কোত্থেকে এসেছে একথা ভেবে লাভ নেই। কোন দূরের জঙ্গল থেকে পথ ভুলে কিংবা তাড়া খেয়ে এই চরায় এসে নেমেছে সে ওই মক্কেলই বলতে পারে। কিংবা কে যে কোথা থেকে কোথায় যায়, ভগবানেরও কি জানা আছে সে-খবর? আমিও কি জানতুম সুন্দরবন, অথৈ গাং আর মেঘবরণ ধানের দেশ থেকে সোঁতের কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে আমি এই চরে এসে ঠেকব? আমি কি জানতুম এমন সন্ধ্যাও আমার আসবে যখন গাঁয়ের বিশালাক্ষীর মন্দির থেকে ঘণ্টার শব্দ উঠবে না, নিম গাছের ছায়া কাঁপবে না আমাদের উঠোনে, হাওয়ায় উঠবে না বুনো ফুল গাছগাছালির সঙ্গে ফুটন্ত ভাত কিংবা তপ্ত খেজুর গুড়ের পাকে চিড়ের গন্ধ, শোনা যাবে না কীর্তনের গান? আমিও কি ভেবেছিলুম, আমার একলা সন্ধ্যায় কেবল ঘাসবনে শনশন করবে হাওয়া, কেবল অদ্ভুত আওয়াজ তুলে পোকা আর ঝিঝি ডাকবে আর অনেক দূরের জ্বলন্ত চিতা থেকে কয়েকটাআগুনের পিন্ড লাফাতে লাফাতে এসে আলেয়া হয়ে দপ দপ করবে এখানে-ওখানে?
তা হলে ওর দশা আমারই মতো। ওরও আলাদা জঙ্গল ছিল, বুনো ওল ছিল। হয়তোবা শুয়োরদেরও দেশ আলাদা হয়ে গেছে, তাড়া খেয়েছে সেখান থেকে। ও ব্যাটাছেলেও আমারই দলের—বাস্তুহারা।
বাস্তুহারা কথাটা মনে হতে একটু হাসি পেল, কিন্তু বেশিক্ষণ হাসিটা থাকল না। বাস্তুহারা হোক আর নাই হোক, আদতে তো বুনো শুয়োর। মানুষের শত্তুর। যখন নিজের তালে আছে, বেশ আছে। কিন্তু যা মেজাজি জানোয়ার, এক বার যদি খেপল তো…
পরদিন থেকে যাহোক একটা দা কিংবা বল্লম সবসময় রাখতুম হাতের কাছে। চলতে ফিরতে বার বার নজর রাখতে হত চারপাশে। আর বলব কী হে—দেখাও হয়ে যেত শুয়োরটার সঙ্গে।
কিন্তু দেখা হলেই দাঁড়িয়ে যেত ওটা। দিনের বেলায় দেখেছিলুম, রাতে যা ভেবেছি জানোয়ারটা তার চেয়েও বড়ো। গা-ভরতি ঝাঁটার মতন রোঁয়া, মস্ত দাঁতটা চকচক করছে সাদা, এখানে-ওখানে কাদার চাপড়া-লাগানো ইয়া পেল্লায় শরীর। তেড়ে এলে মা বলতেও নেই, বাপ বলতেও নেই। কিন্তু যেই মুখোমুখি হল কিংবা আমার পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল বোঁ করে, অমনি ঠায় দাঁড়িয়ে গেল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। নড়াচড়া নেই—কিছুই না—খানিকটা কেবল মিটমিট করে চেয়ে রইল, তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনি করে গা দুলিয়ে তুরতুর করে কোনদিকে চলে গেল। অনেক বার ভেবেছি তুলি বল্লম, ধাঁ করে মেরে দিই, কিন্তু কিছুতেই হাত উঠত না। কেবল মনে হত ও যখন আমায় কিছু বলে না, তখন খামোকা ওকে আমি মারতে চাই কেন।
দিনের বেলা আমার ঘরদোরের দিকে ওকে কখনো আসতে দেখিনি। আমি ভেবেছিলুম এই এল শুয়োর, আমার খেতটেত খুঁড়ে কিছু আর রাখবে না, যে ক-টা ফুটি হয়েছে খেয়ে একেবারে শেষ করে দেবে। তা গোড়ার দিকে এক-আধটু খোঁড়াখুড়িও করেছিল বই কী, শুয়োরের স্বভাব যাবে কোথায়।
একদিন বেশি রাত্তিরে আওয়াজ শুনে বেরিয়ে দেখি ওই কান্ড! কী মনে হল, হাঁক পেড়ে বললুম, এই মক্কেল, কী হচ্ছে ওটা? দুড়দুড় করে ছুটে পালাল, তারপর থেকে আর ওসব করতে দেখিনি।
হতে পারে দাঁতাল হলেও শুয়োরটা ভীতু, ভালো মেজাজ, হাঙ্গামা-হুজ্জত পছন্দ করে না। মানুষ তো কত রকমের হয়, জানোয়ারেরই কি রকমফের হতে পারে না? তবু আমার মনে হতে লাগল, ওটার সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে গেছে। এই নির্জন ভূতুড়ে চড়ায় ও-ও একা, আমিও একা। আমারও এক-এক সময় বুকের ভেতর হু-হু করে, মনে হয় সব ছিল— ঘর ছিল, ছেলে-মেয়ে ছিল; তখন নিজের এই রাজত্ব, এই খেতটুকু, এই জমি গড়বার সুখ, সব ফাঁকা হয়ে যায়। মনে হয় আমার কিছুই দরকার নেই, কিছুই না। তেমনি ওই শুয়োরটাও একা, ওরও চেনা জঙ্গলটা কোথায় হারিয়ে গেছে। ওরও আপনার জন ছিল, তারা কেউ নেই—কোথাও নেই। আমি যখন ফাঁকা মন নিয়ে কোনো অন্ধকার রাতে কোনো জোছনার ভেতর দাওয়ার ওপর চুপ করে বসে থাকি, তখন অন্ধকারটা এক জায়গায় আরও একটু ঘন হয়। জোছনায় কখনো একটা ছায়া পড়ে—ওই শুয়োরটা এসে দাঁড়ায়। তখন ওরও একা লাগে, ও-ও সঙ্গ খোঁজে। আলোয় হোক আর আঁধারে হোক—ওর চোখ দুটো চিকচিক করে জ্বলে, ও এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আমি ওর দিকে চেয়ে থাকি। তারপর ফোঁস করে যেন একটা নিশ্বাস ফেলে, ঘোঁত করে একটু আওয়াজ হয়, কী-একটা বুঝে নিয়ে ভারী শরীরটাকে একটু একটু দোলাতে দোলাতে আবার চলে যায় ঘাসবনের ভেতর।
তোমাদের অবাক লাগবে শুনলে, এরপর থেকে আমার আর ওটাকে ভয় লাগত না। কতদিন ঘাসবনের মধ্য দিয়ে আমার প্রায় গা ঘেঁষে চলে গেছে। কত বার দেখেছি কোথায় একটু কাদাজল জমেছে—খুশি হয়ে গড়াগড়ি করছে তার ভেতরে। কোনোদিন দেখেছি মাটি খুঁড়ছে নিজের মনে। আর রাত হলে যখন চরের ওপর কেবল সাঁই সাঁই করছে হাওয়া, যখন দূরের শ্মশানে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে চিতার আগুন, এমনকী মড়াপোড়ার গন্ধও ভেসে আসছে এক-আধটু, আর আমি ফাঁকা মন নিয়ে বুকের ভেতরে একটা কান্না নিয়ে বসে আছি, তখন ও এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে, যেন বলতে চাইছে নিজের কথা, যেন সান্ত্বনা দিতে চাইছে।
শেষে এমন হল, শুনলে হাসি পাবে তোমাদের, দু-এক দিন ওটাকে দেখতে না পেলে আমার মন খারাপ হয়ে যেত। আমি চমকে উঠে ভাবতুম— যেমন নিজের খেয়ালে এসেছিল তেমনি করেই চলে গেল নাকি আবার? আর ভাবলেই আমার ভয় করত। যতদিন একা ছিলুম বেশ ছিলুম। কিন্তু ওটা আসবার পরে কখন যেন দুজন হয়ে গেছি। ও আমাকে বুঝতে পারে, আমি ওকে বুঝতে পারি। তখন বেরোতুম খুঁজতে, হয়তো দেখতুম অনেক দূরে অনেকখানি জঙ্গলের ভেতর কোথাও খানিক জলকাদার ভেতরে হাত-পা মেলে শুয়ে আছে। তোমরা বলবে, আমাকে পাগলে পেয়েছিল। আমিও কি তা ভাবিনি? কিন্তু সেই চরায় সব অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল, একটা আলাদা মন হয়ে গিয়েছিল আমার, আমিও একটা আলাদা জীব হয়ে গিয়েছিলুম যেন। জিজ্ঞেস করতুম, আসিসনি কেন?
