এই যে ধন্বন্তরি, কীরকম চিকিৎসাপত্তর চলছে?
উত্তরে বেড়ানো মুখে একটুখানি চরিতার্থতার হাসি হেসেছে কম্পাউণ্ডার।
ডাক্তার আরও রসান দিয়ে বলেছে, চিত্রগুপ্তের সঙ্গে ধন্বন্তরির বেশ বন্ধুত্ব দেখা যাচ্ছে। তা বেশ, তা বেশ। আজ ক-টি রোগী ভবপারে যাত্রা করল?
কম্পাউণ্ডার এবারে সংক্ষেপে জবাব দিয়েছে, আপনাদের আশীর্বাদ।
টেবিলের ওপরে পা দুটো তুলে দিয়ে উচ্চাঙ্গের হাসি হেসেছে ডাক্তার। উপদেশ দিয়ে বলেছে, এ কাজ এত সোজা নয় মশাই, তা হলে লোকে আর এত খরচপত্তর করে ডাক্তারি পড়তে যেত না, হাতুড়ে বিদ্যে নিয়েই করে খেতে পারত। লোকের জীবন-মরণের ব্যাপার–ইয়ার্কি নয়। ছাগল দিয়ে কি কখনো হালচাষ হয়? নিজের ওজন বুঝে কাজ করবেন। সহস্ৰমারি হয়ে পটাপট রুগি মারতে শুরু করলে শেষে প্র্যাকটিস চালাবেন কাদের নিয়ে?
কিন্তু ক-দিন যেতে-না-যেতেই উচ্চাঙ্গের হাসিটা বন্ধ হয়ে গেল ডাক্তারের। ভীষণ সত্যটা ক্রমে আত্মপ্রকাশ করতে লাগল। কম্পাউণ্ডারের অত্যাচারে ডাক্তারের প্র্যাকটিস বন্ধ হবার উপক্রম।
খগেন দাস এলএমএফ-এর অবস্থাও যে খুব সমদ্ধ তা নয়। প্রভিডেন্ট ফাণ্ড কাটা গিয়ে মাইনে মেলে বাষট্টি টাকা বারো আনা। সুতরাং প্র্যাকটিসের ওপরই তারও নির্ভর। কিন্তু কম্পাউণ্ডার অক্টোপাসের মতো যেভাবে চারদিকে বাহু বাড়াচ্ছে তাতে চিন্তিত হবার কারণ ঘটছে। আট আনার ডাক্তার ডাকবার আগেই ছুটে যায়, সুতরাং বিস্তর সাধাসাধি করে দু টাকার ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ নেই—আশপাশের লোকের মনে এই বিশ্বাসটাই বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এ ঝড়ের সংকেত।
অবস্থার গুরুত্বটা কল্পনা করতেই রাগে ডাক্তারের ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত জ্বালা করে উঠল। আচ্ছা বেকুব এই পাড়াগেঁয়ে হতভাগাগুলো। ভেবেছে ওই কম্পাউণ্ডারই তাদের ত্রাণকর্তা। যে লোকটা ডাক্তারির ক অক্ষরটা অবধি জানে না, মিক্সচার মলম তৈরি করে আর ব্যাণ্ডেজ বেঁধে হাত পাকিয়েছে খালি, তাকেই ওরা ভবার্ণবের কান্ডারি ঠাউরে বসল শেষটাতে! অকৃতজ্ঞ অপদার্থের দল যত! পৃথিবীতে ভালো লোকের আর জায়গা নেই দেখা যাচ্ছে।
ক্রোধের উত্তেজনায় মাথার দু-গাছা কাঁচা চুল ঠিক ব্রহ্মতালুর ওপরটা থেকে উপড়ে আনলেন ডাক্তার। কম্পাউণ্ডারের ওপরে একটা বিষাক্ত বিদ্বেষে এক মুহূর্তে সমস্ত মনটা কালো হয়ে গেছে। নাঃ, বড় বাড়াবাড়ি হচ্ছে, এর আর প্রশ্রয় দেওয়া চলে না। যাহোক একটা ব্যবস্থা করতেই হবে, এবং সেটা অবিলম্বে।
পর পর তিনটে সিগারেট শেষ করে খগেন দাস আত্মস্থ হলেন খানিকটা। ইচ্ছে করলে একটা কলমের খোঁচাতেই তিনি কম্পাউণ্ডারের চাকরি খেয়ে দিতে পারেন, দিতে পারেন সমস্ত লম্বাই-চওড়াই বন্ধ করে। কিন্তু অতটা অবিবেচক নন তিনি, একটা লোকের অন্ন মারবার মতো অভিপ্রায় তাঁর নেই। আগে একটু ওয়ার্নিং দেওয়া দরকার, তারপর…
কিন্তু ওয়ার্নিংটাই-বা দেওয়া যাবে কেমন করে? আসল কথাটা কম্পাউণ্ডারকে বলা যাবে, আত্মসম্মানে বাধে। ডাক্তারের মনে হল সেটা করুণাভিক্ষার শামিল। সুতরাং অন্য উপায় অবলম্বন করতে হবে।
পাড়াগাঁয়ের ডিসপেন্সারি। সাতটায় খোলবার আইন আছে, কিন্তু পৃথিবীতে আরও অসংখ্য আইনের মতোই এটাকেও কেউ কখনো মনে রাখে না। আটটার সময় কম্পাউণ্ডার এসে চাবি খোলে, চা খেয়ে ডাক্তারের পৌঁছুতে পৌঁছুতে নটা বেজে যায়। আবহমানকাল থেকে এই রীতিটাই চলে আসছে।
হঠাৎ এর ব্যতিক্রম হয়ে গেল।
ডিসপেন্সারি খোলার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার এসে ঢুকলেন। ডাকলেন, কম্পাউণ্ডারবাবু?
কম্পাউণ্ডার আশ্চর্য হয়ে গেল। সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলে, আজ এত সকাল সকাল এলেন যে?
সকাল সকাল! বজ্রগম্ভীর স্বরে ডাক্তার বললেন, ক-টা বেজেছে খেয়াল আছে?
দেওয়ালে ঘড়িটার দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে কম্পাউণ্ডার জবাব দিলে, এই তো আটটা বাজল।
আটটা, কিন্তু ক-টার সময় খোলবার রুল আছে, সেটা জানেন কি?
কম্পাউণ্ডার বিহব্বলদৃষ্টি ফেলল ডাক্তারের মুখের ওপর, বরাবরই তো…
বরাবর! বরাবর এমনি বেআইনি কাজ করেই মাসে মাসে মাইনে গুনে নেবেন? ডিসপেন্সারি আপনার ইয়ের নয় যে নবাবের মতো যখন খুশি এসে অনুগ্রহ করে দোর খুলবেন। এটা পাবলিকের ব্যাপার। কাল থেকে ঠিক নিয়মমতো যদি ডিসপেন্সারি খোলা না হয় তাহলে আপনার নামে আমি রিপোর্ট করতে বাধ্য হব।
তেমনি বিহ্বলভাবে কম্পাউণ্ডার বললে, কিন্তু আপনি তো আগে আমাকে…
আমি বলতে যাব কেন? আপনার ডিউটি নিজে বোঝেন না আপনি? আপনার নিজের একটু রেসপন্সিবিলিটি নেই? ডাক্তারের কন্ঠ যেন বিষ হয়ে ঝরে পড়তে লাগল, ওদিকে তো দিনরাত এপাড়া-ওপাড়া খুব রুগি দেখে বেড়াচ্ছেন, কাঁচকলা আর চালকুমড়ো জোগাড় করছেন। অত চালকুমড়ো খাওয়ার শখ হয়ে থাকলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই ডিসপেন্সারি খুলে বসুন!
অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে গেছে কম্পাউণ্ডার। একটা কথাও তার মুখে জোগাচ্ছে। ওদিকে ডাক্তারের চোখ দুটো হিংস্রতায় দপ দপ করছে, সমস্ত মুখটা কুটিল হয়ে গেছে ক্ষিপ্ত ঈর্ষায়, তাঁর গলা চড়ছে পর্দায় পর্দায়। ওষুধ নেবার জন্যে যারা দোরগোড়ায় ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল, তারা অবাকবিস্ময়ে শুনে যাচ্ছে ডাক্তারের কটু-কঠোর মন্তব্যগুলো!
