কী করে তাড়াব?
ঢিল মার।
কোথায় পাব ঢিল?
–তাও তো বটে। ফুচুদা বললেন : তবে মিষ্টি কথায় ভোলা। বাড়ি যেতে বলে দে। আঃ বল না একটা ছড়া-টড়া।
ছড়া-টড়া। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম : হাট্টিমা টিম টিম–তারা মাঠে পাড়ে ডিম।
শুনে কী হল বলা যায় না, কুকুরটা থমকে গেল। আর-একবার খ্যাঁক করে ডাক দিয়েই উল্টোমুখে ছুটে চলে গেল।
ফুচুদা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন : যাক, বাঁচা গেল এযাত্রা। পালাল।
আমি বললাম, পালাবে কেন? মাঠের ভেতরে হাট্টিমা টিম টিমের ডিম খুঁজতে গেল বোধহয়।–বুঝতে পেরেছে, তোমার পায়ের চেয়ে সেটা বেশি সুখাদ্য হবে।
ফুচুদা রেগে বললেন, পাকামি করিসনি। আমার পা তোদের মতো বাজে পা নয়। কিন্তু কী মনে করে তুই এখনও গুরুজনের কাঁধে ঠ্যাং ছড়িয়ে রেখেছিস শুনি?
পা নামিয়ে নিয়ে আমি বললাম, ওহো, মনে ছিল না। বাড়ি ফিরে গুনে-গুনে একশো প্রণাম করব তোমাকে।–বোধহয় একশো প্রণামের নাম শুনে মাঠে গোরুগুলোও ভক্তিতে মাথা নিচু করল। হঠাৎ দেখা গেল, একপাল গোরু আমাদের দিকেই আসছে। মাথা নিচু দেখে আশ্বাস পাওয়া গেল না, কারণ নত মস্তকের ওপর উঁচিয়ে আছে বড় বড় শিং।
ফুচুদা বললেন, এই সেরেছে। গোরু আসছে যে।
আমি বললাম, শুধু গোরু নয়–মোষও আসছে ওদিক থেকে। প্রায় সাত-আটটা মোষ। কোথায় ডোবার মধ্যে বসেছিল–মোটরবাইকের আওয়াজ শুনে ছুটে আলাপ করতে আসছে আমাদের সঙ্গে। তাদের শিংয়ের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কেন শাস্ত্রে তাদের বলা হয়েছে যমের বাহন।
ফুচুদা, এইবার গেছি।–গুঁতিয়ে যে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দেবে। ঘটাং করে ব্রেক কষলেন ফুচুদা। বললেন, আর সময় নেই প্যালা। চোঁচা ছুট দে। দেখছিস না–এসে পড়ল।
–জয় মা কালী-রাস্তার ওপর সাইকেল ফেলে আমরা ছুট লাগালাম। সামনেই একটা উঁচু ঢিবি। তার ওপরে উঠে নীচের দিকে লাফ দিতেই দুজনে জড়াজড়ি করে একটা পচা ডোবার মধ্যে গিয়ে পড়লাম।
ফুচুদা বললেন, ডোবা-ডোবাই সই। এর ভেতরেই নাক ডুবিয়ে বসে থাক এখন।
কী বিচ্ছিরি গন্ধ জলে।–আমি থু–থু করে খানিক পেঁকো জল ফেলে দিলাম। ফুচুদা ফ্যাঁচ করে উঠলেন : গন্ধ তো কী হয়েছে। ডোবার জলে কি এসেন্সের সুবাস থাকে নাকি?
আর, কী মশা।
মশা-ই তো থাকবে। মশার বদলে কি শশা ফলবে? কচকচ করে খাবি?
গায়ের ওপর ব্যাঙ লাফাচ্ছে যে।
নইলে যে মোষ লাফাত। সেটা বুঝি বড্ড আরামের হত? নে চুপ করে থাক। একদম স্পিকটি নট।
দুম করে বন্দুকের মতো আওয়াজ উঠল।
ফুচুদা বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, টায়ার গেল একটা।
–তা গেল–আমিও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তাকিয়ে দেখি, ফুচুদার ঠিক মাথার ওপর উঠে বসে একটা সোনাব্যাঙ ড্যাবডেবে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
দুঘন্টা পরে যখন উঠে এলাম, তখন সাইকেলটা আর চেনা যায় না। স্পোকগুলো ভাঙা–টায়ার ফাটা–যেন অ্যাটম বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা।
ফুচুদা বললেন, কী আর হবে।–চল এটাকে ঠেলে নিয়ে যাই।
আর আমি ঠেলি? অনেক ভুগিয়েছ–এবার তোমাকে আমি একটু ভোগাই।
বললাম–মিথ্যে করেই বললাম আমার পা মচকে গেছে, এক পা-ও হাঁটতে পারব না।
–তবে তুই সাইকেলে চেপে বোস, আমি তোকে ঠেলে নিয়ে যাই।
সারা গায়ে কাদা, নাকের ওপর একরাশ শ্যাওলা–পালোয়ান ফুচুদা হেঁইয়ো-হেঁইয়ো করে সেই এবড়ো-খেবড়ো মাঠের ভেতর দিয়ে আমাকে ঠেলে নিয়ে চললেন ভাঙা সাইকেল-সুদ্ধ। আর এতক্ষণে–সত্যি বলতে কী, মোটরসাইকেল চড়াটা আমার একেবারে মন্দ লাগল না।
দুর্যোধনের প্রতিহিংসা
দুর্যোধন মণ্ডল খালিশপুরের হাটে গোরু বিক্রি করতে যাচ্ছিল।
যাচ্ছিল ভালোই–বেশ খুশিমনে। গোরুটা দুবেলায় তিন সের দুধ দেয়– বিক্রি করে মোটা টাকা আসবে। সেই টাকা দিয়ে চাষের কাজের জন্যে একটা দামড়া বাছুর কিনবে, কিছু বাড়তি পয়সাও হাতে থাকবে তার। হাট ভালোই হবে, একটা পাঁঠাও কেনা যেতে পারে। বহুদিন আশ মিটিয়ে মাংস খাওয়া হয়নি।
গ্রাম থেকে মাইল চারেক হেঁটে শিলাই নদী। এখন শুকনার সময় নদীতে বুক পর্যন্ত ডোবে। দুর্যোধন গোরুর পিঠে চেপেই নদী পার হয়ে গেল। খালিশপুরের হাট আর ক্রোশখানেক মাত্র।
কিন্তু নদী পার হয়েই বাধল গণ্ডগোল। শিলাইয়ের খেয়াঘাটের মাঝি গোবরা এসে খপ করে কাঁধটা চেপে ধরল তার।
বলি, ও মোড়লের পো, গুটিগুটি পায়ে পালাচ্ছ যে বড়?
দুর্যোধন চটে গিয়ে বললে, পালাব ক্যানে–অ্যাঁ? কার চুরি করিছি যে পালাব?
গোবরা একটা টকটকে লাল শালুর ফালি যোগাড় করে তাই দিয়ে পেল্লায় পাগড়ি বেঁধেছে মাথায়। আর সেই পাগড়ি বেঁধেই তার মেজাজ একেবারে আদালতের পেয়াদার মতো সপ্তমে চড়ে উঠেছে।
–চুরি করোনি তো কী?–গোবরা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে বললে, খেয়ার পয়সা না দিয়েই সটকাচ্ছ?
-খেয়ার পয়সা!–দুর্যোধন আকাশ থেকে পড়ল : গোরুর পিঠে চড়ে পার হইচি, তোমার নায়ে পা-ও তো ঠেকাইনি। পয়সা দেব ক্যানে?
নদী পেরুলেই পয়সা দিতে হবে–তা তুমি গোরুতে চেপেই যাও, কি ডানা মেলে উড়েই যাও। নইলে গোরু আটকে রাখব–এই সাফ কথা বলে দেলাম।
গোবরা ষণ্ডা লোক, দুর্যোধন প্যাঁকাটির মতো রোগা। কাজেই পয়সা না দিয়ে পার পাওয়া গেল না। গুনে-গুনে চারটে পয়সা নিয়ে, সেগুলোকে ভালো করে দেখে গোবরা দুর্যোধনকে ছেড়ে দিলে। আর ঠাট্টা করে বললে, ভেবেছিলে চালাকি করে পেলিয়ে যাবে! তুমি তো তুমি–ঘাটের পয়সা না দিয়ে একটা মাছি পর্যন্ত পেরুতে পারবেকনি, এইটেই মনে করিয়ে দিচ্ছি।
