উমার দৃষ্টি তখন সুদর্শন দীর্ঘকায় সিতাংশুর মুখের দিকে। অল্প অল্প স্নিগ্ধ প্রশ্রয়ের হাসি হাসছে সিতাংশু। উচ্ছল গলায় উমা বলছে, সত্যি ডুয়েট রেকর্ড করবেন আমার সঙ্গে সত্যিই?
আর কি দাঁড়ায় বসন্ত? আর কি দাঁড়াতে পারে? একটা চোখ সাদা, কপালে খানিক পোড়া কোঁকড়ানো চামড়া, বিশ্রী ভাঙাগলার স্বর। সিতাংশুর সামনে দাঁড়াবার সাহস আছে নাকি বসন্তের?
চট করে সামনের হাই কোর্টের ট্রামটাতেই উঠে পড়ল বসন্ত, উমা দেখবার আগেই। এই নিয়ে তিন জন। মনে মনে জানত, ঠিকই জানত এবারেও এমনই একটা-কিছু নিশ্চয় ঘটবে। কিন্তু আজ দুপুরের রোদের শলায় যেন বিষ মেশানো ছিল। ইডেনগার্ডেনের শ্যাওলাভরা বদ্ধ জলটার পাশে মরা ঘাসের মধ্যে পা ছড়িয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে সেই বিষের জ্বালায় জ্বলল বসন্ত। অনেকক্ষণ ধরে।
তারপর বিকেলের গাড়িতে চলে গেল দেশে। বর্ধমানের দূর গ্রামের একটা ভাঙা বাড়িতে কিছুদিন মুখ খুঁজড়ে পড়ে থাকবার জন্যে।
পালাটা বসন্ত শেষ করতেই চেয়েছিল। কিন্তু উমাই যে তাকে থামতে দেবে না কে জানত সেকথা?
এক মাস পরে রাজা লেনের সেই খোলর ঘরে দুপুরের ঝিমুনিটা হঠাৎ কেটে গেল বসন্তের। উমাই ডাকছে। কোনো ভুল নেই।
ধড়মড় করে উঠে বসন্ত দরজা খুলে দিলে, এ কী, উমা!
অল্প অল্প হাঁপাচ্ছিল উমা। রেডিয়োটা নামিয়ে রাখল বসন্তের তক্তপোশের কোনায়। মস্তবড়ো একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, এটা ফেরত দিতে এলাম।
কেমন অপ্রতিভ আর অপ্রস্তুত হয়ে গেল বসন্ত। সংকোচে কুঁকড়ে গেল।
তুমি আবার কষ্ট করে আনতে গেলে কেন? আমিই তো যেতাম।
না, আপনি যেতেন না। শীর্ণ হাসি হাসল উমা, আজ এক মাসের মধ্যেও যাননি।
বসন্ত ঢোক গিলল, শরীর খারাপ হয়েছিল, দেশে গিয়েছিলাম।
কৈফিয়ত দিতে হবে না বসন্তদা, আমি জানি। এবার বিনা নিমন্ত্রণেই উমা বসন্তের তক্তপোশের কোনায় বসে পড়ল। আর একটা খবর আছে। আসছে মাসে ফের প্রোগ্রাম দিয়েছে রেডিয়োতে। সেই মেটে রঙের লেফাফা উমা বের করে আনল। এবার দুটো সিটিং। দশ আর পনেরো—মোট পঁচিশ মিনিট।
ভালোই তো! বসন্ত খুশি টেনে আনতে চাইল গলায়, দেখি—দেখি!
দেখে কী হবে? উমা খামটা সরিয়ে নিলে, বাবা-মার হাতে পড়বার আগেই এটা তোমার কাছে আমি নিয়ে এলাম বসন্তদা। ভেবে দেখলাম, এ প্রোগ্রাম আমি নেব না। আরও অনেক শিখতে হবে আমাকে অনেক বাকি এখনও। এসব থাক এখন।
ছি ছি, করছ কী!
কিন্তু বাধা দেওয়ার সময় পেল না বসন্ত। তার আগেই টুকরো টুকরো করে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলল উমা। অসহ্য বিস্ময়ে বসন্তের একটা মাত্র চোখে আর পলক পড়ল না। মুখ দিয়ে যান্ত্রিক শব্দ বেরিয়ে এল–কী করলে উমা, এ কী করলে।
ঘরের বিষণ্ণ ছায়ায় এক বারের জন্যে বসন্তের মুখখানা অদ্ভুত কুৎসিত লাগল উমার, হঠাৎ যেন বসন্তকে একটা একচক্ষু দানবের মতো মনে হল। ছেঁড়া চিঠির টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে নাড়ি-ঘেঁড়া যন্ত্রণা আর্তনাদ করে উঠল বুকের মধ্যে।
তারপর আবার শীর্ণ হাসি হেসে উমা বললে, এই ভালো হল বসন্তদা। এখনও তো আমার অনেক শেখা বাকি আছে, ব্যস্ত হয়ে কী লাভ?
দৈত্য-সঙ্গীত
গোরু, ছাগল, ভেড়া–সবাই কান নাড়াতে পারে। কান নাড়ানোর সুবিধে কত! কান নেড়ে নেড়ে খুশি হওয়া যায়, মাছি-মশা তাড়ানো যায় কানের কাছে যদি বেয়াড়া সুরে কেউ গান গায়, তবে সেটাও তাড়ানো যায় খুব সম্ভব। কানের নিদারুণ কটকটানি নিয়ে বসে বসে প্যাঁচার মতো মুখ করে সেই কথাটাই ভাবছিলেন রসময়বাবু।
তিনি কান নাড়াতে পারেন না। পারেন না বলেই তখন থেকে একদল মশা তাঁর কানের কাছে সমানে ঘ্যানঘ্যান করছে। ঢুকে পড়ার তালও তাদের কারও কারও আছে বলে রসময়বাবুর সন্দেহ হয়। তা ছাড়া একটু আগেও তাঁর ভাগনে পঞ্চুলাল কানের কাছে ঝাড়া দু-ঘন্টা এমন পেশোয়ারী ঠুংরি শুনিয়েছে যে, এখনও তাঁর মাথার মধ্যে যেন করাত চলছে।
ছ্যাঃ–ছ্যাঃ! একেবারে মানুষ-মারা গান শিখেছে পঞ্চা! ছোঃ! আরে ধ্যেৎ–বলে ভীষণ বিরক্ত হয়ে রসময়বাবু একটা মশা মারতে গেলেন। আর এমন যাচ্ছেতাই ব্যাপার যে চড়টা চড়াং করে তার নিজের গালে গিয়েই পড়ল।
–ও! রসময়বাবু আর্তনাদ করলেন। নিজের হাতে নিজেকে ঠ্যাঙালে যে এমন খারাপ লাগে তা কে জানত। রসময়বাবু ডানহাতে আহত গালকে বাঁ হাত বুলিয়ে পরিচর্যা করতে লাগলেন, আর ভাবতে লাগলেন : আরে ছিঃ। কী ভয়ঙ্কর গানই তাঁকে শোনাল পঞ্চা।
পেশোয়ারী ঠুংরিই বটে। যেন দাড়িওলা এক পেল্লায় গান–তার হাতে ইয়া লাঠি, সেই লাঠি দিয়ে দমাদ্দম রসময়বাবুকে পিটিয়ে গেল। আগে যদি ঘুণাক্ষরেও জানতেন, তাহলে কি আমল দিতেন পঞ্চাকে? ভেবেছিলেন, পেশোয়ারী ঠুংরি পেশোয়ারী মেওয়ার মতোই বেশ সুস্বাদু হবে। কিন্তু সে যে পেশোয়ারী লাঠিও হতে পারে, সেটা বুঝলেন অনেক পরে।
তখন আর পঞ্চাকে কে ঠেকায়। সে তখন আকাশজোড়া হাঁ করে ‘খাজ্জা-গজ্জা রাওলপিণ্ডি–এ পিণ্ডি–পি–পিন—পিনডি–পিণ্ডিদান খাঁ-আঁ আঁ– এই সব গাইছে, তার সেই প্রচণ্ড রাগিণীর বন্যায় রসময়বাবু ভেসে গেলেন। তাঁর মাথা ঘুরতে লাগল, কান ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। তিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে পড়ে রইলেন।
পঞ্চার গান শেষ হল প্রায় দু’ঘন্টা পরে। যাওয়ার আগে পঞ্চুলাল বলে গেল : মামা, পরশু আবার আসব। আবার গান শোনাব তোমাকে।
