আজ সেইদিন, সেই বারোই এপ্রিল।
বাড়িতে একটা রেডিয়ো নেই—সেই দুঃখে মরমে মরে যাচ্ছিলেন লতিকা। হঠাৎ কোথা থেকে বসন্ত এসে হাজির। শরীর ঘামে-ভেঝা, বগলে লোকাল সেট রেডিয়ো একটা।
উমা বললে, এ কী বসন্তদা! এ আবার কোত্থেকে আনলেন? কপালের ঘাম মুছে বসন্ত বললে, আমার এক বন্ধুর দোকান থেকে চেয়ে এনেছি। মাসিমার এত শখ তোমার গান শোনার, অথচ শুনতে পাবেন না—তাও কি হয়!
লতিকা উল্লসিত হয়ে বললেন, তা বেশ করেছ বাবা, খুব ভালো করেছ। পরের বাড়িতে কার কাছে শুনতে যাব? কত ঠ্যাকার করবে ঠিক নেই। বেশ হয়েছে। এখন তুমিই একটু ঠিকঠাক করে দাও, আমরা তো ওর কিছুই জানিনে।
ঘরের ভেতরেই এরিয়াল খাঁটিয়ে দিলে বসন্ত। উমা পুরানো টিপয়টা নিয়ে এল, তার ওপরে সাদা ঢাকনিও পেতে দিল একটা। সাদা প্লাস্টিকের ছোট্ট রেডিয়োটা খুশিতে ঝকমক করতে লাগল।
খুট করে সুইচ খুলে দিলে বসন্ত। অজানা গায়কের আধুনিক গান ঢেউয়ের মতো ভেঙে পড়ল ঘরের মধ্যে।
মুগ্ধ হয়ে লতিকা বললেন, কী মিষ্টি আওজায়—কী পষ্ট! এর কত দাম হবে বসন্ত?
বসন্ত বললে, কত আর? শ-খানেক হবে বোধ হয়।
শ-খানেক! লতিকা নিভে গেলেন।
চৌকির কোনায় বসে গানটা শুনতে লাগল উমা। আধুনিক গান গাইছে। এরাও প্রোগ্রাম পায়! গলায় কাজ নেই, একটু চড়ায় তুললেই বেসুরো হয়ে যাচ্ছে, অথচ এরাই নিয়মিত গান গেয়ে চলেছে—বাঁধা আর্টিস্ট! আর উমা…।
উমা জানে, তার গলাকে সোনার সুতোর মতো মেজে দিয়েছে বসন্ত। সুর তার ওপরে আলোর মতো ঝলমল করে ওঠে। এবারে দেশের মানুষ তার পরিচয় পাবে। এতদিন যা অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল, তা এইবার ফুলের মতো ফুটে উঠবে সকলের সামনে। তারপর… তারপর একদিন লোকে তারও গানের জন্যে প্রতীক্ষা করে থাকবে সেটের পাশে। উত্তেজিত হয়ে বলবে, আজকের প্রোগ্রাম মিস করা চলবে না—উমা দত্তের গান আছে সাড়ে ছটায়। তারও ছবি ছাপা হবে প্রোগ্রামের বইয়ের মলাটে। ডাক আসবে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে, নতুন রেকর্ডের তালিকায় তার নাম থাকবে সকলের ওপরে। নানা জলসা থেকে লোক আসবে, আসবে অসংখ্য ভক্তের চিঠি।
উমা! বসন্ত ডাকল। সুর কেটে গেল, ভেঙে গেল স্বপ্ন। আধুনিক গান তখন থেমে গেছে, কে যেন সেতারে সারং বাজাতে শুরু করেছে। এই সকাল বেলায় সারং! আশ্চর্য, এরাও প্রোগ্রাম পায়।
উমা! আবার ডাকল বসন্ত। পটলডাঙা লেনের এক-তলা ঘরের ম্লান আলোয় কেমন বীভৎস দেখাল বসন্তকে। একটা চোখ সাদা—যেন চোখের ওপর পাথরের পরকলা পরা। কপালের বাঁ-পাশে পোড়া চামড়াটা কুঁচকে রয়েছে, কতকগুলো কালো কালো ক্রিমি যেন জড়াজড়ি করছে একসঙ্গে। আর একটু সুন্দর হলে কী ক্ষতি ছিল বসন্তদার!
ভেবেই লজ্জিত হল উমা। সুরের জগতে সম্রাট বসন্তদা। দুর্ভাগ্য তার গলা থেকে গান কেড়ে নিয়েছে, তবু অফুরন্ত রত্নের ভান্ডার তার কাছে। তা থেকে কতটুকুই-বা নিতে পেরেছে সে আজ পর্যন্ত?
কী বলছিলেন বসন্তদা?
এসো, গান দুটো আর এক বার মহলা দেওয়া যাক।
উমা বললে, আর কী হবে? এতদিন ধরে যা হওয়ার সে তো হয়েইছে, এখন আর…।
লতিকা ধমক দিলেন, থাম থাম, বেশি বখামি করতে হবে না। বসন্ত বলছে—আর এক বার ঠিক করে নে। আজ ভালো গেয়ে ওদের খুশি করতে পারলে তবে তো ওরা আবার প্রোগ্রাম দেবে।
আচ্ছা, বসুন বসন্তদা। আমি আপনার জন্যে চা করে আনি। উমা উঠে দাঁড়াল।
লতিকা বিরক্ত হয়ে উঠলেন, হয়েছে হয়েছে, তোমায় আর কাজ দেখাতে হবে না এখন। এক পেয়ালা চা আমিই এনে দিতে পারব। তুই যা, ভুলটুল থাকলে এইবেলা ঠিক করে নে।
একটা মৃদু উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে উমার সকালটা বয়ে গেল। অডিশন দেওয়ার সময়েই বুকে থরহরি জেগেছিল, এখন কী হবে? সে তো শুধু মাইকের সামনেই গাইছে না, বিদ্যুতের স্রোত বেয়ে তার গান পৌঁছুবে হাজার হাজার মানুষের কাছে। কত গুণী-জ্ঞানী আছে তাদের মধ্যে, কত সমঝদার আছে তাদের দলে। সেই অসংখ্য অগণিত শ্রোতাকে সে কি খুশি করতে পারবে? যদি ঘাবড়ে যায়, যদি তাল কাটে, যদি বেসুরো হয়ে যায়? কাল রাত পর্যন্ত যেটা তাকে মাদকতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, মায়ের হাতে হাতে জীর্ণ হয়ে যাওয়া চিঠিখানাকে সকলের অগোচরে আর এক বার লুকিয়ে পড়বার সময় যে-ঢেউ দুলেছিল বুকের ভেতর, হঠাৎ তারা সব কেমন যেন স্তিমিত হয়ে এসেছে।
পারবে তো, পারবে তো উমা?
বসন্তদা বলেছেন কোনো ভয় নেই। কিন্তু ভরসাই-বা কোথায়? তখন তো বসন্তদা সামনে থাকবে না! অভয় দিয়ে বলবে না—ঠিক হচ্ছে, গেয়ে যাও! সব অপরিচিত, সবাই অনাত্মীয়। স্নেহের চোখ দিয়ে তারা কেউ তাকে দেখবে না—যাচাই করে নেবে। উমার হাত-পা যেন হিম হয়ে আসতে চাইল। হঠাৎ মনে হল রেডিয়ো-প্রোগ্রাম তার দরকার নেই। একটা ঝড় বৃষ্টি-সাইক্লোন কিছু হোক, ট্রাফিক বন্ধ হয়ে যাক কলকাতার, উমাকে যেন রেডিয়ো স্টেশনে যেতে না হয়।
কিন্তু কিছুই হল না। চৈত্র মাসের তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল আকাশে জেগে রইল খুরধার সূর্য, ঘড়ির কাঁটা চলল লাফে লাফে, তারপর যথাসময়ে এল বসন্ত।
একটা পনেরো এখন, রেডি তো উমা?
সাড়ে বারোটা থেকেই লতিকা উমাকে কাপড় পরিয়ে বসিয়ে রেখেছেন। একটা থেকেই অধৈর্য হয়ে উঠছিলেন, কেন এখনও আসছে না বসন্ত! আর রেডিয়োর সামনে বসে গান খবর সব শুনছিলেন কান পেতে। সঙ্গে সঙ্গেই তাড়া লাগালেন তিনি।
