প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে গা এলিয়ে, পায়ের কাছে গামছার পুঁটলিটা রেখে, আধ ঘণ্টা লেট লোকাল ট্রেনটার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে একটু দূরের শুয়োরগুলোকে দেখে বাঁ চোখটা একটু কুঁচকে লোকটা বলছিল, হুঁ, যা বলেছি। দুনিয়ার সবচেয়ে তাজ্জব চিজ হল এই শুয়োর।
পাশে বসে ভক্তিমানের মতো শুনছিল জন দুই চাষি গেরস্ত। কয়েক হাত দূরে সুটকেস পেতে বসে আমিও শুনছিলুম, কারণ আধ ঘণ্টা লেট হয়ে যে-ট্রেনটা আসছে তাতে আমাকেও যেতে হবে। সামনের ফাঁকা রেলের লাইন, মাথার ওপর রাধাচুড়োর পাতায় হালকা বাতাসের শব্দ, ওদিকের সাইডিং-এ খান তিনেক কালো কালো পুরোনো ওয়াগন। মালগুদামের টিনের চালে চোখ-ধাঁধানো খানিক রোদের ঝিলিক আর থেকে থেকে কাকের ডাক আমার সারা শরীরে একটা ক্লান্ত ঝিমুনি নিয়ে আসছিল। লোকটার ভরাট আর ভাঙা ভাঙা গলার আওয়াজে আমি নড়েচড়ে বসলুম।
ভক্তি সত্ত্বেও একজন চাষি অবাক হল একটু।
এত জীব থাকতে শুয়োর সবচাইতে তাজ্জব হল কেন?
কখনো সুন্দরবনের তল্লাটে যাওয়া হয়েছে?
আজ্ঞে না।
নদীগুলো যেখানে রাক্ষুসে হয়ে সাগরে পড়ে, সেসব মোহানার খবর জানা আছে কিছু?
আজ্ঞে জানব কী করে? যাইনি তো কখনো।
সেইসব নোনা গাঙের ভেতর চর জাগল। এলোপাথাড়ি গাছগাছলাও গজাল খানিকটা। কিন্তু মানুষ গিয়ে থাকতে পারে না। এক তোনোনা, তার ওপর জোয়ারের সময় সব ডুবে যায়—কিলবিল করে সাপ। একটা পানবোড়া এক বার ঠুকে দিলে তো শিবের অসাধ্যি।
আজ্ঞে সে তো বটেই।
তখন সে-চরে সবচেয়ে আগে কে যায় বলোদিনি?
জানিনে।
যায় শুয়োর। লোকটা এবার একটু হাসল, কুঁচকে প্রায় বন্ধ হয়ে গেল বাঁ-চোখটা। কোত্থেকে যায়?
অন্য চর থেকে, ডাঙা থেকে।
কী করে যায়?
কেন? সাঁতরে।
ওই গহিন গাং?
গহিন গাং বই কী। বাঘের অবধি সাহসে কুলোয় না। কিন্তু যাকে বলে শুয়োরের গোঁ। ওদের সাঁতরাতে দেখেছ কখনো? ঠিক কুকুরের মতো জলের ওপর নাকটা তুলে তুরতুর করে পেরিয়ে যায় দু-এক মাইল।
তা চরে গিয়ে কী করে শুয়োর? আর একজন চাষি একটা বিড়ি ধরাতে গিয়েও ভুলে গেল।
সেখানে তো কচু-কন্দ নেই, খায় কী?
কেন? কাঁকড়া।
কাঁকড়া? এবার দুটি শ্রোতাই চমকাল এবং সেইসঙ্গে আমিও।
বললুম-না দুনিয়ায় অমন আজব চিজ আর নেই? নোনা জলের অ্যাই বড়ো বড়ো কাঁকড়া দেখেছ তো? শুয়োর সেগুলো ধরে কড়মড় করে চিবিয়ে খায়।
শুয়োরে কাঁকড়া খায়? একজন তখনও অবিশ্বাসী।
তেমন তেমন হলে বাঘে ধান খায় শোননি?
তাহলে পেটের চিন্তা নেই?
এক্কেবারে না। আর জোয়ারের জল এসে চর ডুবে গেলে কী করে জান? বুনো গাছ জাপটে ধরে মানুষের মতো সোজা হয়ে জলের ওপর নাক ভাসিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।
খুবই তাজ্জব বলতে হবে তাহলে। প্রথম চাষিটি একটু হাঁ করে চেয়ে থেকে ব্যাপারটা বুঝে নেবার চেষ্টা করল, আপনি এতসব জানলেন কী করে?
খুলনা জেলার লোক না আমি? এইবার লোকটি বিষণ্ণ হল একটু, চোখেই তো দেখা এসব। কিন্তু পাকিস্তান হয়েই… একটা ছোটো নিশ্বাস পড়ল। চারিদিকে বানের কথা বলছিলে তোমরা? তাই শুয়োরগুলোকে মনে পড়ছিল আমার।
বান বান বান। গ্রাম ডুবছে, শহর ডুবছে, মানুষ ডুবছে, ফসল ডুবছে। যেন রসাতলে যেতে বসেছে গোটা দেশটাই। সেই যন্ত্রণা আর দুর্ভাবনা সব কটি মুখেই ছড়িয়ে পড়ল। বেলা এগারোটার সময়েও রাধাচুডোর হালকা ছায়াটার তলায় যেন এক টুকরো বিষণ্ণ অন্ধকার নামল।
মনে হল গোটা তিনেক নিশ্বাস পড়ল একসঙ্গে। চুপ করে কাটল কয়েক সেকেণ্ড। যে চাষিটি তখন থেকে বিড়িটা হাতে নিয়ে বসে ছিল, সে এবার সেটা এগিয়ে দিলে লোকটির দিকে। আমি দূরের চোখ-ধাঁধানো করোগেটেড টিনের চালাটার দিকে তাকিয়ে থেকেও দেশলাইয়ের আওয়াজ পেলুম, বুঝতে পারলুম ওরা তিন জনেই তিনটে বিড়ি ধরিয়েছে।
আমাকে ওরা চোখ দিয়ে দেখেছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু মন দিয়ে কেউ দেখছিল না। ওরা দূরের সুন্দরবনে ছিল, নোনা গাঙের দেশে ছিল, ওরা গহিন গাঙে সাঁতার কাটতে দেখছিল বুনো শুয়োরকে, কড়মড় করে এই বড়ো বড়ো কাঁকড়া খেতে দেখছিল। আমি সেখানে কেউ নই। ওসব আমার দেখবার কথা নয়।
একটু সময় কেটে গিয়েছিল, তবু ওদের একজন মনে করে আগের কথারই জের টানল। এইসব সাধারণ মানুষের যেমন করে বলা উচিত, তেমনি বোকা বোকা ভঙ্গিতে বললে, তা বটে। শুয়োরের কথা মনে পড়ে যায় বই কী। মানুষ যদি শুয়োর হত, তাহলে অমন করে বানের তোড়ে তলিয়ে যেত না, নাক উঁচু করে সাঁতরাতে সাঁতরাতে যেখানে হোক পাড়ি দিত।
কিংবা… যে-লোকটাকে দেখলে গা-টা একটু শিউরে শিউরে ওঠে, সাধারণ পেঁয়ো মানুষের কেমন যেন ভক্তি করতে ইচ্ছে যায়, কথা বলতে বলতে যার বাঁ-চোখটা কুঁচকে যায় বার বার, একটু মোটা আর ভাঙা যার গলার আওয়াজ, সেই খুলনা জেলার মানুষটা আবার বললে, কিংবা হাতের কাছে দু-চারটে বুনো শুয়োর পেলে বেঁচেও যেত কেউ কেউ।
বুনো শুয়োর পেলে? সে আবার কীরকম কথা?
সে আবার কীরকম কথা আমিও এটা জিজ্ঞেস করতে পারতুম। কারণ এই সেদিন— উত্তরবাংলার বন্যার সময় আমিও তো ছিলুম এক বন্ধুর বাড়িতে। শেষরাতে জল এল, হুড়মুড় করে তলিয়ে গেল টিনের ঘর, কে যে কোথায় উধাও হল আমি জানিও না। লাফিয়ে বেরিয়ে একটা গাছে উঠে পড়েছিলুম, জল নেমে গেলে এককোমর পলি আর আতঙ্কে-জমাট মৃত্যুর জগৎ ঠেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছি। বন্ধু, তার স্ত্রী, তার ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ের খবর নেবার সময় ছিল না, উপায়ও ছিল না। দিন সাতেক পরে অনেক কষ্টে নিরাপদ জায়গায় এসে পৌঁছেছি, যাকে সামনে পেয়েছি অনেক রোমহর্ষক কাহিনি শুনিয়েছি তাকে। আমি যদি একটা বুনো শুয়োর হতুম—এর বেশি কী আর করতে পারতুম আমি।
