অধমকে একটু অনুগৃহীত করতে হবে। সিগারেটের ধোঁয়াটা একেবারে কম্পাউণ্ডারের মুখের ওপরেই ছেড়ে দিলেন ডাক্তার। এই উণ্ডটা একটু ড্রেস করে দিতে হবে। ধন্বন্তরির মূল্যবান সময়টা একটু নষ্ট হবে, কিন্তু এ দুর্ভাগা নিতান্তই নাচার।
ডাক্তারের ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা দুলতে লাগল। কম্পাউণ্ডার নীরবে সেলফ থেকে তুলোর প্যাকেট গজকাঠি আর আইডিনের শিশিটা তুলে নিলে।
ফাঁকা মাঠের ওপরে ঘনিয়েছে কৃষ্ণা রাত্রি। আকাশে তারার রোশনাই তেমন জ্বলছে না, লঘু বিচ্ছিন্ন মেঘ তাদের ওপর দিয়ে আবরণ টেনে দিয়েছে। কালো অন্ধকারের মধ্যে সামনের মাঠটা থেকে যেন প্রেতলোকের সন্ধান দিচ্ছে এলোমেলো আলেয়া। হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে গরম বাতাস। দিনের প্রখর উত্তাপের রেশটা জুড়িয়ে যায়নি এখনও। শেষরাত্রে বোধ হয় বৃষ্টিবাদল হবে কিছু। বহুদূরের দিগন্তে মাঝে মাঝে চমকাচ্ছে বিদ্যুতের রক্তদীপ্তি। ডিসপেন্সারির চারদিকে নিচ্ছেদ স্তব্ধতা।
অন্ধকারে চাবি ঘোরাবার শব্দ হল— খুট। হাওয়ার সঙ্গে শব্দ মিলিয়ে দরজাটাও খুলে গেল। কালো রাত্রির সঙ্গে একাকার হয়ে কম্পাউণ্ডারের ভৌতিক মূর্তিটা প্রবেশ করলে ডিসপেন্সারিতে। উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ কাঁপছে।
থেকে থেকে চমকে উঠছে হৃৎপিন্ড। কপালের আবটার ওপরে ঘামের বিন্দু জমে উঠেছে।
কিন্তু ঘাবড়ালে চলবে না, পিছোলেও চলবে না। তার শক্তির পরীক্ষা—তার আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকার। যেমন করে হোক তার রুগিকে সারিয়ে তুলতে হবে, তার প্রথম আত্মোপলব্ধির মূল্য বিচার করে দেখতে হবে। বেড়ালের মতো গুড়ি মেরে এগোতে লাগল কম্পাউণ্ডার। ওষুধের বহুবিচিত্র মিশ্র-গন্ধে-ভরা থমথমে অন্ধকার যেন তার দম আটকে আনতে লাগল। কিছু জোর করে একটা নিশ্বাস ফেলতেও ভরসা পাচ্ছে না সে। পাছে বেশি করে শব্দ হয়, পাছে এক মুহূর্তে বিদীর্ণ হয়ে যায় রাত্রির এই সমাহিত স্তব্ধতা!
তারপর, তারপর কম্পাউণ্ডারের কম্পিত হাত স্পর্শ করলে ছোটো আলমারির ডালাটা। কবজাটা ধরে একটা মোচড় দিলেই…।
টর্চলাইটের তীব্র ঝাঁকালো আলো কম্পাউণ্ডারের গায়ে এসে পড়ল বন্দুকের গুলির মতো। তড়িদবেগে লাফিয়ে উঠল কম্পাউণ্ডার। অন্ধকারের ভেতরে ডাক্তারের সংক্ষিপ্ত হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল, যেন একটা গোখরো সাপ প্রবল বেগে ছোবল বসিয়ে দিলে কোথাও।
ডাক্তার বললে, চমৎকার! ভাগ্যিস ঘুম আসছিল না বলে বারান্দার অন্ধকারে চুপচাপ পড়ে ছিলাম, সেইজন্যই তো ধন্বন্তরির এ দেবলীলাটা দেখতে পেলাম। চুরিচামারিতে প্র্যাকটিসটা বেশ জমে উঠেছে তাহলে!
কম্পাউণ্ডারের বিবর্ণ মুখের ওপর টর্চের আলো আগুনের জ্বালার মতো জ্বলতে লাগল।
ভালো, ভালো। ডাক্তার শান্তস্বরে বললে, কিন্তু ভদ্রলোকের ছেলেকে আমি জেলে পাঠাতে চাই না। তবে কাল থেকে ডিসপেন্সারির চাবিটাও আমার কাছে থাকবে আর একটা চৌকিদারেরও বন্দোবস্ত হবে। তা হলেই আর ওষুধ চুরির ভয় থাকবে না, কী বলেন কম্পাউণ্ডারবাবু?
পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল কম্পাউণ্ডার। শরীরটা একচুল নড়ল না, একটা নিশ্বাস পড়ল না পর্যন্ত।
পরদিন দুপুরে কম্পাউণ্ডারের বাড়ি থেকে একটা বিশ্রী মড়াকান্নার শব্দে ডাক্তার ছুটে এলেন।
কী হল? ব্যাপার কী?
কম্পাউণ্ডার কোনো জবাব দিলে না। সামনে মেঝের ওপর কম্পাউণ্ডারের স্ত্রী হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। বড়ো বড়ো শ্বাস উঠছে-পড়ছে, চোখ দুটো ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে তার। সমস্ত গাল মুখ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে—রক্তবমি করেছে সে।
ডাক্তার শিউরে উঠলেন। কম্পাউণ্ডারকে একটা সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, কথা বলছেন না যে? ব্যাপার কী?
অর্থহীন দৃষ্টিতে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে কম্পাউণ্ডার বললে, পেটে একটা যন্ত্রণা হচ্ছিল, ঠিক ডায়গোনাইজ করতে পারিনি। ওষুধ দিয়েছিলাম।
ওষুধ! কী ওষুধ?
তা তো জানি না। আপনার ছোটো আলমারিতে তো হাত দেবার উপায় নেই। তাই সামনে যা পেয়েছিলাম— আইডিন, মরফিয়া, রেকটিফায়েড স্পিরিট, কার্বলিক অ্যাসিড, স্ট্রিকনিন, সিঙ্কোনা সব মিলিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করবার চেষ্টা করেছিলাম।
ডাক্তার পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন, আপনি মার্ডারার, আপনার স্ত্রীকে নিজের হাতে আপনি খুন করেছেন! আপনার ফাঁসি হওয়া উচিত, Yes, you deserve it! এক্সপেরিমেন্ট! কেন আপনি আমাকে এক বার জিজ্ঞাসা করলেন না? এক বার ডাকলেন না?
ঘষা চোখে, জীর্ণ গলায় আটাশ টাকার কম্পাউণ্ডার জবাব দিলে, আপনাকে ভিজিট দেবার পয়সা ছিল না।
ধস
বাইরে অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছিল। গায়ের গরম ব্লাউজটার উপর পাতলা বর্ষাতিটা চাপিয়ে দোরগোড়া পর্যন্ত এগিয়ে গেল কিরণলেখা। তারপর থেমে দাঁড়াল দু-সেকেণ্ডের জন্যে। মুখ না ফিরিয়েই বললে, আমি ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ফিরে আসব।
কেউ সাড়া দিল না, সাড়া পাওয়ার জন্যে অপেক্ষাও করল না কিরণলেখা! এক ঝলক হাওয়ার মতো নিঃশব্দে দরজাটা সামান্য একটু ফাঁক করে সে বেরিয়ে গেল রাস্তায়। নীল বর্ষাতিটা ডুবে গেল নীলচে কুয়াশার আড়ালে।
এক বার সেদিকে তাকিয়ে দেখল কি দেখল না ভবতোষ। বালিশে পিঠ উঁচু করে যেমনভাবে শুয়ে ছিল ঠিক তেমনিভাবে শুয়ে রইল। শুধু তার হাতে খবরের কাগজের একটা পাতা উলটে গেল এক বার। কাগজের খচ খচ আওয়াজটা কেমন তীক্ষ্ণ ঠেকল কানে, এক বারের জন্যে কুঁকড়ে উঠল ভবতোষের কপাল, তারপর জেনেভা বৈঠকে কেন্দ্রিত মনটা অসতর্কভাবে পিছলে পড়ল একটা কোম্পানির রিডাকশন সেলের বিজ্ঞাপনে।
