না, কোনো ভুল নেই। উমা দত্ত, কেয়ার অব শিবনাথ দত্ত, সাতের পাঁচ পটলডাঙা লেন, কলকাতা-নয়। আর কেউ হতেই পারে না।
হঠাৎ যেন চোখ দুটো কেমন ঝাপসা হয়ে যেতে চাইল শিবদাসের।
উমা? উমা কই?
উমা দাঁড়িয়ে ছিল দরজার পাশেই। সুখে আর আনন্দে তার পাখির মতো উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কেমন একটা লজ্জাও হচ্ছে এখন, পা জড়িয়ে যাচ্ছে যেন।
শিবদাস আবার ডাকলেন, উমা, উমা কোথায়?
উমা বেরিয়ে এল এবার। কালো রোগা চেহারার মেয়ে, বিয়ের বাজারে যারা প্রথম দৃষ্টিতেই বাতিল হয়ে যায়। সামনে এসে দাঁড়াল মাথা নীচু করে।
শিবদাস কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যিই চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যেতে চাইছে। কাল সন্ধে বেলাতেই কুড়ি বছরের এই কুদর্শনা অনূঢ়া মেয়েটির মৃত্যুকামনা করছিলেন শিবদাস। মাত্র সাড়ে সাত টাকা দিয়ে মাসের শেষ পাঁচ দিন কী করে চালাবেন তার সূক্ষ হিসেব করতে বসে উমার গলা সাধবার উৎপাতে হিংস্র হয়ে ভাবছিলেন, এক আছাড়ে ওর তানপুরাটা ভেঙে দেবেন কি না। কিন্তু এখন…
অনুতাপের একটা বোবা বেদনা শিবদাসের বুকের ভেতরে লতিয়ে লতিয়ে উঠতে লাগল। আশ্চর্য সুন্দরী মনে হল এই শীর্ণদেহিনী কুরূপা মেয়েটিকে। কালো? যদি দুখানা ভালো সাবানও কোনোদিন কিনে দিতে পারতেন তাহলে এই কালো থেকেই আলো ঠিকরে বেরোত। যদি পেট ভরে একমুঠো খেতে দিতে পারতেন, তাহলে এই কালো মেয়েই ফুটে উঠত কৃষ্ণকলির মতো।
চোখে জল আসছে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিলেন শিবদাস। ধরা গলায় বললেন, দে দে, শিগগির ডুপ্লিকেটটা সই করে দে। আমি এক্ষুনি রেজিষ্ট্রি করে দিয়ে আসি।
উমা মৃদুভাবে বললে, ব্যস্ত হচ্ছ কেন বাবা, সাত দিনের মধ্যে পাঠালেই তো…
না না, পোস্ট অফিসকে বিশ্বাস নেই। শিবদাস প্রগলভ হয়ে উঠলেন। ওরা বনগাঁর চিঠি বম্বেতে নিয়ে গিয়ে ডেলিভারি দেয়। দে শিগগির সই করে, আমি এখুনি রেজিস্টার্ড পোস্টে পাঠিয়ে দিয়ে আসছি। আর বসন্তকেও খবরটা দিয়ে আসি ওইসঙ্গে।
উমা চিঠিটা নিয়ে ঘরে ঢুকল। হাতের সইটা কেমন আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছে তার। ডুপ্লিকেটটা ছিঁড়ে দিতেও মায়া লাগছে—মনে হচ্ছে কেমন অঙ্গহানি হয়ে যাবে এমন সুন্দর চিঠিটার।
আর, আর বসন্তদা! সবাই যখন ঠাট্টা করত, যখন পাড়ার তিন-চারটে ছেলে শুনিয়ে শুনিয়ে তার গানকে ভ্যাংচাত, তার ওপর মা-র অসীম বিশ্বাসও মধ্যে মধ্যে টলে উঠত যখন, তখন শুধু বসন্তদাই হাল ছাড়ত না। বলত, হবে—নিশ্চয়ই হবে তোমার। গান গলায় তোমার আছেই, কেবল তাকে আর একটু পথ করে দিতে হবে, সুরের ভেতর আরও একটু খেলতে দিতে হবে। নাও, ধরো তানপুরা। হ্যাঁ, খেয়াল আছে তো? এটা ঝাঁপতাল।
এক টুকরো চিঠিও লিখে দিলে কেমন হয় বসন্তদাকে? ছোট্ট একটুখানি চিঠি?
কিন্তু সময় পাওয়া গেল না। বাইরে থেকে শিবদাসের হাঁক এল, কই রে, এত দেরি হচ্ছে কেন? আমার যে আবার ওদিকে অফিসের বেলা হয়ে যাবে?
বসন্তদাকে চিঠি আর লেখা হল না।
শিবদাস বেরিয়ে গেলেন দ্রুত পায়ে। আর দোতলার মোটা গিন্নিকে শুনিয়ে শুনিয়ে লতিকা বলে চললেন, মেয়েটা রেডিয়োতে গান গাইবে, আর বাড়িতে একটা রেডিয়ো নেই! কত বার বলেছি, কেনো—কেনো একটা, তা এমন হাড়কেপ্পন কিছুতেই কিনলে না!
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কুঁকড়ে গেল উমা। মা যে কখনো বাবাকে রেডিয়ো কিনতে বলেছিলেন এবং একশো ত্রিশ টাকা রোজগারের বাবা ইচ্ছে করলেই যে একটা রেডিয়ো কিনতে পারেন, এমন আশ্চর্য খবর উমা এই প্রথম শুনল।
আঃ, চুপ করো মা।
বাজারের তরকারি ঝাঁকায় তুলতে তুলতে লতিকা ঝংকার দিয়ে উঠলেন, কেন চুপ করব? রেডিয়ো থাকলে কি আর ভাবনা ছিল? নিজের মেয়ের গান ঘরে বসেই শুনতে পেতাম। তা না-ই রইল। যারা রাতদিন বসে বসে রেডিয়ো বাজায় তাদের ক-জনের মেয়েই-বা প্রোগ্রাম পায় শুনি?
শেষের শব্দভেদী বাণটা দোতলার মোটা গিন্নির উদ্দেশ্যেই। কিন্তু ও-পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মোটা গিন্নির নিশ্চয়ই মাথা ধরেছে এতক্ষণে এবং কপালে ওডিকোলনের পটি লাগিয়ে বিছানায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
বসন্ত এল বিকেল বেলাতেই। একমুখ প্রসন্ন হাসি হেসে বললে, ভারি খুশি হয়েছি উমা।
উমা পায়ের ধুলো নিলে বসন্তের, সব আপনার জন্যেই বসন্তদা।
আমার জন্যে? না না। বসন্তের মুখে হাসিটা লেগেই রইল। তোমার নিজের ভেতরেই শক্তি ছিল। আজ হোক কাল হোক তোমার যা পাওনা সে তুমি পেতেই।
উমা বসন্তের দিকে তাকাল। সে নিজে কুরূপা, কিন্তু তার চাইতেও কুৎসিত আর কদাকার বসন্তের চেহারা। একটা চোখ একেবারে সাদা, সে-চোখে সে দেখতে পায় না। বাঁ-গালটা কী করে পুড়ে গিয়েছিল, খানিক চামড়া তাল-পাকানো কাগজের ভাঁজের মতো কুঁচকে আছে সেখানে। দু-হাতের অস্থিসার আঙুলগুলো সবসময়েই অল্প অল্প কাঁপে—কোনো স্নায়বিক ব্যাধি আছে নিশ্চয়।
তবু তার আজকের এই সৌভাগ্য বসন্তের জন্যই। বসন্তই তার গানকে জাতে তুলে দিয়েছে।
শিবদাসবাবুর বাড়িতে বসন্ত প্রথম এসেছিল কী-একটা দূরতম আত্মীয়তার সূত্রে; আর দেখেই আঁতকে উঠেছিল উমা।
মা গো, কী বিশ্রী চেহারা লোকটার! যেন তাল গাছ থেকে নেমে এসেছে।
শিবদাস বলেছিলেন, না না, ছেলেটা খুব ভালো আর খুব বড়ো গাইয়ে।
