নে নে, তাড়াতাড়ি ওঠ। ও কী, তানপুরো পড়ে রইল যে! তুমি ওকে একটু উৎসাহ দিয়ে বাবা বসন্ত। যেরকম ভয় পাচ্ছে…
বসন্ত তার কুৎসিত মুখে খানিকটা সুন্দর হাসি হাসল, কোনো ভাবনা নেই মাসিমা, দেখবেন ও ভালোই গাইবে। মাকে একটা প্রণাম করে নাও উমা।
দুরুদুরু বুকে বসন্তের সঙ্গে বেরোল উমা। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে লতিকা বলতে লাগলেন, দুর্গা-দুর্গা! আহা, উমা আজ প্রথম রেডিয়োতে গাইবে, ওর বাবা কেবল শুনতে পেল না। কী যে পোড়া অফিস—একটা দিনও ছাই ছুটি দেবে না!
ওপর থেকে দোতলার মোটা গিন্নির একটা চাপা হাসি যেন শোনা গেল। এক বার অগ্নিদৃষ্টি তুলে লতিকা অলক্ষ্য মেঘনাদকে খুঁজলেন, তারপর ঘরে এসে রেডিয়োটাকে পুরোদমে খুলে দিয়ে বসে রইলেন ব্যাকুল প্রতীক্ষায়।
কিছুতেই রেডিয়ো স্টেশনের ভেতরে ঢুকল না বসন্ত। চোরের মতো দাঁড়িয়ে রইল বাইরে।
আপনি আসবেন না বসন্তদা?
না না, আমি এখানেই থাকি।
আমার যে বড়ো ভয় করছে! উমার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
কিছু ভাবনা নেই, চলে যাও ভেতরে।
অগত্যা এগিয়ে গেল উমা। যেতে যেতে বার কয়েক করুণ চোখে ফিরে তাকাল। মাথা নেড়ে নিঃশব্দে উৎসাহ পাঠাল বসন্ত।
মাথার ওপর চৈত্রের রোদ জ্বলছে। পথে গলে যাচ্ছে পিচ। হাই কোর্ট যাত্রী লক্ষীছাড়া চেহারার ট্রামগুলো কর্কশ শব্দ তুলে ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে। বসন্ত হাতের পিঠে কপালের ঘাম মুছে ফেলল এক বার। এখনও কুড়ি মিনিট দেরি।
দু-পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল লালদিঘির রেলিঙের পাশে। টেলিফোনের নতুন সাদা বিশাল বাড়িটা রোদে অদ্ভুতভাবে ঝকঝক করছে, কাচের জানলাগুলো থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে হিরের ধার। চারিদিকে অবিশ্রাম ক্লান্ত কর্মযাত্রা। বসন্ত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল, এরই ভেতরে নিরুদবিগ্ন চিত্তে প্রায় ন্যাড়া একটা গাছের ডালে এক জোড়া কাক নিবিষ্ট মনে বাসা বাঁধছে।
উমার চাইতেও চঞ্চল হয়ে উঠেছে বসন্ত। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, রক্তের মধ্যে ততই ঝড়ের মতো শনশনানি উঠছে একটা। ধুলোপড়া ময়লা রেলিংটাকে সে মুঠো করে চেপে ধরল। তার হাঁটু দুটো কাঁপছে।
মাথার ওপর গাছের একটা হালকা ছায়া আছে বটে, তবু কী অসহ্য তাপ ঠিকরে আসছে। তার ভেতর থেকে! একটা বিড়ি ধরিয়েই ফেলে দিল বসন্ত-বিশ্রী তেতো লাগছে মুখটা। পকেটে হাত দিতে একটা এলাচের খোসা পাওয়া গেল, নির্মমভাবে সেইটেকেই চিবুতে লাগল চুয়িং গামের মতো।
একটা সাতান্ন–একটা আটান্ন–
ঠিক রেডিয়ো স্টেশনের সামনেই একটা পানের দোকানে রেডিয়ো সেট দেখেছে বসন্ত। একটু আগেও সেটা বাজছিল। ঘর্মাক্ত দেহে সেই দিকেই চলল পায়ে পায়ে।
হৃৎপিন্ডে শীত ধরিয়ে দেওয়া একটা ঘোষণা। তারপর বাজনা। তারপর…
গান গাইছে উমা। হ্যাঁ, উমাই। সেই চেনা গলা, সোনার তারের মতো যাকে মেজে মেজে মসৃণ করে দিয়েছে। সেই সুর, যে-সুর দিনের পর দিন শিখিয়েছে একনিষ্ঠভাবে। পারবে তো উমা?
পারছে, চমৎকার পারছে! প্রথম মিনিট খানেক যেন একটু আড়ষ্ট লাগছিল, এখন ঝলকে ঝলকে আলোর মতো বেরিয়ে আসছে গান। কিন্তু ক-জন শুনছে কান পেতে! বসন্ত এক বার প্রাকুটি করে তাকাল চারদিকে। ঝরঝরে ট্রামগুলো অসহ্য আওয়াজ তুলে ছুটে চলেছে, পথ চলতি মানুষগুলো এক বারও থেমে দাঁড়াচ্ছে না উমার গানের আকর্ষণে। এমনকী হতভাগা পানওয়ালাটা পর্যন্ত শুনছে না গানটা—একজন খরিদ্দারের সঙ্গে গল্প করছে সমানে।
বেরসিক! ক্রুদ্ধভাবে স্বগতোক্তি করল বসন্ত। সত্যিই খুব ভালো গাইছে উমা, এত ভালো এর আগে যেন ও কখনো গায়নি। কিন্তু এমন দুম দুম করে কেন তবলা পিটছে তবলচিটা? যেন জয়ঢাক বাজাচ্ছে—খারাপ করে দিচ্ছে গানটাকে।
নির্ভুল সুরের পরিক্রমা শেষ করে উমা এসে থামল। বেশ গেয়েছে—খাসা! আবার একটা ঘোষণা। এবার দ্রুতলয়ের গান। অনেক সহজ, অনেক স্বাভাবিক হয়েছে উমা, যেন অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছে।
একটা ছোকরা তাল দিতে দিতে চলে গেল। কথার ফাঁকে ফাঁকে পানওয়ালার মাথা দুলছে
আস্তে আস্তে।
বসন্ত বলে ফেলল, বাঃ, বেশ হচ্ছে!
পানওয়ালা ফিরে তাকাল, কিছু বলছেন বাবু?
লজ্জিত হয়ে বসন্ত বললে, না না, ও কিছু না।
গান শেষ হল। চমৎকার উতরে গেছে উমা। প্রথম দিনেই সচরাচর এত ভালো গাইতে শোনা যায় না। আনন্দে গৌরবে উদ্ভাসিত হয়ে অভিনন্দন জানাবার জন্যে বসন্ত গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। বারো মিনিট।
মাথার ওপরে চৈত্রের সূর্য। পথে পিচ গলছে। পানওয়ালার রেডিয়ো থেকে রুক্ষ গলায় পল্লি-সংগীত ভেসে আসছে—ঝুমুর গাইছে। বসন্তের অসহ্য বোধ হল। ওর নাম ঝুমুর নয়, ঝুমুরের ক্যারিকেচার। ওর চাইতে অনেক অনেক ভালো ঝুমুর আসে উমার গলায়।
ট্রামের শব্দ। বাসের ভেঁপু। পোড়া তেলের কটু গন্ধ তপ্ত হাওয়ায় ছড়িয়ে যাওয়া মোটর। লক্ষ লক্ষ ধারালো লোহার শিকের মতো রোদের ছোঁয়া। এখনও কেন আসছে না উমা?
উমা এল আরও দশ মিনিট পরে, শার্টের তলায় বসন্তের গেঞ্জিটা যখন ভিজে জবজবে হয়ে গেছে, তখন।
কিন্তু একা এল না। সঙ্গে বেরিয়ে এল আর একজন। এই মানুষটিকে অনেক বার দেখেছে বসন্ত। গানের জলসায়, অসংখ্য পত্রপত্রিকার পাতায়।
সিতাংশু চ্যাটার্জি। দুর্দান্ত আধুনিক গাইয়ে। বাংলা দেশ পাগল হয়ে থাকে সিতাংশুর নামে। উমা খুশিতে ঝলমল করতে করতে আসছে তার সঙ্গে। তার হাতে সবুজ রঙের ভাঁজ-করা চেকটা।
