অর্থপূর্ণ গলায় ডাক্তার শুধু বললেন, হুঁ।
ডিসপেন্সারি ছোটো, আয়োজনও প্রচুর নয়। কিন্তু ডিসপেন্সারির দিকে তাকিয়েই মানুষের আধি-ব্যাধিগুলো অপেক্ষা করে থাকে না। ঋতুতে ঋতুতে মহাকবি কাল নির্ভুল নিয়মে তাঁর ঋতুসংহার কাব্য রচনা করে চলেন— ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কলেরা, বসন্ত, আমাশয়। ঠোঁটের কোণে সিগারেট ধরিয়ে ডাক্তার দ্রুতগতিতে প্রেসক্রিপশন লিখে যান। একই মিক্সচার কম্পাউণ্ডারের হাতের গুণে বহুরূপীর মতো রং বদলায়। বিশ্বাসে মিলায়ে কৃষ্ণ-রোগমুক্তি না হোক, কৃষ্ণপ্রাপ্তি ঠেকাবে কে।
ওরই ফাঁকে ফাঁকে রোগী পরীক্ষাও চলে।
দেখি, জিভ দেখি। আঃ, অতটুকু কেন? লজ্জায় যেন জিভ কাটছে। আরও বার কর একটুখানি, আর একটু—হ্যাঁ, ঠিক হয়েছে। এদিকে এসো তো বাপ, পেটটা এক বার দেখাও। ওরে বাপ রে! পিলে তো নয় যেন দেড়মনি একটা কচ্ছপ। অতবড়ো পিলে হয়ে ব্যাটা হাঁটিস কী করে?
কথা চলে, লেখাও চলে সঙ্গে সঙ্গে। কলমটার সুর বাঁধাই আছে—চোখ বুজে কাগজের ওপর ধরে দিলেই নির্ভুল প্রেসক্রিপশন বেরিয়ে আসবে, এমনকী ডাক্তারের দস্তখতটা পর্যন্ত। যেমন ডিসপেন্সারি, তেমনি ওষুধের ব্যবস্থা। দানের উপযোগী দক্ষিণা। আড়াই পয়সায় অক্রুর সংবাদ হয় না।
সার্ভিং রুমে কম্পাউণ্ডার দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের সামনে। এক হাতে মেজার গ্লাস, এক হাতে কাঁচি। টেবিলের ওপর একরাশ কাগজ, এক শিশিতে গঁদের আঠা। মেজার গ্লাসে করে ওষুধ মাপে, কাঁচি দিয়ে দাগ কাটে, কেটে আঠা দিয়ে আঁটে। প্রেসক্রিপশনগুলোও আর পড়বার দরকার হয় না আজকাল।
তবু ওরই ভেতরে নীচু গলায় রোগীদের সঙ্গে কথা জমাতে চেষ্টা করে কম্পাউণ্ডার।
কী রে, তোর ছেলে কেমন আজকাল?
জ্বর তো ছাড়ে না বাবু। আজ যদি একটু ভালো করে ওষুধ দেন…
ওষুধ–ওষুধ! আরে ওষুধে কি আর অসুখ সারে! বাড়িতে ডাক্তার নিয়ে গিয়ে দেখা, তবে তো।
রোগীর অভিভাবক ম্লান হয়ে যায়। বিষণ্ণ ক্লান্ত মুখের ওপরে স্পষ্ট হয়ে বেদনার নিবিড় ছায়া পড়ে। ক্ষীণ গলায় বলে, দু-টাকা করে ডাক্তারবাবুর ভিজিট লাগবে। কোথায় পাব বাবু?
কম্পাউণ্ডারের ঘোলা চোখ দুটো অকস্মাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। লোভের রেখায় চিহ্নিত হয়ে ওঠে সমস্ত মুখাবয়ব। একটা অবজ্ঞাবাচক ভঙ্গি করে কম্পাউণ্ডার বলে, আরে চেয়ারে বসে খালি সই করলেই যদি ডাক্তার হওয়া যেত তাহলে তো আর কথাই ছিল না। এ হল হাতেকলমের কাজ। ডাক্তারবাবু তো লিখেই খালাস, কিন্তু ভেবেচিন্তে হিসেব করে ওষুধ কে দেয় শুনি?
আজ্ঞে আপনি।
তবে? কম্পাউণ্ডারের সর্বাঙ্গে বিজয়গর্ব ফুটে ওঠে। লোকটা বোকার মতো তাকিয়ে থাকে, কম্পাউণ্ডার কী বলতে চায় বোঝবার চেষ্টা করে।
একটা ঢোঁক গিলে কম্পাউণ্ডার তেমনি নীচু গলায় বলে, আর তা ছাড়া দেখছিস তো–একেবারে চামার। চোখের পর্দা বলে বালাই নেই। গরিবের ঘরে ভাত নেই, কিন্তু দু-টাকার কমে উনি কোনো কথা কইবেন না। কাগজে সই করেও দু-দুটো টাকা—এ মামাবাড়ির আবদার নাকি!
বোকা লোক তবুও বুঝতে পারে না, তেমনি তাকিয়ে থাকে।
একটা টাকা দিতে পারবি? তাহলে আমিই যেতাম।
আপনি! মেজার গ্লাসটা টেবিলের ওপরে ঠক করে নামিয়ে রাখে কম্পাউণ্ডার। শিরাসর্বস্ব হাতের গাঁট-বেরুনো আঙুলগুলো অশান্ত চঞ্চলতায় নড়ে ওঠে।
হ্যাঁ, আমি। কেন, ওই সই-করা ডাক্তারের চাইতে বিদ্যেটা আমার কম বলে ভাবিস বুঝি? বেশ তো, টের পাইয়ে দেব একদিন। আমার হাত দিয়েই তো যায়, রুগিকে পটল তুলিয়ে দিতে এ শর্মার এক মিনিট।
আতঙ্কে চমকে ওঠে লোকটা। বলে, আজ্ঞে না না, তা নয়। গরিব মানুষ, একটা টাকা…
মুখের কথা লুফে নেয় কম্পাউণ্ডার। তা হলে বারো আনা? কী, পারবি না? নাহয় দু আনা কম দিস। আচ্ছা, আচ্ছা নাহয় ওই আট আনাই হল। এক সের ধান নয় বেচে দিস, অত ভাবছিস কেন? ছুরির ডগায় দ্রুতবেগে মলম তৈরি করতে করতে কম্পাউণ্ডার বলে, বুঝলি, আমি সই-করা ডাক্তার নই। লোকের রক্ত শুষে ভিজিট নেওয়া আমার পেশা নয়। নেহাত তোদের ভালোবাসি বলেই…।
মুখস্থ করা বুলির মতো অবলীলাক্রমে বেরিয়ে আসে বক্তৃতাটা। প্রেসক্রিপশন সার্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে কথাগুলোও অঙ্গাঙ্গি হয়ে গেছে। রেলগাড়ির ক্যানভাসারদের মতো একটানা ক্লান্ত গলায় বলে যায় কম্পাউণ্ডার। মাঝে মাঝে নিশ্বাস নেওয়ার জন্যে থামে, গলার শ্বাসনালিটা ঢেউয়ের মতো ওঠাপড়া করে, কপালের আবটার ওপরে ঘাম জমে উঠে চিকমিক করে রাজটিকার মতো।
কেউ রাজি হয়, কেউ হয় না। খুশি হয়ে ওঠে না কম্পাউণ্ডার, দুঃখিতও না। মরা নদীতে জোয়ারের জল আসা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক দিন আগে। আটত্রিশ বছরের শিরা-স্নায়ুর রক্তধারাকে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে আটাশ টাকার জগদ্দল পাথর।
বেলা আটটা থেকে বারোটা। ডাক্তার মাঝে মাঝে বেরিয়ে যায়, সাইকেল করে দুটো চারটে রোগী দেখে ঘরে আসে। কিন্তু বিশ্রাম নেই কম্পাউণ্ডারের, অবকাশও নেই। হাত চলে, মুখও চলে সমানে পুরোনো যন্ত্রের মতো একটানা অবসন্ন ছন্দে। যেদিন দুটো-চারটে এমার্জেন্সি কেস থাকে, ড্রেস করতে হয়, সেদিন আরও বেলা হয়ে যায়। দেড়টা-দুটোর সময় মাতালের মতো টলতে টলতে কোয়ার্টারে ফিরে আসে কম্পাউণ্ডার।
কোয়ার্টারই বটে। দাতব্য চিকিৎসালয়ের মর্যাদারক্ষার সম্পূর্ণ উপযোগী। বাখারির বেড়ার ওপরে মাটিলেপা, ওপরে খড়ের চাল। মেটে দাওয়ায় এদিক-ওদিকে মাঝে মাঝে এক-একটা কালো কালো গর্ত ফুটে বেরোয়, রোজ সেগুলোর ওপর মাটি চাপাতে হয় সাপের ভয়ে। দুখানা ঘর, একটুকরো রান্নাঘর, একটা পাতকুয়ো আর তিনটে পেঁপে গাছ। তার ভেতরে কম্পাউণ্ডারের জমজমাট সংসার।
