তোমরাও তো চাষি, জানই তো ভাই—মাটিতে মন থাকলে মাটি তোমায় কক্ষনো ঠকায়। কিছু সে তোমায় দেবেই। শাকসবজি হল, পটোল হল, ফুটি ধরল বলে। তখন দিনের বেলা যারা চেয়েও দেখত না, আর রাতবিরেতে চড়া পেরিয়ে যাওয়ার সময় রামনাম করত, তারাই দু-একজন করে দাঁড়িয়ে যেতে লাগল।
বাঃ, বেশ পটোল হয়েছে তো তোমার!
এ মাটিতেও তো শাকটাক হয় দেখছি! এক-আধজন বলত, এই চড়ায় একলাটি থাক, তোমার ভয় করে না?
কীসের ভয়?
মানে—জনমনিষ্যি নেই, তেনাদের যাওয়া-আসা আছে…।
বলতুম, তেনাদের তো কখনো দেখিনি। যদি আসেনই, আলাপ করে নেব।
তোমার সাহস আছে, বলতে হবে সেকথা।
হুঁ। এখানে—এমন একলাটি থাকা…।
শুধু একজন একবার বলেছিল, পাহাড়ে নদীর চড়ায় ঘর বাঁধলে হে? এসব নদীকে বিশ্বাস করতে নেই। ইচ্ছেমতো খাত বদলায়, একদিন এসে আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে হয়তো।
বারো বছর যদি ঝাঁপিয়ে না পড়ে থাকে, আর পড়বে না।
নদীতে আমার ভয় ছিল না, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী—প্রথম প্রথম রাত্তিরগুলোকে তেমন ইয়ে লাগত না। অন্ধকার থাকলে চারদিকটা কেমন থমথম করত, বাতাসে কাশ-শণ ইকড়ার সোঁ-সোঁ আওয়াজে কেমন ভূতুড়ে কান্না শোনা যেত একটা। অনেক দূরে একটা শ্মশানঘাটা, তার চিতার আগুন দেখা যেত—আরও খারাপ লাগত তখন। অদ্ভুত আওয়াজ করে এক-আধটা পোকা ডাকত, অমন শব্দ এর আগে আর কখনো শুনিনি। যেদিন চাঁদ উঠত সেদিন কেমন সাদা সাদা মড়া আলোয় ভরে যেত সবটা, মনে হত সমস্ত চড়াটা জুড়ে চিতার ধোঁয়ার মতো কী-যেন জমাট হয়ে আছে, বাদুড়ের ডানার আওয়াজ শুনলে পর্যন্ত কেমন একটা কাঁপুনি জেগে উঠত বুকের ভেতরে।
কিন্তু অভ্যেস হয়ে গেল। তারপর এমন হল যে আঁধার রাতে এই চড়ায় আমি একলা মানুষ বসে আছি—এইটে ভাবতেই ভালো লাগত আমার। ভাবতুম আমি সব পারি, সব বন বাদাড় কেটে এই ভূতুড়ে চড়ায় সমস্ত জমি উদ্ধার করে আনতে পারি, ফসলে ফসলে ভরে দিতে পারি। এ চর কারও নয়, কেউ এর মালিক নয়। আমি একে দখল করেছি, এ আমার, শুধুই আমার।
তখন চাঁদের আলোরও রং বদলাতে লাগল। চিতার ধোঁয়া নয়, জোছনা রাত্তিরে যেন দুধের বান ডেকে যেত। আমি দেখতে পেতুম, সেই আলোয় আমার ফসলগুলো শাঁসে আর স্বাদে ভরে উঠছে। টিপ টিপ করে ঝরা শিশিরে আরও পুরন্ত বাড়ন্ত হয়ে উঠছে ক-টা বেগুন, ক-টি ছাঁচিকুমড়ো। আর তখন আমার মনে হত—এখন যদি বউ থাকত, আমার ক-টা ছেলে-মেয়ে থাকত…
এমনি একটা জোছনার সন্ধ্যায়, আমার একলা ঘরের দাওয়ায় বসে এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমি একদিন ভয়ানক চমকে উঠলুম।
একটু দূরেই ছায়া ফেলে গোলমতো কী-একটা দাঁড়িয়ে।
বাছুর? আরে দূর, এখানে কার বাছুর আসতে যাবে? তা ছাড়া অমন চেহারা তার হতে যাবে কোন দুঃখে? এ অনেক মোটা, গোল, বেঁটে বেঁটে পা, ঘাড়ে-গদ্দানে ঠাসা, গায়ে খাড়া খাড়া বড়ো বড়ো লোম, মুখের ডগাটা ছুঁচোলো, আর তার ওপরে ওলটানো নথের মতো বাঁকা দাঁত দুটো। দেখেই বুক চমকে গেল, প্রকান্ড একটা মদ্দা বুনো শুয়োর।
অ্যাদ্দিন আছি এখানে-দেড়-দু বছর হয়ে গেল, এ মক্কেলকে তো এর আগে কখনো দেখিনি। গোটা চরটাই আমি ঘুরেছি, বন-বাদাড় ঠেঙিয়েছি, শণ কেটে এনে ঘরে ছাউনি দিয়েছি, দু-একটা খরগোশ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি এর আগে। সাপ অবিশ্যি আছে, তা যে-তল্লাটের মানুষ আমি—সাপ নিয়ে তো নিত্যি ঘর করতুম। এ হতচ্ছাড়া তো এখানে আগে ছিল না, থাকলে নিশ্চয়ই দেখা হয়ে যেত অনেক আগেই।
এল কোত্থেকে?
কিন্তু সে-ভাবনা পরে। এখন তো বুকের রক্ত শুকিয়ে গেল। মদ্দা দাঁতাল শুয়োর, জানই তো কী বজ্জাত জানোয়ার। আচমকা মুখোমুখি হয়ে গেলে তো আর কথা নেই—সোজা তেড়ে এসে নাড়িভুড়ি ফাঁসিয়ে দেবে। আমার এক পিসেমশাইকে শুয়োরে মেরেছিল, সেকথা মনে হলে এখনও গায়ের ভেতরে আমার ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।
বেশ ছিলুম একলা চড়ায়—রাজার হালে। কোত্থেকে এই আপদটা এসে জুটল হে?
ঘরে একটা সাপমারা বল্লম ছিল। ভাবলুম, এনে তাক করে দিই ছুড়ে। তারপরেই মনে হল, যদি ফসকায়? প্রায় হাতির ছানার মতো চেহারা, তার ওপর যা বদখত মেজাজ একেবারে ঘরসুদ্ধই উড়িয়ে দেবে আমাকে।
আমি যেখানে ছিলুম সেইখানেই রইলুম ঠায় বসে, আর শুয়োরটাও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে আমার দিকে চেয়ে রইল। নড়াচড়া কিচ্ছুটি নেই, যেন কাঠের পুতুল। আমি দেখতে লাগলুম জোছনায় ওর খুদে চোখ দুটো মিটমিট করে জ্বলছে, একটা গোলমতন ছায়া জমে আছে ওর পায়ের কাছে, আর আমার দিকে তাকিয়ে ও যে কী দেখছিল—সে ও-ই বলতে পারে।
একটু পরে ফোঁস ফোঁস করে গোটা দুই শ্বাস ছাড়ল, ঘোঁৎ করে যেন আওয়াজও তুলল একটু, তারপর আস্তে আস্তে খুট খুট করে বেরিয়ে গেল ঘরের সামনে থেকে। আমি দেখতে পেলুম, একটু এগিয়ে ঢুকে গেল ঘাসবনের ভেতরে।
আপদ এখন তো গেল, কিন্তু গোটা রাত্তির আমি ঘুমুতে পারলুম না। এ তো মহা জ্বালা হল দেখছি। আর তো আমি ইচ্ছেমতো এদিক-ওদিক ঘুরতে পারব না, বলতে পারব না আমি এখানকার মালিক, এই চর আমার রাজত্বি। এ ব্যাটাচ্ছেলে কোনখানে ঘাপটি মেরে থাকবে-কখন কে জানে এর মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে, তারপর ঘোঁৎঘোঁৎ করে তাড়া লাগাবে—যাকে বলে শুয়োরের গোঁ। ঘাস-কাশের বন আর এবড়োখেবড়ো জমি, আমি দৌড়ে পালাতে পারব না। ওই দাঁত দিয়ে একেবারে ফালা ফালা করে ফেলবে আমাকে।
