–হাওয়া খেতে আমার একদম ইচ্ছে করছে না–আমি জানালাম।
–তোর ইচ্ছে করুক আর না করুক, তাতে আর কী আসে যায় র্যা? ভারি আমার ওস্তাদ এসেছে।
আমি আরও কি বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু সুযোগ আর পেলাম না। তার আগেই ফুচুদার পালোয়ানী হাত আমাকে এক হ্যাঁচকা টানে মোটরসাইকেলে তুলে ফেলল।
আমি বললাম : গেলাম–গেলাম
ফুচুদা বললেন, এখনও যাসনি, এইবার চললি—
সঙ্গে-সঙ্গেই ভটভট করে মোটরসাইকেলের আওয়াজ উঠল।
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম : পড়ে যাব যে।
–যাস তো যাবি। জ্বরে না মরে অন্যভাবে মরলে এমন কিছু লোকসান হবে না।
আমি প্রাণপণে ফুচুদার কোমর জাপটে ধরলাম।
ডায়মণ্ডহারবার রোড দিয়ে মোটরবাইক ছুটল।
চোখ বুজে দুর্গানাম জপ করে চলেছি আমি। হু-হু করে হাওয়া বইছে কানের পাশ দিয়ে–মনে হচ্ছে, এখুনি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। আর ছিটকে যদি একবার পড়ি–তাহলে আর চ্যাঁ-ফ্যাঁ করতে হবে না, একেবারেই ঠাণ্ডা।
ফুচুদা আমার দিকে ঘাড় ফেরালেন : কেমন লাগছে প্যালা? গ্র্যাণ্ড–না?
আমি চোখ মেলে বললাম, গ্র্যাণ্ডই বটে। তবে শেষ পর্যন্ত গ্রাউণ্ডে গড়াগড়ি না খাই।
ফুচুদা চটে কি বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই সামাল-সামাল বলে রব উঠল। একটুর জন্যে ধাক্কা লাগল না একটা মোষের গাড়ির সঙ্গে।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম : ফুচুদা।
ফুচুদা রুখে বললেন, হয়েছে কী? অমন করে ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলি কেন কানের কাছে?
–এখুনি যে অ্যাকসিডেন্ট হত।
হত–বয়েই যেত। ট্রেনে অ্যাকসিডেন্ট হয় না? এরোপ্লেন ক্র্যাশ করে না? মোটর উল্টে যায় না? আর মোটর বাইক অ্যাকসিডেন্ট করতে পারবে না? ভেবেছিস কী তুই?
এমন সময় গেল-গেল রব উঠল আবার।
তাকিয়ে দেখি–সর্বনাশ। দৈত্যের মতো একটা বোঝাই লরি প্রায় আমাদের কাঁধের উপর এসে পড়েছে। আমি আতঙ্কে একটা হাঁ করলাম, কিন্তু মুখ দিয়ে আওয়াজ আর বেরুল না।
কী মন্ত্রে লরি-ড্রাইভার গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে নিলে সে আমি আজও জানি না। দুহাত এগিয়েই সে ঘস্ করে ব্রেক করল, তারপর লাফিয়ে নেমে ফুচুদাকে জিজ্ঞেস করলে, ই ক্যা হ্যায়?
ফুচুদা বললে, মোটরবাইক হ্যায়
ড্রাইভার কী বলতে গেল, তার আগেই পঁচিশ মাইল বেগে আমাদের মোটরবাইক ছুট লাগাল–আমার কানের পাশ দিয়ে বোঁ করে বেরিয়ে গেল একটুকরো ইট–লরি-ড্রাইভার ঢিল ছুঁড়ছে।
খানিক চুপচাপ। প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েছি। দু-দুটো ফাঁড়া কাটল–তিনেরটা কাটলে হয়। রাস্তার দুধারের গাছগুলো শনশন্ শব্দে ছিটকে যেতে লাগল পেছনে।
ফুচুদা বললে, বড় রাস্তায় একটা রিস্ক আছে দেখছি–না রে প্যালা?
স্বরটা এবার নরম ঠেকল। ফুচুদার কঠিন হৃদয় যেন কোমল হয়ে উঠছে একটু একটু করে।
বললাম রিস্ক আর বিশেষ কী–প্রাণটুকু চলে যেতে পারে এই যা।
ফুচুদা তেড়ে উঠলেন : গেলেই বা। তোর প্রাণের আবার দাম কী। ও তো পুঁটিমাছের প্রাণ। মরুক গে-বাজে বকাসনি আমাকে। চল, বড় রাস্তা ছেড়ে মাঠের রাস্তায় নামা যাক। চারিদিকে মুক্ত প্রকৃতি-লরি-ফরির হাঙ্গামা নেই–বেশ আরামে যাওয়া যাবে।
সেটা মন্দ কথা নয়–আমি খানিকটা আশ্বাস পেলাম।
আরও খানিক এগোতেই ডানদিকে মাঠের ভেতর একটা গোরুর গাড়ির রাস্তা পাওয়া গেল। সেই রাস্তায় ফুচুদা মোটরবাইক নামালেন।
কিন্তু গোরুর গাড়ির পথ–তার সঙ্গে চালাকি নয়। মনে হল যেন রিলিফ ম্যাপের ওপর দিয়ে চলছি। একবার ধপ করে পড়ছি প্রশান্ত মহাসাগরে–আর একবার ঠেলে উঠছি এভারেস্টের কাঁধের ওপর। কত বছর ধরে একটানা লাঙল ঠেললে অমন কায়দার একখানা রাস্তা তৈরি করা যায়–একমাত্র করুণাময় পরমেশ্বরই তার খবর দিতে পারেন।
ফুচুদা, কোমর যে গেল!
–কোমর যাবে কী রে! কেমন একসারসাইজ হচ্ছে বল দেখি? কী গ্র্যাণ্ড ঝাঁকুনি লাগছে।
–পেটের পিলে নড়ে গেল যে!
ফুচুদা বললেন, নড়বেই তো! পিলেই তো নড়ানো চাই! বুঝলি, তোর ওই বাসকপাতার রসের চাইতে এ-ওষুধ অনেক বেশি জোরালো। তিনদিন এই রাস্তায় আমার বাইকে চেপে আসবি–দেখবি পালা জ্বর, কালা জ্বর, সর্দি জ্বর, ডেঙ্গু জ্বর
কিন্তু জ্বরের তালিকাটা শেষ হওয়ার আগেই বাইক ছেড়ে আমি প্রায় আড়াই হাত শূন্যে ছিটকে উঠলাম। এবং ফুচুদাও। মোটরসাইকেলটা প্রায় দেড় হাত উঁচু থেকে একটা গর্তের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল। একরাশ পাঁক ছিটকে এল চোখেমুখে।
ফুচুদা, মাঠ যে আরও ভয়াবহ!–আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
–এক-আধটু লাগে বটে-ফুচুদাও স্বীকার করলেন : কিন্তু মোটরসাইকেল চড়া কি সোজা কাজ রে! খাটনি আছে বইকি! তবে ভাবিসনি, আস্তে আস্তে সইয়ে নেব এখন।
–কিন্তু সইয়ে নেবার আগে যদি মাঠসই হতে হয়?
হয় তো হবে।–ফুচুদা দাঁত খিচোলেন : তুই বড্ড বক—
কিন্তু বক পর্যন্ত বলেই টক্ করে বকুনি বন্ধ করলেন ফুচুদা। ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, পা তোল প্যালা, এক্ষুনি–
–পা তুলব? কোথায় তুলব?
ফুচুদা তাড়া দিলেন : তা আমি কী জানি? কাঁধের ওপর মাথার ওপর তালগাছের ওপর–যেখানে খুশি! দেখছিস নে–তেড়ে আসছে?
-কে?–জিজ্ঞেস করতেই দেখতে পেলাম। খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিতিকিচ্ছি আওয়াজ তুলে তীরবেগে আমাদেরই দিকে ছুটে আসছে একটা খেঁকি কুত্তা।
দুচোখে তার জিঘাংসা! আমি পা তুলে ফেললাম, একেবারে ফুচুদার কাঁধের ওপর। ফুচুদাও হ্যাণ্ডেলে পা তুলে আমায় বললেন, তাড়া প্যালা কুকুর তাড়া–
