দুর্যোধন ফিরে যাচ্ছিল, হঠাৎ কানে এল : শুধু একটি জিনিস সাবধান। সেটি দেখলেই ওনার মেজাজ বিগড়ে যায়। সেটি হল–
আর সেটি যে কী, তাই শুনেই দুর্যোধন ঘুরে এল ষাঁড়ওলার কাছে। একসঙ্গে তার অনেকগুলো কথা মনে পড়ে গেল।
-পাঁচ সিকে দিতে পারি, ষাঁড় দেবে?
–পাঁচ সিকে! তা কী করে হয়?রাখোহরি বললে, অন্তত পাঁচ টাকা হলেও
না, পাঁচ সিকের এক পয়সাও বেশি নয়।
–আচ্ছা ন্যাও তবে। ব্যাজার হয়ে রাখোহরি বললে, বিনি পয়সাতেই লক্ষ্মী ছেড়ে দিলাম। তোমার বরাত ভালো, মোড়ল–নির্ঘাত শেয়াল বাঁয়ে রেখে হেঁটে এসেছিলে।
পাঁচ সিকে দিয়ে ষাঁড় কিনে, দড়ি ধরে দুর্যোধন রওনা হল বাড়ির দিকে। দড়ি টানতে হল না, ষাঁড় আপনিই সুড়সুড় করে চলতে লাগল তার সঙ্গে। হাটের লোক তার বোকামো দেখে নানারকম ঠাট্টা করতে লাগল, কোত্থেকে সেই ত্যাঁদড় ছেলে দুটো এসে পেছন থেকে বক দেখাতে লাগল। কিন্তু দুর্যোধন ভ্রূক্ষেপও করল না–গম্ভীরভাবে এগিয়ে চলল।
পথে শিবের ষাঁড় বিশেষ গোলমাল করল না। শুধু এক ফাঁকে দুর্যোধনের কাঁধ থেকে নতুন নীল গামছাটা নিয়ে খেয়ে ফেলল, তার হাটের বোঁচকা থেকে একটা লাউয়ের বোঁটা বেরিয়েছিল–সেটা টেনে অনেকক্ষণ ধরে চিবুল, একজন হাটুরে একবোঝা শাক নিয়ে যাচ্ছিল–ঝাঁ করে তার অর্ধেকটাই মুখে তুলে নিলে। সে গালাগাল করতে লাগল, দুর্যোধন ফিরেও চাইল না।
তারপর দুর্যোধন খেয়াঘাটে পৌঁছুল। নৌকোয় উঠল না–যাঁড়ের ঘাড়ে চেপে নদীতে নামল। ষাঁড় এক-আধবার আপত্তি করল, ঝেড়ে ফেলতে চাইল কিন্তু দুর্যোধন শক্ত করে কুঁজটা পাকড়ে আছে বিশেষ সুবিধে করতে পারল না। শুধু দু-একবার চটাং-চটাং করে ল্যাজের ঘা লাগাল, চাবুকের ঘায়ের মতোই লাগল সেটা। দুর্যোধন মুখ নাক সিঁটকে বসে রইল।
আর, তাই দেখে-ঘাট-মাঝির চালার ভেতরে বসে, মুচকে-মুচকে হাসল গোবরা গড়াই : বটে-বটে। এবারেও ঘাটের পয়সা না দিয়ে পালাবার মতলব। দাঁড়াও-দাঁড়াও—
এবারে উঠে রাস্তার দিকে পা বাড়াতেই সেই টকটকে লাল পাগড়ি মাথায় চড়িয়ে আদালতের পেয়াদার মতো মেজাজ নিয়ে গোবরা তেড়ে এল : বলি, পয়সা না দিয়ে
আর বলতে হল না। গরর-গুরর ঝা–ঝাং বলে এক গগনভেদী হাঁক ছাড়ল বিশ্বনাথের ষাঁড়। তারপর সামনের পা দিয়ে দুবার বালি খুঁড়েই–মাথা নামিয়ে সেই মস্ত-মস্ত শিং বাগিয়ে গোবরাকে তাড়া করল।
বাবা গো গিছি–মেলে–মেলে–মেলে (মারলে–মারলে)–বলতে বলতে গোবরা প্রাণপণে ছুটল, ষাঁড়ও ছুটল পিছনে-পিছনে। সে কী দৌড়! যেন একখানা গাড়ি নিয়েই পঞ্জাব মেল ঘণ্টায় ষাট মাইল বেগে ছুটে চলল। চোখের পলকে মাঠ-ঘাট বনবাদাড় পেরিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল তারা। পঞ্জাব মেলের সঙ্গে কেবল তফাত এই যে, এর ইঞ্জিনটা পিছন দিকে।
দুর্যোধন মনে-মনে বললে, ছোটো গোবর্ধন-ছোটো। শিবের ষাঁড়–দৌড় করাতে করাতে তোমায় কৈলাসে নিয়ে যাবে। ঘাটের পয়সা আর নিতে হচ্ছেনি।
হাঁ, খেয়াঘাটের চার পয়সা বাঁচানোর জন্যেই পাঁচ সিকেতে ষাঁড় কিনেছে দুর্যোধন, দেড় টাকার গামছা আর দুআনার লাউটাও গেছে। কারণ, রাখোহরি বলেছিল, এনার সব ভালো–কেবল টকটকে নাল (লাল) কাপড় দেখলিই খেপে যান। আর তাই শুনেই গোবরার লাল পাগড়িটার কথা দুর্যোধনের মনে পড়ে গিয়েছিল।
গোবরা এবং ষাঁড় এতক্ষণে কত দূরে কে জানে। হয়তো কৈলাসের কাছাকাছিই গিয়ে পৌঁছেছে। খরচ একটু বেশিই হল, কিন্তু প্রতিশোধের দামটাই কি কম।
একটা বিড়ি ধরিয়ে, গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে বাড়ি চলল দুর্যোধন।
দেনা
এবং কী পরিতাপ-বাড়িতে একটা রেডিয়ো নেই!
স্বামী তখন এক টাকার বাজার এনে নামিয়েছেন ঘরের দাওয়ায়। তিন ছটাক মাছ, প্রায় স্বচ্ছ একটি লাউয়ের ফালি, এক পোয়া আলু আর বাজারের বাইরে থেকে সস্তায় কেনা গোটা কয়েক অসুস্থ চেহারার বেগুন। উদবৃত্ত তিন পয়সায় কেনা বিড়ি থেকে একটা সবে ঠোঁটে দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় স্ত্রীর আক্রমণে হকচকিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। এমন অদ্ভুত নিরীহ চোখ মেলে চেয়ে রইলেন যে, মনে হল হিব্রু ভাষা শুনছেন।
এখন? এখন কী? উত্তেজিত ভাষায় লতিকা জিজ্ঞেস করলেন, কী হবে এবার?
কীসের কী হবে? শিবদাসবাবু তখনও বিস্ময়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ব্যাপারটা কী!
লতিকা এবার গলা তুললেন। দোতলায় অহংকারে মটমট করা মোটা গিন্নিকে শোনাবার মতো করে স্বরগ্রাম ওপরে তুলে দিয়ে বললেন, উমা রেডিয়োতে প্রোগ্রাম পেয়েছে।
অ্যাঁ! পঁচানব্বই টাকা মাইনে আর পঁয়ত্রিশ টাকা ডিএ-র শিবদাসবাবু এমন একটা ধ্বনি তুললেন যে, সেটা আতঙ্ক না উল্লাস ভালো করে বোঝা গেল না।
এই দ্যাখো। সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি নামাঙ্কিত এবং সার্ভিস লেখা স্ট্যাম্প আটা মেটে রঙের খামখানা লতিকা এগিয়ে দিলেন স্বামীর দিকে। আবার দোতলার মোটা গিন্নির কানে মধুবৃষ্টি করে চড়া পর্দায় জানালেন, বারোই এপ্রিল। বেলা দুটোর সময়। পনেরো মিনিটের প্রোগ্রাম, পনেরো টাকা পাবে।
রাত দুটোর সময় হঠাৎ একখানা অনিশ্চিত এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম এলে যে-আতঙ্ক আর উত্তেজনা নিয়ে মানুষ খাম হেঁড়ে, তেমনিভাবেই কাঁপা হাতে ছাপানো ফর্মের ওপর টাইপ করা চিঠিখানা খুললেন শিবদাস। বাঁ-হাত দিয়ে চশমাটা ঠিক করে নিলেন, তারপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে গেলেন। এক বার, দু-বার, তিন বার, চার বার।
