রাম-রাম–থু-থু-সবাই কানে আঙুল দিলে।
ষাঁড়টা পচা বাঁধাকপিটা শেষ করে এবার গলা খুলে আওয়াজ ছাড়ল : গুরর ঝাঁই–গুরর ঝাঁই
–এই দ্যাখো–গুঁফো লোকটা মাথা নেড়ে বললে, সেই কথা শুনে ইনি এখনও কত কষ্ট পাচ্ছেন–তাই জানিয়ে দেলেন।
একজন বললে, বাপরে কী গলাখান। যেন মেঘ ডাকছে।
–তা, ইনি কালিয়া হতে গিয়ে বেঁচে এলেন কেমন করে?–বোকাসোকা চেহারার একটি রোগা লোক জানতে চাইল।
–এনাকে রান্না করে খাবে এমন কেউ আছে নাকি দুনিয়ায়? তা সে গোরা মিলিটারিই হোক আর যাই হোক। রেলগাড়িতে চাপিয়ে এনাকে তো আসাম না কোথায় পাচার করছিল। কী একটা ইসটিশানে গাড়ি থেমেছে আর ইনি দড়ি ছিঁড়ে এক লাফে নেমে পড়েছেন। একজন মিলিটারি এ গোরু ভাগো মৎ বলে ধরতে এয়েছেলে, তাকে ঢুঁসিয়ে চিত করে ফেললেন। তারপর এক ছুটে মাঠের মধ্যি হাওয়া হয়ে গেলেন।
-তারপর?
তারপর আর কী? ছিষ্টি চষে বেড়াতে লাগলেন। আজ এর খ্যাত সাবড়ে দ্যান, কাল ওর খামার আধাসাট করেন, পরশু হয়তো ধোপারা কোথাও কাপড় কাঁচতে দিয়েছে ইনি এসে হাজির হলেন–খেলে খেলে বলতি-না বলতি ডজনখানিক শাড়ি জামা এনার পেটের গভভরে চালান হয়ে গেল।
তার চাইতে ইনি মিলিটারির পেটের গভভরে গেলিই তো ভালো হত–একটা মন্তব্য ভেসে এল।
–কে বললে, কে বললে একথা?–গুঁফো লোকটা চটে উঠল : মহাপাপী তো! মরে নরকে যাবে–তারপর গো-ভূতেরা এসে গুঁতিয়ে-গুঁতিয়ে তোমার ভুতুড়ি বের করে দেবে, দেখে নিয়ে।
কথাটা যে বলেছিল, তার আর সাড়া পাওয়া গেল না।
–তা, তুমি এনাকে পেলে কী করে?–আর-একজনের জিজ্ঞাসা।
লোকটা আবার হাত তুলে মাথায় ঠেকালে : গুরুর দয়া।
-গোরুর দয়া?
ধুত্তোর! গুঁফো লোকটা আবার চটে গেল : গুরু আর গোরুর তফাত বোঝো না–কোথাকার বুদ্ধু হে?
–যেতি দাও, যেতি দাও–সেই বোকাসোকা মানুষটা আবার বললে, তুমি কী করে এনাকে পেলে, তাই বলো।
তাই তো বলছি। একদিন রাত্তিরে স্বপন দ্যাখলাম, তোর দোরগড়ায় শিবের ষাঁড়ের বংশধর রয়েছেন বরণ করে নে–একজন সাধু যেন আমায় বলছেন। আমি বললাম, বাবা, তিনি আমার দোরে এলেন কী করে? ত্যাখন সাধু আমায় সব কথা খুলে বললেন। আমি বললুম, বাবা, এনাকে খাওয়াব কী? সাধু বললেন, যা দিবি, তাই খাবেন তারপর নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেবেন। তুই শুধু এনাকে গোয়ালে থাকতে দিস। দেখিস, তোর ভালো হবে। ঘুম ভেঙে দেখি, ইনি দোর জুড়ে শুয়ে রয়েছেন য্যানো গন্ধমাদন। বললুম, বাবা-দরজা ছেড়ে দ্যাও-নইলে তো বেরুতি পারব না। তার চে গোয়ালে চলে এসো। তক্ষুনি ঝাঁ-গুড়-গুড় বলে জয়টাকের মতো আওয়াজ ছেড়ে দাঁড়ালেন, আর সুড়সুড়িয়ে গোয়ালে এলেন।
তারপর?
–তারপর যা হল, কী বলব! একটা হাঁস দুবচ্ছর ডিম দিচ্ছিল না, একরাতে সেটা ছটা ডিম পেড়ে ফেললে–
দূর!–একজন প্রতিবাদ করল : বাজে কথা বললিই শুনব? এক রাত্রে হাঁসে ছটা ডিম পাড়তি পারে কখনও?
–পারে। গুরুর দয়া হলিই
–গুরুর দয়া নয়, গোরুর দয়া বলল মোড়ল।
-আচ্ছা আচ্ছা গোরুর দয়া না হয় হল। কিন্তু হাঁসে ছটা ডিম পাড়ল, একটা মরা আমগাছ ভরে বউল এল, আমার খুড়ো কোমরের বাতে এক বচ্ছর বিছনায় পড়েছেলে তিনি তিড়িং করে উঠে মাঠে দৌড়ে গেল যে। বললে পেত্যয় যাবে না–তক্ষুনি জমিতে চাষ দিয়ে এল। একটা ভোঁদড় রোজ পুকুরের মাছ খেয়ে যাচ্ছিল, একদিন একটা চেতল মাছ তার ঠ্যাঙে অ্যায়সা কামড়ে দিলে যে সেটা খোঁড়া হয়ে চিল্লোতে চিল্লোতে দেশ ছেড়ে পালাল।
একেই বলে গোরুর দয়া।–এতক্ষণে কথা বললে দুর্যোধন।
–তবেই বুঝে ন্যাও। এ-ষাঁড় যার ঘরে যাবে–তার লক্ষ্মী একেবারে বাঁধা। কিনে ফেল কিনে ফেল।–গুঁফো লোকটা বেশ জোরে-জোরে হাঁক ছাড়ল।
বিলিয়ে দাও না ক্যানে? পড়ে-পাওয়া ষাঁড় বেচতে এয়েচ? ঘরের লক্ষ্মীই বা বিদেয় করছ কেনে?–দুর্যোধন জানতে চাইল।
–স্বপ্নাদেশ পেলাম যে! একদিন আবার সেই সাধু এসে বললেন, রাখোহরি হাজরা কাজটা তো ভালো হচ্চেনি, বাছা! ইনি এয়েছেন সক্কলের ভালো করবার জন্যি–তুই একাই এনাকে দখল করে রাখবি? এবার ছেড়ে দে। তাই হাটে বেচতে এনু।
-বেচবে ক্যানে? এমনিই দিয়ে দ্যাও–দুর্যোধন বললে।
বাঃ, শিবপুজো দিতে হবে না? পঞ্চাশ টাকা খরচ করতি হবে–সাধু বলে দিয়েচেন।
–পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ষাঁড়! বলি পাগল না পেট-খারাপ?
–একটু লোকসান করেও দিতি পারি–দেবতার জিনিস। চল্লিশ টাকা হলিও নিতি পারো!
–বোকা ভুলোবার জায়গা পাওনি আর?–এইবারে একজনের প্রতিবাদ শোনা গেল : গাঁজাখুরি গপ্পো শুনিয়ে টাকা নেবে? পয়সা দিয়ে কেউ ষাঁড় কেনে? |
রাখোহরি হাজরা চটে গেল : তুমি তো ভারি পাপী লোক হে। মরে নরকে যাবে আর গো-ভূতে
ধ্যাত্তোর গো-ভূত।–সে-লোকটা সবাইকে ডেকে বললে, চলো হে চলো। ওসব বিশ্বাস করতি নেই।
রাখোহরি দাঁত খিঁচিয়ে বললে, এতক্ষণ দিব্যি কানখাড়া করে শুনছিলে; আর পয়সার বেলাতেই অমনি বিশ্বাস করতি নেই! যাও যাও! অনেক পুণ্যি থাকলে শিবের ষাঁড় কিনতি পায়-তোমার বরাতে থাকলি তো!
দলবল নিয়ে অবিশ্বাসীটা চলে গেল, কিছু লোক দাঁড়িয়ে রইল তখনও। আর রাখোহরি সমানে গলা চড়িয়ে বলতে লাগল : লিয়ে যাও–লিয়ে যাও–শিবের ষাঁড়। ঘরে থাকলিই লক্ষ্মীঠাকরুন বাঁধা। খাবার-দাবারের ভাবনা নেই কলামুলো, ছেঁড়া কাপড় যা দেবে তাই খাবেন। শুধু গোয়ালে বেঁধে রাখলেই গোরুতে কেঁড়ে-ভর্তি দুধ দেবে, খেত ভরে ফসল হবে, খুড়োর বাত সেরে যাবে, একটা হাঁসে ছটা করে ডিম পাড়বে
