গাইয়ে! সে-পরিচয় পেতেও দেরি হয়নি। অদ্ভুত ভাঙা গলা—গান গাইলে মনে হয় গোঙানি। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সেদিন সামনে থেকে পালিয়ে গিয়েছিল উমা।
তারপর আস্তে আস্তে ওই কদাকার মূর্তি আর বিকৃত কণ্ঠস্বরের আড়াল সরিয়ে আর একজন বসন্ত আত্মপ্রকাশ করল। কী বিচিত্র জীবন এই মানুষটার! কবচকুন্ডলের মতো অপরূপ সুরেলা গলা নিয়েই জন্মেছিল। নিজের সুরই কস্তুরী হরিণের মতো দিশেহারা করল তাকে। স্কুলের মাইনের টাকা নিয়ে উঠে পড়ল লখনউয়ের গাড়িতে, সেখান থেকে দিল্লি। বারো বছর পরে ফিরল কলকাতায়, তখন সে দস্তুরমতে ওস্তাদ।
পেছনে জোর ছিল না তাই রেডিয়ো-রেকর্ডে সুযোগ পেল না। শুরু করল গানের টিউশন। হাওড়া থেকে বেলেঘাটা, শ্যামবাজার থেকে বালিগঞ্জ। তারও পরে মেনিনজাইটিস। একটা চোখ সাদা হয়ে গেল, গলা থেকে নিশ্চিহ্ন হল গান।
গান গেল কিন্তু সুর রয়ে গেল। কাটা হাতে আর তুলি উঠল না, কিন্তু মনে রইল রঙের মেলা। টিউশনের বাজার কেড়ে নিলে অন্তঃসারহীন সুকণ্ঠের দল। বারো বছরের সঞ্চয় নিয়ে রত্নভান্ডারে যখের মতো পড়ে রইল বসন্ত।
শুধু রাজা লেনের বস্তির ঘরে যারা তার সন্ধান রাখত—তারাই দু-চার জন এল এগিয়ে। অদ্ভুত বিকৃত গলায় বসন্ত তাদের হাতে তুলে দেয় সুরের চাবি, মণিভান্ডার থেকে যা পারে তারা কুড়িয়ে নেয় দু-হাতে। আর এল উমা। শুধু দূরতম আত্মীয়তার সূত্রেই নয়, উমার গানে বসন্ত জাতশিল্পীর সন্ধান পেল।
চার বছর ধরে বসন্ত ইস্পাতে শান দিয়েছে; শ্রান্তিহীন চেষ্টায় সোনার তারের মতো উজ্জ্বল আর মসৃণ করে দিয়েছে উমার গলা। শিবদাসবাবুর মুখ এক-এক সময় বিকৃত হয়ে উঠেছে, কেবল পয়সা দিতে লাগে না বলেই সহ্য করে গেছেন কোনোমতে। কখনো কখনো লতিকা পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেছেন, এখন তোর ওই হা-হা-হা-হা বন্ধ কর বাপু, কান যে ঝালাপালা হয়ে গেল! সকালে রেওয়াজ শুরু করলেই পাড়ার কয়েক জন রসিক ছেলে শেয়াল ডেকে উঠেছে একসঙ্গে। দোতলার মোটা গিন্নির গর্জন শোনা গেছে, আর তো এ জ্বালা সহ্য হয়, কর্পোরেশনে একটা খবর দিলে হয়। সকাল-সন্ধে ওই মড়াকান্না শুনতে শুনতে পাড়ার কাক-চিলগুলো পর্যন্ত ভয়ে সিঁটিয়ে গেল যে!
তবু উমা থামেনি, বসন্তই থামতে দেয়নি তাকে। পাড়ার ছেলেদের উৎপাতে এক-এক দিন কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে উমা, বলেছে, আপনি মিথ্যেই চেষ্টা করছেন বসন্তদা, আমার কিছু হবে না। উত্তরে কদাকার মুখে সস্নেহ হাসি হেসেছে বসন্ত, তোমার যদি না হয়, তাহলে কারও হবে না উমা। অনেক তপস্যা না করলে দেবতা প্রসন্ন হন না। সরস্বতীর বর পেতে গেলে তোমায় আরও কিছুদিন কষ্ট করতে হবে বই কী।
সেই তপস্যার আজ প্রথম ফল। রেডিয়োতে প্রথম প্রোগ্রাম। বসন্তের জিত হয়েছে। আজকে।
উমা তাকিয়ে রইল বসন্তের দিকে। যেমনভাবে সকালে শিবদাস আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনি করে সেও যেন দেখতে পেল। ভারি সুন্দর, ভারি স্নিগ্ধ বসন্তদার মুখখানা।
লতিকা ঘরে ঢুকলেন। এই যে বসন্ত, কখন এলে? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, শুনেছ তো খবর? দেখেছ চিঠিখানা?
উমা হাসল, চিঠি আর কী করে দেখবেন মা? তুমিই তো ওটা হাতে করে এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছ! লতিকা লজ্জা পেলেন, খামখানা বাড়িয়ে দিলেন বসন্তের দিকে। স্বল্পশিক্ষিত বসন্ত ঠোঁট বিড়বিড় করে ইংরেজি শব্দে হোঁচট খেতে খেতে কোনোমতে পড়ে ফেলল চিঠিটা। সাদা চোখটা পর্যন্ত যেন খুশিতে জ্বলে উঠল তার।
লতিকা উমার কথারই প্রতিধ্বনি করলেন, সবই তোমার জন্যে বাবা। তুমি এমন করে লেগে না থাকলে কিছুতেই কিছু হত না। শেষপর্যন্ত মেয়েটা তবু তোমার মুখ রেখেছে। তা একটু বসো তুমি—আমি চা করে দিই, দুটো মিষ্টিও আনাই তোমার জন্যে।
বসন্ত কুণ্ঠিত হয়ে বললে, থাক থাক, আপনি বিব্রত হবেন না। আমার গ্যাসট্রিক গোলমাল
আছে, বাজারের খাবার সহ্য হবে না। তার চাইতে উমার প্রোগ্রামটা ভালো করে হয়ে যাক–আমি এসে ওর রান্না পেট ভরে খেয়ে যাব।
সে তো খাবেই, নিশ্চয়ই খাবে। আনন্দে প্রায় তরল হয়ে গেলেন লতিকা, তোমাকে খাইয়েই তো পুণ্যি। তোমার জন্যেই তো ও আজ দশজনের একজন হতে পেরেছে।
বসন্ত হাসল, না মাসিমা, দশজনের একজন হতে এখনও কিছু দেরি আছে ওর। এ তো সবে শুরু। এখনও অনেক খাটতে হবে, বিস্তর তপস্যা করতে হবে।
লতিকা কী বলতে চাইছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন। সকালে একতরফা বাণবর্ষণ করেছিলেন, এবার ও-পক্ষ থেকে তির আসতে শুরু হয়েছে।
মোটা গিন্নির কলেজে-পড়া গোলগাল মেয়ে রুনকি সিঁড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আকাশকে কথা শোনাতে লাগল, ভারি তো পনেরো মিনিটের প্রোগ্রাম, তায় আবার দুপুরে। দুপুর বেলা তো ঝড়তি-পড়তি গাইয়েদের ওরা প্রোগ্রাম দেয়, পানওয়ালা আর রাস্তার ঝাঁকামুটে ছাড়া সে-গান কেউ তো শোনে না।
সারাদিনের পর এতক্ষণে মোটা গিন্নির দরাজ গলা গমগম করে উঠল, তারই চোটে তো সারাদিন কাড়া-নাকাড়া বাজছে। কাল থেকে রাস্তায় বোধ হয় পোস্টার পড়বে।
ঝগড়ার উৎসাহে লতিকার দুই চোখ দপ করে জ্বলে উঠল।
শুনলে বসন্ত, নিজের কানেই তো শুনলে? স্বরগ্রাম এক পর্দা চড়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই, হিংসায় বুকের ভেতরটা একেবারে জ্বলে খাক হয়ে যাচ্ছে, তাই…
বসন্ত বাধা দিলে। শান্ত হাসি হেসে বললে, কেন ওসবে কান দিচ্ছেন মাসিমা! ওসব কথার উত্তর ঝগড়া করে দেওয়া যাবে না, উমা সত্যিকারের বড়ো গাইয়ে হয়ে তবেই ওর জবাব দেবে। আপনি আমার জন্যে চা আনবেন বলেছিলেন, নিয়ে আসুন।
