ডাক্তার হয়েছেন? প্র্যাকটিস করা হচ্ছে? একটা প্রেসক্রিপশন রিপিট করতে পর্যন্ত ভুল করেন, লজ্জা হয় না আপনার? আর সরকারি কাজ ফেলে ধন্বন্তরি হওয়ার চেষ্টায় আছেন। যদি মন দিয়ে কাজ না করেন তাহলে আপনার নামে রিপোর্ট আমাকে পাঠাতেই হবে, একথা আর এক বার জানিয়ে যাচ্ছি।
গর্জনে ঘর কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তার। বাইরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাঁর জুতোর শব্দ বাজতে লাগল।
কম্পাউণ্ডারের ঘোলা চোখে এতদিন পরে সত্যিকারের আগুন ঝিকিয়ে উঠল, বাঁকা মেরুদন্ডটাকে আশ্রয় করে বয়ে গেল পৌরুষের দীপ্তি। ডাক্তারকে সে বুঝতে পেরেছে। ঈর্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা! এ এক নতুন অস্ত্র সে হাতে পেয়েছে। এতদিন সে ডাক্তারকে ভয় করে এসেছে, এইবার ডাক্তার ভয় করতে শুরু করেছে তাকে। তার প্র্যাকটিসের ফলে আজ ডাক্তারের প্রেস্টিজ এবং পসার বিপন্ন হতে বসেছে।
ভয় হল না কম্পাউণ্ডারের, দুঃখও না। বহুদিন পরে পিঠটাকে সোজা করে দৃঢ় হয়ে দাঁড়াল সে। এতগুলো লোকের সামনে ডাক্তার তাকে অপমান করে গেছে, কিন্তু তারই সঙ্গে নিজের মধ্যে একটা কঠিন লৌহবর্মের অস্তিত্ব অনুভব করেছে কম্পাউণ্ডার। যে-বর্মে লেগে তুচ্ছতার সমস্ত আঘাতগুলো অতি সহজেই প্রতিহত হয়ে যায়। এতদিন পরে স্বীকৃত হয়ে গেছে তার জীবনের, তার স্বাতন্ত্রের দাবি। এইবার নিজেকে প্রমাণ করবার সময় এসেছে। তার। আটত্রিশ বৎসর বয়সে আটাশ টাকার পাথর চাপা পড়েই তার মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু হয়নি। এইবার কাজ করতে হবে তাকে, কিছু-একটা করতেই হবে।
কম্পাউণ্ডিং রুমে ঢুকে পাশের আলমারিগুলোর দিকে তাকাল সে। খালি শিশি বোতলগুলো স্তরে স্তরে সাজানো। ওখানে কিছু করবার নেই, উপায়ও নেই কিছু করবার। নিজেকে প্রমাণ করবার শক্তি নেই তার। ছোটো আলমারির চাবি আগেই হস্তগত করেছে। ডাক্তার, দু-চারটে ভালো ওষুধপত্র যে সেখান থেকে সংগ্রহ করা যাবে সে-পথও বন্ধ।
কিন্তু তবু, তবু চেষ্টা করতে হবে। অস্তিত্বের দাবি আজ প্রমাণিত হয়ে গেছে। ভিটামিন বির অভাবে তার স্ত্রীর বিবর্ণ পাড়ুর মুখের ওপরে ছড়াচ্ছে মৃত্যুর ছায়া। ছেলে-মেয়েগুলোর সর্বাঙ্গে সংক্রামক অস্বাস্থ্যের কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ। শুধু তার ঘরে নয়—দিকে দিকে, যতদূর চোখ যায় ততদূর-রৌদ্রদগ্ধ শূন্য প্রান্তরের মতো একটা শ্মশান আকীর্ণ হয়ে পড়েছে। কিছু কি করবার নেই, কিছুই না?
দাঁতে দাঁত চেপে কম্পাউণ্ডার ভাবতে লাগল। আঙুলগুলো অধৈর্যভাবে আঁকড়ে ধরতে লাগল মলম-তৈরি-করা ছুরিটার হাড়ের বাঁটটা। আর কিছু না হোক এইটে দিয়ে একটা মানুষও তো খুন করতে পারে সে!
কিন্তু ডাক্তারের সঙ্গে ঠোকাঠুকির আর বিরাম নেই।
কী করে রেখেছেন টেবিলগুলো? দেখুন দেখি এক বার। একটা কাগজ মানুষে খুঁজে পায় এখানে!
কম্পাউণ্ডার নিরুত্তর।
বলেছিলাম প্রেসক্রিপশনের বইটা ফুরিয়ে গেছে, একটা নতুন প্যাড বার করে রাখবেন। কিন্তু কোনো দিকে লক্ষই নেই আপনার। খালি ভাবছেন কখন কোন ফাঁকে বেরিয়ে লাউ কুমড়োর ব্যবস্থা করে আসবেন। নাঃ, আপনাকে দিয়ে আমার পোষাবে না মশাই হয় আপনাকে ট্রান্সফার করুক, নয় আমাকে। এ ছাড়া আর তো কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না।
সার্ভিং টেবিলটার কাছে দাঁড়িয়ে কম্পাউণ্ডার ভাবতে লাগল— ঠিক কথা। আর কোনো পথ নেই। এক আকাশে দুই সূর্য শোভা পেতে পারে না। আজ তার নবজন্ম হয়েছে, সে শুধু ডাক্তারের সমকক্ষ নয়, তার উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। কাগজের বিদ্যাই বড়ো নয়, হাতের বিদ্যা তার চাইতে ঢের বেশি। এই সত্যকে সে প্রচার করবে, সে প্রতিষ্ঠা করবে।
গতানুগতিক বাঁধা নিয়মে একই ওষুধ নানা শিশিতে ঢালতে ঢালতে কম্পাউণ্ডার তার নতুন রোগীর কথা চিন্তা করতে লাগল। পুরোনো অসুখ, বহুদিন থেকে ভুগছে। ডাক্তার খগেন দাস তিন মাস নিয়মিত ভিজিট গুনে নিয়েছে, কিন্তু কিছু করতে পারেনি। এবার তার পালা।
কিছু করা চাই, কিছু করতে হবে অথচ ওষুধ নেই, উপায় নেই! কম্পাউণ্ডারের দাঁতে দাঁত আবার চেপে বসতে লাগল। উপায় নেই! ওষুধ চাই—ভালো ওষুধ। এক বার সুযোগ পেলে সে দেখিয়ে দিতে পারে তারও ক্ষমতা আছে। কম্পাউণ্ডারের মাথার ভেতরে রক্তের উচ্ছাস যেন ফেটে পড়তে লাগল। কিছু তাকে করতেই হবে—যেমন করে হোক, যে উপায়েই হোক।
ছোটো আলমারিটা খুঁজলে কিছু মিলতে পারে, কিন্তু তার চাবিটা আগেই হাত করেছে ডাক্তার। সবদিক থেকে তার পথরোধ করে দাঁড়াতে চায়। বেশ, এই ভালো। এ বাধা ভেঙে সেও এগিয়ে যেতে জানে, সেও…
বলি ও কম্পাউণ্ডারবাবু, ও সহস্ৰমারি ধন্বন্তরি মশাই! কুৎসিত কটুগলায় ডাক্তার তাকে ডাকছে। কম্পাউণ্ডারের কপালের রেখাগুলো কুঁচকে উঠল এক বার, তারপর সহজ স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিলে, ডাকছেন আমাকে?
হ্যাঁ, ডাকছিলাম তো অনেকক্ষণ থেকে, কিন্তু আপনি তা শুনতে পাননি বোধ হয়। বিকৃত স্বরে ডাক্তার বলে যেতে লাগলেন, আজকাল আপনি একেবারে স্যার নীলরতন সরকার হয়ে উঠেছেন, এসব গরিবের ডাক আপনাদের মতো বড়ো বড়ো ডাক্তারের কানে পৌঁছুবে কেন!
কম্পাউণ্ডারের জীর্ণ হাতে দুর্বল মাংসপেশি আর রক্তহীন শিরাগুলো যেন অকস্মাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। প্রচন্ড বেগে একটা ঘুসি সে ডাক্তারের মুখের ওপরে বসিয়ে দেবে না কি! কিন্তু কিছুই করলে না কম্পাউণ্ডার, শুধু তেমনি নিষ্কম্প গলায় বললে, কী করতে হবে?
