ঘোঁত করে একটা আওয়াজ তুলে ছুটে পালাত, যেন লজ্জা পেত মনে হয়।
বলবে, আমার এসব মনগড়া। যাকে বলে বুনো শুয়োর, বোকা, গোঁয়ার, কচু-কন্দ খুঁজে বেড়ায়, যখন-তখন যাকে ইচ্ছে তাড়া করে তার বয়ে গেছে তোমার মনের কথা বুঝতে। নিশ্চয় নিশ্চয়, সব মানি। তবু দেখতুম, সেই রাত্তিরে কিংবা পরের রাত্তিরেই ওটা এসেছে। আমার দাওয়ার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, ছোটো ছোটো চোখ দুটো চিকচিক করছে জোনাকির মতো। কিছুক্ষণ থাকত ওইভাবে, যাহোক একটা কিছু বুঝে নিত, তারপর আবার আস্তে আস্তে চলে যেত নিজের মনে।
শহরের বাজারে তরকারি বেচতে আমি নিজে যেতুম না, অন্য লোক এসে আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে যেত পাইকারি দরে। তারা আসত হপ্তায় দু-চার দিন। তা ছাড়া একটু দূর দিয়ে শেয়ার লোকজনের যাওয়া-আসা তো ছিলই। তাদেরই কারও চোখে পড়ে থাকবে। একদিন হঠাৎ দেখি শহর থেকে শোলার টুপি আর হাফপ্যান্ট পরে, কাঁধে বন্দুক নিয়ে দু তিন জন ভদ্দরলোক এসে হাজির।
প্রথমটা ভেবেছিলুম চরের ওদিকটায় এ-সময়ে দু-চারটে চখাচখি পড়ে তাই মারতে এসেছে, কিন্তু চলে এল আমার ঘরের দিকেই।
তুমি এখানে থাক?
আজ্ঞে।
এসব তরিতরকারি তোমার?
আজ্ঞে।
এ তো খাসমহল জমি। পত্তনি নিয়েছ?
আজ্ঞে না।
বেআইনি। একদম বেআইনি।
কে জানে কাকে বলে আইন, কাকে বলে বেআইন। এই ভূতুড়ে চরায় সরকারের নজর তো কোনোকালে ছিল না—আমিই এখানে একা হাতে মাটি গড়েছি, ফসল ফলিয়েছি। কিন্তু আইন-বেআইনের ভাবনা আমি আর ভাবতে পারি না। যেদিন হাতি এনে অসমের পাহাড়ে ফসলের সঙ্গে আমাদের বুকের পাঁজর অবধি দলে দেওয়া হয়েছিল, সেদিন থেকে ওসব ভাবনা আমি ছেড়ে দিয়েছি।
বাবুদের একজন ফস করে একটা সিগ্রেট জ্বাললেন। বললেন, যাক, সেসব পরে হবে। এই চরায় বুনো শুয়োর আছে, তাই নয়?
ধক করে উঠল আমার বুকের ভেতর। আমি তিনটে বন্দুকের দিকে তাকালুম।
কে বললে আপনাদের?
আমরা খবর পেয়েছি।
তোমরা শুনলে রাগ করবে কি না জানিনে, আমি দেখেছি, হারামির দিকে জানোয়ারের চেয়ে মানুষেরই টাঁক বেশি। তক্ষুনি মনে হল বলি— যান ওদিক পানে, কাদার মধ্যে বসে আছে দেখেছি একটু আগে, দিন সাবড়ে। আর তক্ষুনি কে যেন কানে কানে বললে, ছি ছি হে! তুমি শুয়োরের চাইতেও ছোটোলোক হয়ে গেলে। ও তোমায় বিশ্বেস করে, তার এই প্রিতিদান।
বললুম, বাজে কথা। আড়াই বচ্ছর ধরে আমি আছি এখানে। চরের জঙ্গল ভেঙে চলাফেরা করি। কোনো শুয়োর কখনো আমার চোখে পড়েনি।
কিন্তু একজন যে বললে?
ভুল বলেছে। শেয়ালটেয়াল দেখে থাকবে হয়তো।
তুমি ঠিক জান?
আজ্ঞে এই চরার আমি বাসিন্দে। আমি জানিনে তো অন্য লোকে জানবে?
বাবুরা এ ওর মুখের দিকে তাকালেন।
আমি বললুম, তা খরগোশ-টরগোশ আছে দু-চারটে। খুঁজে দেখতে পারেন।
ধুর, খরগোশ অযাত্রা। আর সেগুলো খুঁজে কে সময় নষ্ট করবে, কেই-বা টোটা খরচ করতে যাবে?
বাবুদের দুঃখ হয়েছে মনে হল।
বাজে লোকের কাছে উড়োখবর শুনে হাঁটাহাঁটিই সার হল। চলো হে।
শুয়োরটা সে-রাতে এল না, এল পরের রাতে। বললুম, তোকে বাঁচিয়েছি, বুঝলি? তিনটে বন্দুক ছিল, কিছু করতে পারতিস না।
নিঃসাড়ে আমার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বললুম, এবার কটা কচু লাগাব ঠিক করেছি। খুঁড়েমুড়ে যেন বরবাদ করে দিসনি, তাহলে ঠিক বলে দেব বাবুদের।
তেমনি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে চলে গেল।
দিন কাটছিল, এইভাবে কতদিন কাটত জানি না। কিন্তু সেই সকালে সরকারি পেয়াদা এসে আমাকে নোটিশ দিয়ে গেল। কেন আমি খাসমহলে জমি জবরদখল করেছি, কেন আইন মোতাবেক পত্তনি নিইনি, হুজুরে হাজির হয়ে আমায় তার কৈফিয়ত দিতে হবে। সেই যে তিন বাবু এসেছিল, তারাই কেউ ফিরে গিয়ে এই উপকারটা করেছে আমার।
নোটিশ নিয়ে আমি চুপ করে বসে রইলুম ঘরের দাওয়ায়। আগের দিন থেকেই টিপিটিপি বৃষ্টি পড়ছিল; আজ আকাশ আরও ঘোলাটে, আরও অন্ধকার। ওদিকে নদীতে জল বাড়ছে, গোঁ গোঁ করে উঠছে তার ডাক। ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে থেকে থেকে, চারদিকের ঘাসবনে ঢেউ উঠছে।
জল আসছে নদীতে। চরের খানিকটা ডুবে যাবে। কিন্তু আমি যেখানে আছি সেটা ডুববে, আজ চোদ্দো বছর ধরেও ডোবেনি। নদীর ভাবনা নেই, আমি মানুষের কথা ভাবছিলুম। এমনি একটা মেঘলা দিনেই যখন ধানের খেতে বাতাস ঢেউ দিয়েছিল, সেইদিনই ওরা হাতি এনে…
পত্তনি নিতে হবে, খাজনা দিতে হবে। কত চাইবে কে জানে! না কি উচ্ছেদই করে দেবে। খেতের দিকে চেয়ে দেখলুম বৃষ্টিতে ভিজে চিকচিক করছে পটোলগুলো, হাওয়ার মাতন লেগেছে ঢলঢলে লাউয়ের পাতায়। চোখ জ্বালা করতে লাগল। সারাদিন কিচ্ছুটি খেতে ইচ্ছে করল না আমার, ঘরের ঝাঁপ বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে রইলুম।
শুয়োরটার ভাগ্যি ভালো আমার চাইতে। ওকে খাজনা দিতে হয় না, পত্তনি দিতে হয় না, ওর উচ্ছেদের ভয় নেই। ভয় নেই? আমি যখন থাকব না তখন ওরও তো পালা মিটে যাবে। তখন আবার তিনটে বন্দুক আসবে, হয়তো লোকজন নিয়ে ঘেরাও করবে জঙ্গল। তারপর আনন্দে বাবুরা…।
সব বিশ্রী লাগছিল, সব ফাঁকা ঠেকছিল, অনেক দিন পরে বউ আর ছেলে-মেয়ের জন্যে আমার কান্না আসছিল। হাওয়া-বৃষ্টি-দুর্যোগের ভেতরে সকাল-বিকাল-সন্ধে যে কীভাবে কেটে গেল জানি না। তারপর রাতে ঘুম এল, আর তারও পরে…
