জেগে উঠলুম বানের ডাকে। ঝড়-বৃষ্টির প্রায় মহাপ্রলয় তখন। কিন্তু কিছু আর ভাববার সময় ছিল না। চর ভাসিয়ে ছুটে এল পাহাড়ি নদী, মড়মড় করে ভেঙে পড়লে ঘর। আমি বাইরে বেরিয়ে এসেছিলুম, এক ঝটকায় আমাকে কুটোর মতো তলিয়ে নিয়ে চলল।
ডুবতে ডুবতেও টের পেলুম আমার কাছেই কেমন একটা ঘোঁৎঘোঁৎ আওয়াজ। তাহলে দুজনেই ভেসেছি—দুজনেই আবার একসঙ্গেই বাস্তুহারা। কী করে কী হল জানি না—দু হাতে শুয়োরটাকে জাপটে ধরে মাথা জাগিয়ে তুললুম। আর সেই প্রকান্ড জানোয়ারটা—যার স্বজাতেরা সুন্দরবনের গহিন গাং পেরিয়ে চলে যায়, যারা সমুদুরের মতো রাক্ষুসে নদীকে ভয় পায় না, বাঘ-হরিণ পৌঁছুবার আগে যারা নতুন-জাগা-চরে গিয়ে বাস্তু বাঁধে, সে আমাকে টানতে টানতে—জলের ওপর নাক তুলে সাঁতার কাটতে কাটতে, সেই স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলল।
আমাকে ছিনিয়ে নেবার জন্যে খ্যাপা স্রোত মরণ-সাপট দিচ্ছিল। সইতে পারলুম না, আমি জ্ঞান হারালুম।
যখন চোখ চেয়েছি, তখন সকাল। দেখি জন তিনেক মানুষ আমায় সেঁকতাপ করছে। বললুম, শুয়োরটা?
তারা বললে, কীসের শুয়োর? বানে ভাসতে ভাসতে এখানে এসে ডাঙায় ঠেকেছিলে, আমরা তুলে এনেছি তোমায়। কোথাকার লোক হে?
শুয়োরটা কোথায় গেল জানি না। হয়তো আমায় কোনোমতে ডাঙায় ঠেলে দিয়ে সে নিজে আর উঠতে পারেনি—ভেসে গেছে। তোমরা হাসবে, পাগল বলবে আমায়; কিন্তু আমি ঠিক জানি, ও যদি বেঁচে থাকত কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়ত না। আমি নিশ্চয় জানি, আমার মতো ওরও তো কোনো দোসর নেই!
সেই ভাঙা গভীর গলাটা থামল। নিঃশব্দে বসে থাকল দুটি চাষি, আমি করোগেটেড টিনের চালাটার দিকে চেয়ে রইলুম, আমার চোখ জ্বলতে লাগল, একটা ক্লান্ত কাক ডেকে চলল রাধাচুডোর ডালে।
সেই লোকটা আবার বললে, কখনো শুয়োর মানুষ হয়, বুঝেছ? কখনো আবার মানুষ…
চমকে আমি উঠে দাঁড়ালুম। আমাকেই বলছে? সুটকেসটা তুলে নিয়ে আমি এগিয়ে চললুম। ট্রেনের সিগন্যাল দিয়েছিল। আমি ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রী, আমার কামরাটা থাকবে আর একটু ওদিকে। গাড়ি ফাঁকা থাকলে বসে বসে পড়তে পারব ফ্লেশ-লাভার্স বইটা। আর তেমন যদি সহযাত্রী পাই তাহলে বেশ রোমাঞ্চকর বর্ণনা দিয়ে উত্তরবাংলার বন্যার গল্পও শোনাতে পারব তাদের। রেলস্টেশনের এই উদ্ভট বাজে গল্পটা ভুলে যেতে আমার সময় লাগবে না তখন।
ধন্বন্তরি
চ্যারিটেবল ডিসপেন্সারি।
দাতব্য চিকিৎসালয় বলেই দাতার হস্ত অকৃপণ নয়; রিমাইণ্ডার দিতে দিতে ডাক্তার খগেন দাস এলএমএফ-এর কলমটার নিব অর্ধেক হয়ে এসেছে। লাল ফিতেয় বাঁধা ফাইলগুলোর ওপর ধুলোর স্তর জমছে দিনের পর দিন। সেগুলো খুলে ঘাঁটবার মতো সময় নেই কারও, উৎসাহও না।
ডাক্তার খগেন দাস এলএমএফ কিন্তু দমবার পাত্র নন। শেষপর্যন্ত হুংকার ছাড়লেন, কম্পাউণ্ডারবাবু?
পাশের কম্পাউণ্ডিং রুম থেকে বিবর্ণ কাটা দরজাটা ঠেলে কম্পাউণ্ডার যতীন সমাদ্দার প্রবেশ করলে। চেহারা দেখলেই বোঝা যায় মাসে আটাশ টাকা মাইনে পায় লোকটা। বাদুড়চোষা শরীর, মাথার সাদা-কালো চুলগুলো সমান মাপে নিরপেক্ষভাবে ছাঁটাই করা যেন শুয়োরের গায়ের রোঁয়া। কপালে একটা মস্ত আব, তার ওপর দু-তিনগাছা চুল গজিয়েছে। তোবড়ানো গাল, চোখের কোটরে কালির পোঁচড়া। গায়ের ময়লা ফতুয়ার দুটো বোতাম ছেঁড়া, হাঁটু পর্যন্ত ভোলা কন্ট্রোলের ধুতির নীচে বকের মতো সরু সরু দুটি পা ক্যাম্বিসের ফিতেহীন জুতোয় অলংকৃত হয়ে আছে।
কম্পাউণ্ডার যথানিয়মে বিনয়াবনত হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
ডাকছিলেন আমাকে?
হ্যাঁ, দেখুন তো মশাই এক বার কান্ডটা। এত লেখালেখির পরে জবাব দিচ্ছে our attention is drawn to the matter! রসিকতার একটা সীমা তো থাকা দরকার।
উত্তরে কী বলা উচিত ভেবে পেল না কম্পাউণ্ডার।
টেবিলে একটা কিল মেরে খগেন ডাক্তার বললেন, চালিয়ে যান ওই সিঙ্কোনা আর কার্মিনেটিভ মিক্সচার। কলেরা, টাইফয়েড, ডিপথিরিয়া, ব্ল্যাকওয়াটার, ম্যালেরিয়া, নিমোনিয়া —যাতে লাগে। যেটা বাঁচে বাঁচুক, বাকিগুলো মরে হেজে ডিসপেন্সারির ভিড় হালকা করে দেবে।
জীর্ণ চেহারার মতো জীর্ণ গলায় আটাশ টাকা মাইনের কম্পাউণ্ডার বললে, আজ্ঞে।
আর শুনুন, ছোটো আলমারির চাবিটা আমাকে দিয়ে দেবেন।
কম্পাউণ্ডার চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল। ভীরু দুটো চোখের সঙ্গে মিলল কুটিল তীক্ষ্ণ চোখের সন্ধানী দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে সিগারেট দুলিয়ে এক ধরনের বিচিত্র চাপা গলায় ডাক্তার বললে, শুনছি ভালো দু-চারটে ওষুধ যা আছে সেগুলো নাকি ইঁদুরে খাচ্ছে।
কথাটা রূপক হলেও ইঙ্গিতটা এত স্পষ্ট যে কম্পাউণ্ডারের ঘোলা চোখ দুটো পর্যন্ত ক্ষণিকের জন্যে চকচক করে উঠল। যেন ওষুধ একাই চুরি করে বিক্রি করে কম্পাউণ্ডার, ডাক্তার একেবারে দেবতার মতো নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক। কম্পাউণ্ডারের শীর্ণ স্নায়ুগুলো এক মুহূর্তের জন্যে ধনুকের ছিলের মতো দৃঢ় হয়ে উঠতে চাইল। কিন্তু আটাশ টাকা মাইনের কম্পাউণ্ডার কোনো কথা বললে না, নিঃশব্দে কোমর থেকে চাবিটা খুলে এনে ডাক্তারের টেবিলে রাখলে, তারপরে কাটা দরজাটা ঠেলে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। লোকটা এমনভাবে চলে যে পায়ের শব্দটুকু পর্যন্ত শোনা যায় না। যেন পৃথিবীকে নিজের অস্তিত্বটুকু জানাতেও সংকোচ বোধ করে সে।
