স্ত্রী, পাঁচ-ছটা ছেলে-মেয়ে। দিবারাত্র স্ত্রীর ভাঙা কাঁসরের মতো গলা ক্যানক্যান করে পেতনির কান্নার মতো বাজতে থাকে। স্ত্রীর রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কম্পাউণ্ডার ভাবে ভিটামিন বি দরকার। ছেলে-মেয়েগুলোর হাতে পায়ে এগজিমা, ক্যালশিয়াম ডিফিসিয়েন্সিতে ভুগছে ওরা।
রাঙাচালের ভাত আর পেঁপের তরকারি খেয়ে একটুখানি ঘুমিয়ে নিতে চেষ্টা করে কম্পাউণ্ডার। কিন্তু ঘুম আসে না। স্ত্রীর গর্জন চলতে থাকে, ছেলে-মেয়েগুলোর চিৎকারে কানের পোকা বেরিয়ে আসবার উপক্রম করে। নাঃ, অসম্ভব!
স্ত্রীকে খানিকটা কটু গালিগালাজ এবং ছেলেপিলেদের দু-একটা চড়চাপড় বসিয়ে বিরক্ত বিতৃষ্ণ কম্পাউণ্ডার বাইরের বারান্দায় এসে বসে। একটা বিড়ি ধরিয়ে নেয়, তারপরে অর্থহীন চোখে তাকিয়ে থাকে সম্মুখে প্রসারিত অবারিত দিগন্তের দিকে।
একটা ধু-ধু করা মাঠ। বছরে একমাত্র ফলন হয় এদেশে আমন। ধানকাটা শেষ হয়ে গেলেই চক্রবাল-বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠটা পড়ে থাকে একটা বিপুল ব্যাপ্ত শ্মশানের মতো। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে রোদে পোড়া খেজুর গাছগুলো ডাইনির মতো মাথা নাড়ে, চিৎকার করে উড়ে যায় শঙ্খচিল। কোথাও হয়তো-বা একটা মরা কুকুরের চারদিকে গোল হয়ে বসে সভা করে শকুনেরা, মাঝে মাঝে সাঁড়াশির মতো লম্বা গলা বাড়িয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নাড়িভুড়ি খায়।
খরিস গোখরোর ছেঁড়া খোলসের মতো এবড়োখেবড়ো মেটে রাস্তাটা মাঠের ভেতরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ছোটো ছোটো ঘূর্ণি তার ওপরে এক-একটা প্রেতচ্ছায়ার মতো অবয়ব নিয়ে উঠতে গিয়ে মিলিয়ে যায়। ধুলোর গন্ধ বয়ে গরম বাতাস এসে কম্পাউণ্ডারের মুখে চোখে ঝটকা মারে।
কম্পাউণ্ডার ভাবে স্ত্রীর ভিটামিন বি দরকার, ছেলে-মেয়েদের ক্যালশিয়াম। কিন্তু শ্মশানের মতো ফাঁকা মাঠটার দিকে তাকিয়ে তার ভাবনাও বিস্তীর্ণ হয়ে যায়, ছাড়িয়ে যায় সাপের-গর্তে-ভরা দুখানা মেটেঘরের সীমানা। চৈত্রের আগুনঝরা আকাশ আর মাঠের ওপরে ইতস্তত ছড়ানো গোরুর হাড় হঠাৎ একটা ভয়ংকর নিষ্ঠুর সত্যকে পরিস্ফুট করে তোলে তার কাছে। মৃত্যু আসছে জলে, স্থলে, অন্তরিক্ষে, অলক্ষ হয়ে আসছে তার নিশ্চিত পদপাত। শুধু তার ঘরেই নয়, তারই পরিবারে নয়, সমস্ত দেশটাই অপমৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে টলমল করছে। চারদিক থেকে হাত বাড়িয়ে আসছে কালাজ্বর, নিমোনিয়া, কলেরা, বসন্ত, ম্যাল নিউট্রিশন। দাতব্য চিকিৎসালয়ের সিঙ্কোনার জল আর কার্মিনেটিভ মিক্সচার তারই পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে মাত্র।
ঢিলে রগগুলো হঠাৎ টানটান হয়ে উঠতে চায় কম্পাউণ্ডারের, মরা রক্তে হঠাৎ যেন জোয়ার নেমে আসতে চায়। একটা অসহ্য অস্থিরতা হাত দুটোয় নিশপিশ করতে থাকে। কিছু-একটা করা চাই, কিছু-একটা করতেই হবে। তবে ডাক্তার খগেন দাস এলএমএফ-এর মতো বসে বসে সই করা নয়, রোগীর বুকে স্টেথিসকোপ ঠেকিয়েই দুটো টাকা আদায় করে নেওয়া নয়। সে হাতেকলমে কাজ করে, কাজের মানুষ। বইপড়া বিদ্যা নিয়ে ডাক্তারি করা হয় না, তার জন্যে চাই সাধনা, চাই নিষ্ঠা।
সাধনা, নিষ্ঠা। আটাশ টাকা মাইনের কম্পাউণ্ডার হঠাৎ যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠে। কীসব এলোমেলো ভাবছিল সে, স্বপ্ন দেখছিল না কি! কী করতে পারে সে, কী করবার ক্ষমতা আছে তার? তার ঘরে মৃত্যুর ছায়ানৃত্য পরিষ্কার চোখে সে দেখতে পাচ্ছে, বুঝতে পারছে নিজের শরীরের মধ্যে ঘনিয়ে আসছে অনিবার্য ভাঙন। তার রক্তের ভেতরে বালির ডাঙা জেগে উঠছে। সেদিন আর দূরে নয়, যেদিন ওই গোরুর হাড়ে পরিকীর্ণ ফসলহীন মাঠটার মতো ধু-ধু শূন্যতা এসে দেখা দেবে। সাধনা, নিষ্ঠা! ওই ভালো ভালো কথা দুটো কবে ছেলেবেলায় সে পড়েছিল কোন বইতে, আর তা মনে করবারও উপায় নেই।
কম্পাউণ্ডারবাবু!
কম্পাউণ্ডার মুখ ফেরায়। সকালের সেই লোকটি এসে দাঁড়িয়েছে।
কী রে, খবর কী?
ছেলেটা বড়ো ছটফট করছে বাবু। ওষুধ খেতে পারছে না, গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে।
কম্পাউণ্ডার বিড়ি ধরায় আর একটা। অনাসক্ত গলায় বলে, তবে আর কী, এবার কাফনের ব্যবস্থা কর গে। তোর ছেলের হয়ে এসেছে।
লোকটা কেঁদে ফেলে, দোহাই বাবু, এক বারটি চলুন। যদি কিছু করতে পারেন।
মাঠের গরম বাতাসে একমুখ কড়া বিড়ির ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয় কম্পাউণ্ডার। বারো গন্ডা পয়সা লাগবে। তখন আট গন্ডায় রাজি হয়েছিলুম, সে তো ভালো লাগল না। গরিবের কথা বাসি হলে ফলে। বারো আনার কমে এখন পারব না। কম্পাউণ্ডারের গলার স্বর গম্ভীর হয়ে। আসতে থাকে, খগেন দাস এলএমএফ-এর ধরনটা সে আয়ত্ত করবার চেষ্টায় আছে।
তাই নাহয় দেব বাবু, মেহেরবানি করে এক বার চলুন। কম্পাউণ্ডারবাবু উঠে দাঁড়ায়। ঘর থেকে একটা ময়লা শার্ট আর পুরোনো স্টেথিসকোপ নিয়ে এসে বলে, চল।
ক্রমে এদিকে মনোযোগ আকৃষ্ট হল ডাক্তারের। কম্পাউণ্ডার তাঁর পসার মাটি করছে। দু টাকার রোগী আট আনায় দেখে আসছে। আর আট আনা হলেও-বা একটা কথা ছিল, যেখানে পয়সা পায় না সেখান থেকে লাউটা কুমড়োটা যা পারে সংগ্রহ করে আনছে। বেশ জুতসই প্র্যাকটিস জমিয়ে নিয়েছে কম্পাউণ্ডার।
প্রথম প্রথম ডাক্তার ব্যাপারটা তেমন লক্ষ করেনি, বরং কৌতুকবোধ করেছে, হাসাহাসি করেছে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। কম্পাউণ্ডারও প্র্যাকটিস করছে, আরশুলাও পাখি হয়ে উড়তে চায়! যেমন সব রোগী জুটছে, তাদের ডাক্তারও জুটেছে তেমনি! এলএমএফ খগেন দাস ঠাট্টা করে কম্পাউণ্ডারের নাম দিয়েছে ধন্বন্তরি।
