লোকগুলোর আলাপ-আলোচনায় আমার কেমন একটা অস্বস্তি হল। এক বার ভাবলুম আমার পকেটে ফ্লেশ-লাভার্স বলে যে পেপারব্যাকটা আছে, সেটা বরং পড়ি—ট্রেনের তো এখনও চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না। তবু ওদের কথাবার্তা আমার কানে আসতে লাগল। আমি ঠিক শুনতে চাইলুম না, তবু শুনে যেতে লাগলুম। করোগেটেড টিনের চালাটা চোখের সামনে ঝকঝক করে চলল।
তারপর সেই লোকটার গলা আরও গভীর হতে থাকল, স্মৃতির ভেতরে ডুবে গিয়ে মানুষ যেমন করে কথা বলে, কখনো স্বপ্ন দেখে কখনো জাগে, কখনো বাইরেটাকে আবছা করে দেখে কখনো দেখে না, তেমনি স্পষ্ট অথচ ছায়া ছায়া ভঙ্গিতে ভাঙা মোটা আওয়াজে সে কথা কইতে লাগল। এখন তার স্বরে জোয়ারে ফেঁপে-ওঠা রায়মঙ্গল নদী গমগম করতে লাগল। নোনা সমুদ্রের হাওয়ায় সুন্দরী-হেঁতাল-গোলপাতার মর্মর উঠতে লাগল। আমি এতক্ষণে কোথাও ছিলুম না—এবার ওই লোক দুটো, রেলের লাইন, রোদ-ঝলসানো টিনের চাল, রাধাচুড়ার ছায়া সব মিলিয়ে গেল। চারদিকে অন্ধকারের ভেতরে শুধু স্মৃতি-জড়ানো একটা স্বর জেগে রইল কুয়াশামাখা আলোকবৃত্তের মতো।
দেশ-ঘর যখন গেল, তখন বউ আর দুটো ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমি শেয়ালদা স্টেশনে। তারপর ক্যাম্পে। তারও পরে… বউটা মরল কলেরায়, ছেলেটা ভিক্ষুকের দলে মিশল, মেয়েটা একটু বড়ো হয়েছিল—সেটা যে কোন চুলোয় গিয়ে পৌঁছুল বোধ করি ভগবানও তা জানে না।
তা ভাই ছাড়ান দাও এসব কথা, এগুলো শুনে শুনে তো তোমাদের কান পচে গেছে। মোদ্দা—বছর না ঘুরতেই আমি হাত-পা ঝেড়ে সাফসুফ হয়ে গেলুম। তখন যেখানে যাই, যেখানেই থাকি, আমার আর কীসের ভাবনা। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলুম বাংলাদেশের আর এক মুল্লুকে।
কী না-করেছি বছর দুই ধরে। সরকার থেকে লোন দিয়েছিল, ব্যাবসা করতে গেলুম, ছ মাসও টিকল না। জাত চাষির ছেলে, সাতজন্মে করেছি ওসব না বুঝি কিছু! অসমের দিকে দল বেঁধে গিয়েছিলুম এক বার, পাহাড়ের ঢালে বাস্তু বেঁধে জমিতে চাষ দিয়েছিলুম, বলব কী ভাই–সোনা ফলেছিল। কিন্তু থাকতে দিলে না। প্রথমে এল সরকারি নোটিশ, কিন্তু বনবাদাড় থেকে এত কষ্টে ফসল করেছি—ছেড়ে যাব? তাতে দিলে হাতি লেলিয়ে। ঘরদোর ভেঙে আমাদের বুকের পাঁজরার সঙ্গে ফসল দলে-পিষে উৎখাত করে দিলে। হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিলে এরা পাকিস্তানের চেয়েও সরেস।
ওসব কথা থাক দাদা, আমাদের ছোটো মুখে মানায় না। কাঁদতে কাঁদতে কে যে কোন দিকে ছটকে পড়ল বলতে পারিনে, আমি অসম ছাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে এলুম।
পৌঁছেছিলুম একটা ছোটো শহরে। জনমজুর খাটলুম কিছুদিন, কিন্তু চাষির রক্ত যাবে কোথায়! কারও কাঁধে লাঙল দেখলে, একপশলা বৃষ্টির পর ক-টা লাউ-কুমড়ো-পালঙের পাতা সবুজ হয়ে লকলক করতে দেখলে, যেন কান্না উছলে উঠত বুকের ভেতর।
সরকার থেকে তখন লোক পাঠাচ্ছিল আন্দামানে জমিটমি দেবে। কিন্তু সেই হাতির পর থেকেই আমার ভয় ধরেছিল দাদা। সে তো কালাপানির দেশ, সেখানে আবার কী লেলিয়ে দেবে কে জানে! আমার আর কী আছে, মরি তো এই বাংলাদেশেই মরব।
চাষির ছেলে, একটুখানি জমি চাই আমার। এক বিঘে না-হয় দশ কাঠা, দশ কাঠা না জুটলে পাঁচ কাঠা। কিন্তু কে দেবে জমি—কোথায় জমি! এ তো আমাদের দেশ নয় যে বন কেটে আবাদ করব, বাঘ-কুমির-সাপ তাড়িয়ে মাটির দখল নেব।
তবু আবার জমি পেলুম।
শহরের বাইরে এক পাহাড়ি নদী। যত বড়ো নদী, চর তার চাইতেও বেশি। এই চরা বোধ হয় সরকারি সম্পত্তি, কিন্তু তাতে এখন কাশ-শণ আর ইকড়ার জঙ্গল। আগে বর্ষায় চরাটা তলিয়ে যেত, কিন্তু দশ-বারো বছর ধরে তার খানিক জায়গা অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে, আর ডোবে না। সেখানে ঘাস-পাতা পচে বেশ জমি তৈরি হয়ে গেছে।
মানুষজন কেউ থাকে না। কার গরজ পড়েছে ওখানে থাকতে। নদীর খেয়া পেরিয়ে রাতবিরেতে যারা চর পেরিয়ে আসে তারা হাওয়ায় ঘাসবনের সাঁই সাঁই শব্দ শুনে মনে মনে রামনাম জপে। তা ছাড়া ভয় দেখাবার জন্যে দুটো-চারটে আলেয়া তো আছেই।
বিশ্বেস করবে কি না জানি না, জমির খিদে আমি আর সইতে পারছিলুম না, কিছুতেই থামতে চাইছিল না বুকের কান্না, একটা ধানের চারা দেখলে, দুটো শাকের পাতা দেখলে যেন মাথাখারাপ হয়ে যাচ্ছিল আমার। শেষকালে খ্যাপার মতো আমি ওই চরে গিয়ে উঠলুম। হাতে যে দু-চারটে টাকা ছিল, তাই দিয়ে দা কিনলুম, কোদাল কিনলুম, খুঁটিনাটি আরও কিছু কিনলুম। আমার জমি আমিই গড়ব।
একাই?
একাই। আমার আর কে আছে। তা ছাড়া আর কেই-বা আমার সঙ্গে যাবে ওই ভূতুড়ে চরায় জমি গড়তে। কোন ফসলটাই-বা ফলবে ওখানে? বালি জমি, ধান-পাট কীই-বা হবে?
কিন্তু কিছু না হোক ক-টা শাক তো তুলতে পারব। পটোল হবে নিশ্চয়—দু-চারটে ফুটি তরমুজও কি ফলাতে পারব না?
আরও দশ ঘর উদবাস্তুর সঙ্গে আমারও একটা হোগলার ঝাঁপ ছিল শহরের এক টেরেয়। সেটা তুলে নিলুম। সবাই অবাক হয়ে বললে, কোথায় চললে?
নদীর চড়ায়।
সেখানে কী?
জমি গড়ব।
মাথাখারাপ? কী জমি হবে ওই কাশ আর শণের জঙ্গলে?
জানিনে। চেষ্টা করে দেখব।
ঠাট্টা করে কি বিশ্বাস করে বলতে পারিনে, একজন বললে, ওই চড়ায় পেতনি আছে।
বললুম, দেশ ছাড়বার পরে মরে তো ভূত হয়ে আছি, পেতনিতে আমার কী করবে।
মরুক গে, সব কথা বলতে গেলে তো মহাভারত হয়ে যায়। আমি একাই বাস্তু বাঁধলুম নদীর চরায়। বয়েস অল্প ছিল, কবজিতে জোর ছিল, মাথার ভেতরে খ্যাপামি ধরে গিয়েছিল। লেগে গেলুম জঙ্গল কাটতে। গোটা কতক সাপখোপ মেরে শেষতক বিঘেটাক জমি সাফ হয়ে গেল।
