শব্দ। কেমনে যেন কানে লাগল ওর। ভবতোষ আজকাল অদ্ভুতরকম স্পর্শাতুর হয়ে উঠেছে। সেদিন জনালার কাচে ডেঙ্গুর মশার মতো কী-একটা বসেছিল হঠাৎ মনে হয়েছিল ওইটে গায়ে এসে পড়লে অস্বাভাবিক গলায় একটা চিৎকার করে উঠবে সে।
এই কি নার্ভাস ব্রেকডাউন? এরই জন্যে কি মানুষ জেগে জেগে দুঃস্বপ্ন দেখে? এরই জন্যে কি একটা কালো বেড়াল যখন-তখন ঘরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায়, দেওয়ালে নিজের ফোটোটা বদলে গিয়ে একটা মরামানুষের মুখে রূপান্তরিত হয়ে যায়, এই জনেই কি নিজের গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে করে দু-হাতে? একটা বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা জাগিয়ে তুলে নিজেকে বিশ্লেষণ করতে চাইল ভবতোষ।
যে-কারণে একদিন কিরণলেখা তীব্র আকর্ষণে টেনেছিল ভবতোষকে, আজ ঠিক সেই কারণেই নিজেকে বড়ো বেশি পরাভূত মনে হয় ভবতোষের। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের দেড়শো ছেলের ঈর্ষাভরা দৃষ্টির সামনে কিরণলেখা ভবতোষের জীবনে এসেছিল। ঠিক স্ত্রী হয়ে নয় প্রতিপক্ষের মতো। ভবতোষকে সে মেনে নেবে না—মানিয়ে নিতে হবে। পুরুষের মতো লম্বা শক্ত চেহারা, চোখের দৃষ্টিতে একটা স্তব্ধ উগ্রতা, নিরলংকার কাটাছটা ভাষা। বইয়ের পাতা থেকে মিনিট খানেকের জন্যে চোখ তুলে শুনেছিল বিয়ের প্রস্তাবটা। তারপর একটা লাল পেনসিল তুলে নিয়ে মার্জিনে দাগ দিতে দিতে বলেছিল, আমার আপত্তি নেই। তবে মাস তিনেকের আগে নয়।
ভবতোষ উচ্ছ্বসিত হতে যাচ্ছিল, কিন্তু আর এক বার চোখ তুলে তাকিয়েছিল কিরণলেখা। দৃষ্টিতে একটা নিরুত্তাপ শাসন।
পড়ার সময় আর বিরক্ত কোরো না। কথা তো হয়ে গেল, এবার যেতে পারো।
কিরণলেখার হাত প্রথম মুঠোর মধ্যে নিতে পেরেছিল ভবতোষ রেজিস্ট্রেশন অফিসে। ভবতোষের হাত কাঁপছিল, কিন্তু কিরণলেখার কঠিন আঙুলগুলোতে কোথাও এতটুকু চাঞ্চল্যের ছোঁয়া ছিল না। সেদিনও নয়, তারপরও নয়। তিন বছর ধরে সহজ স্বাভাবিক চুক্তির মতো ঘর করছে দুজনে। ভবতোষ একটা চলনসই চাকরি জুটিয়েছে। মেয়েদের স্কুলে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস হয়েছে কিরণলেখা। সসম্মানে সংসার করছে দুজন, কারও কাছে। কাউকে মাথা নীচু করতে হয়নি।
তারপর চাকরি গেল ভবতোষের। অফিস থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ডালহৌসি স্কোয়ারের রেলিঙে হেলান দিয়ে। অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করতে লাগল জিপিও-র ঘড়ির কাঁটা দুটোর লাফিয়ে সরে যাওয়া। তারপর প্যাকেটের শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হল–এখন? এইবার?
অন্নাভাব হয়তো আসবে না, একটার জায়গায় নাহয় তিনটে প্রাইভেট পড়ানো জোগাড় করে নেবে কিরণলেখা। কিন্তু কোন মর্যাদা নিয়ে এখন দাঁড়িয়ে থাকবে ভবতোষ, দাঁড়াবে আত্মসম্মানের কোন শক্ত ডাঙার ওপরে? এক প্যাকেট সিগারেট, একখানা ব্লেড…
না, চাকরি আর জোটেনি। চাকরি না পাওয়ার একটা স্বাভাবিক ক্ষমতা যাদের আছে, হয়তো ভবতোষ তাদেরই একজন। দু-এক বার মুঠোর কাছাকাছি এসেও হাত পিছলে বেরিয়ে গেছে সুযোগ। শেষপর্যন্ত হাল ছেড়েই দিয়েছে ভবতোষ। কিরণলেখার কাছ থেকেই নিতে হয়েছে সিগারেটের দাম, ব্লেডের খরচ। আর চুক্তি নয়, বশ্যতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, আত্মসমর্পণ। কিরণলেখার শান্ত করুণার ছায়ায় দিনের পর দিন নিভে গেছে ভবতোষ, গভীর স্নায়বিক শ্রান্তিতে সারারাত কান পেতে শুনেছে কতগুলো মড়া সারারাত কেওড়াতলা শ্মশানঘাটে চলে গেল।
এরই নাম নার্ভাস ব্রেকডাউন। টান টান করে বাঁধা পৌরুষের তারগুলো হঠাৎ ছিঁড়ে যাওয়ার এই পরিণাম? এরই জন্যে কি দেওয়ালে নিজের ফোটোগ্রাফটাকে হঠাৎ একটা মড়ার মুখের মতো মনে হয়, এইজন্যেই কি যখন-তখন ঘরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায় একটা কালো বেড়াল, এইজন্যেই কি একটা বিষাক্ত নেশার পীড়নের মতো কখনো কখনো ইচ্ছে হয়…
কিরণলেখা কর্তব্যে ত্রুটি করেনি। এক মাসও বাকি পড়েনি বাড়িভাড়া, বাদ যায়নি এক সপ্তাহের রেশন। যেমন আসত তেমনি করেই মাংস এসেছে প্রত্যেক রবিবারে। হয়তো দুটোর জায়গায় পাঁচটা প্রাইভেট টিউশন নিয়েছে কিরণলেখা-ভবতোষ জানেও না। আগেও যেমন রাত নটার পরে সে বাড়ি ফিরত এখনও তাই ফেরে। হয়তো মাঝখানের ঘণ্টা দুয়েকের বিশ্রামটুকুও বিসর্জন দিতে হয়েছে তাকে।
