চারটে পয়সা গেল, সেটা বড় কথা নয়–অপমানটা বিঁধল তার চাইতেও বেশি। রাগে দুর্যোধনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলতে লাগল। এমন কি মাথাটা চিড়বিড়ও করতে লাগল, মনে হল কেউ সেখানে লঙ্কাবাটা ঘষে দিয়েছে। বড় বাড় বেড়েছে গোবরাটা। মানুষকে আর সে গণ্যিই করে না। কিন্তু লোকটাকে কিছু বলবারও জো নেই। ইয়া তাগড়াই জোয়ান-বেশি চ্যাঁ-ভ্যাঁ করতে গেলে এক চড়ে দাঁতকপাটি লাগিয়ে দেবে।
হুঁকোর মতো মুখ করে দুর্যোধন খালিশপুরের হাটে গেল।
প্রথমেই এক ঠোঙা গরম-গরম জিলিপি কিনে খেলে, কিন্তু রাগের চোটে জিলিপিগুলো চিরতার মতো তেতো লাগল। কচুরি খেতে গিয়ে মনে হল কচুপোড়া খাচ্ছে তাও বুনো কচু–গলার ভেতরে কুটুর কাটুর করে কামড়াচ্ছে।
ময়রাকে বললে, এ-সব কী খাবার করেছ হে? মুখে দেওয়া যায় না যে একটুও?
ময়রা রেগে বললে, হাটসুদ্ধ খেয়ে শাবাশ শাবাশ বলছে, আর তোমারই পছন্দ হলনি? বলি, মুখখানা কি সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে এয়োচ? দোকানে বসে মিছে বদনাম কোরোনি।
গোরুটা তখন চোখ বুজে শালপাতার ঠোঙা চিবুচ্ছিল–তার নড়বার ইচ্ছে ছিল না। মেঠাইগুলো দুর্যোধনের যেমনই লাগুক, গোরুটার কিন্তু অমৃত মনে হচ্ছিল। আর খেতে হবেনি এই ছোটলোকটার ঠোঙা বলে গোরুটাকে এক চড় লাগিয়ে দুর্যোধন সেটাকে টানতে টানতে গো-হাটায় নিয়ে গেল।
মেজাজ চড়েই ছিল, দু-চারজন খদ্দেরের সঙ্গে গোড়ার দিকে খিটিমিটিই হয়ে গেল খানিকটা। শেষে একজন যখন নগদ পঞ্চাশ টাকায় গোটা কিনে নিলে, তখন দুর্যোধন একটু শান্ত হল। হাট করল, মস্ত একটা বোয়াল মাছ কিনল। পাঁঠাও কিনবার ইচ্ছে ছিল, তারপরেই মনে হল, গোবরা হয়তো পাঁঠার পারানি বাবদ দুআনা পয়সাই আদায় করে নেবে। বিশ্বাস নেই ওকে।
একটা বটগাছতলায় বসে গায়ের গামছাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছিল দুর্যোধন। বেলাবেলিই হাট হয়ে গেছে, এখনও চড়া রোদ্র চারদিকে। রোদটা একটু পড়লেই সে রওনা হবে।
এমন সময় গো-হাটার দিকে তার নজর পড়ল। এক জায়গায় বিস্তর লোক জড়ো হয়েছে, খুব হইচই হচ্ছে সেখানে। একটা ঝোল্লা গোঁফওলা লোক হাত-পা নেড়ে কী সব যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে। দুটো দুষ্টু ছেলে পিছন থেকে তাকে বক দেখাচ্ছিল–লোকটা কষে একটা তাড়া দিতেই তারা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
দুর্যোধনের মনে হল, ব্যাপারটা জানা দরকার। বোয়াল মাছ আর হাটের বোঁচকা চেনা আলুওলার দোকানে জিম্মা করে দিয়ে সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।
ব্যাপার আর কিছু নয়–ভিড়ের মাঝখানে শাদায়কালোয় মেশানো এক পেল্লায় যাঁড় দাঁড়িয়ে। মস্ত কুঁজ, মস্ত-মস্ত শিং, গলার চামড়া ঝালরের মতো ঝুলে পড়েছে। তার চেহারা দেখেই আত্মারাম চমকে ওঠে। গলায় দড়ি বাঁধা, ঝোল্লা গোঁফওলা লোকটা ধরে রয়েছে সেটা। আর ফোঁসফোঁস শব্দ করে ষাঁড়টা একটা বিরাট পচা বাঁধাকপি খেয়ে চলেছে।
কিন্তু আসল ব্যাপার ষাঁড়টা নয়। সেই গুঁফো লোকটাই রেলগাড়ির ক্যানভাসারের মতো সমানে একটানা গলায় বলে যাচ্ছিল, চারদিকের মানুষগুলো তাই শুনছিল কান পেতে।
হাসি-মস্করার কথা নয় মশাই-এটি সোজা ষাঁড় নন। এনার আস্তানা ছেলো কাশীর বিশ্বনাথের গলিতে। ইনি হলেন সাক্ষাৎ মহাদেবের ষাঁড়ের বংশধর। শিং দুখানার চেহারা একবার দ্যাখেন?
–তা বিশ্বনাথের গলি ছেড়ে খালিশপুরের হাটে পচা কপি চিবুতে এলেন ক্যানে?–ভিড়ের ভেতর থেকে একজন জানতে চাইল।
লীলে-দেবতার লীলে!–গুঁফো লোকটা একবার কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করল, ষাঁড়কে না বিশ্বনাথকে-কে জানে। তারপর আবার শুরু হল বক্তৃতা : সে হল গে অনেক কালের কথা। তখন যুদ্ধ চলছে। তখন ইনি ছেলেন নেহাত নাবালক-বিশ্বনাথের গলিতে ঘুরতেন। এর-তার দোকানে মুখ দিয়ে কারুর গজা, কারুর চমচম লোপাট করতেন। তা মিঠাই খেতি-খেতি অরুচি ধরে গিয়েছিল বলে একদিন এক বেনারসী শাড়ির দোকানে মুখ বাড়িয়ে দুখানা শাড়ি খেয়ে ফেলেছিলেন।
-দুখানা বেনারসী শাড়ি খেলেন ইনি? সেই কচি বয়েসে?–একজন প্রায় খাবি খেল : তা হলে এখন তো এক ডজন সতরঞ্চি খেয়ে ফেলতি পারেন।
–পারেন বই কি।–ঝোল্লাগুঁফো লোকটা মিটির-মিটির হেসে বললে, ইনি শিবের ষাঁড়ের বংশধর-এনার অসাধ্যি কী আছে! নিয়ে এস না সতরঞ্চি, হাতে হাতে দেখিয়ে দিচ্ছি।
বয়ে গেছে আমার। এখন আমি ষাঁড়ের জন্যি সতরঞ্চি কিনতি যাই আর কি।
পিছন থেকে সেই দুষ্টু ছেলেদুটো আবার বক দেখাচ্ছিল। লোকটা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, অ্যাও। ত্যাখোন থেকে যে আমায় বক দেখাচ্ছিস, ভেবেছিস কী! এক্ষুনি ষাঁড়ের মুখে ধরে দেব, আধখানা চিবিয়ে দেবে-বুঝবি মজাটা।–বলেই সে ওদের ধরবার জন্যে হাত বাড়াল।
বাবা গো, গিছি গিছি বলে ছেলে দুটো পাঁই-পাঁই করে ছুটে পালাল। ভিড়ের মানুষগুলো অধৈর্য হয়ে উঠল : কই, কাশী থেকে ইনি ক্যামন করে এলেন, তা তো বললে না।
–আহা, তাই তো বলছিনু–লোকটা একবার গোঁফে তা দিয়ে নিলে : তা তোমরা বলতি দিচ্ছ কই? সেই-যে বেনারসীওলা–সে ছেলো মহা ফিচেল আর বেজায় ঘুঘু। রাতের বেলা ইনি এক মুদির দোকানের নীচে শুয়ে জাবর কাটছেন, কোখাও জন-মনিয্যি নেই–ত্যাখোন বেনারসীওলা আর তার তিনটে ষণ্ডা ছেলে এসে এনাকে পিটতে-পিটতে বড় রাস্তায় নিয়ে এল। সেখানে গোরা মিলিটারিরা গাড়ি নিয়ে খাপ পেতে বসেছেল–তারা তক্ষুনি এনাকে গাড়িতে উঠিয়ে ফেললে। ওদের মতলব, এনাকে দিয়ে কালিয়া বানিয়ে খাবে।
