কিন্তু শুধু কি নৌকো ডুবল? সেইসঙ্গে ডুবল ছ’রিম কাগজ, ছ’টা ফাউন্টেন পেন, ছ’বোতল কালি আর ছত্রিশটা কবিতা! ডুবে গেল বাঙলা সাহিত্যের ছত্রিশটা অ্যাটম বোমা!
আমি ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বললাম, চুলোয় যাক নৌকো, আমি ডাঙা দিয়ে হেঁটেই চলে যাব।
হেঁটে যাবেন! মানে? আমার নৌকো ডুবিয়ে দিয়ে হেঁটে যাবেন? চালাকি নয়–লৌকো তুলে দিতে হবে।
কী করে তুলব?
–ডুবে-ডুবে। আমিও ধরছি।–বলে ঝাঁটু ঝপাত করে জলে নামল।
–আমি পারব না।
–পারবেন না মানে? আপনি দেখছি একলম্বরের ডম্বোল। (ডম্বোল মানে বুঝি আরও খারাপ, না রে, প্যালা?) ওসব চলবে না কর্তা! এখনি তবে হাঁক ছাড়ব আর লাঠি-সড়কি রাম-দা নিয়ে লোক জড়ো হয়ে যাবে। এ-গাঁয়ের নাম ডাকাতে-হাতিপুর।
-থাক বাপু, আর হাঁক ছাড়তে হবে না। তুলে দিচ্ছি নৌকো।
তার পরেরটুকু বর্ণনা করবার ভাষা নেই প্যালা। সমস্ত রাত সেই কচুরিবনের মধ্যে ডুবে-ডুবে নৌকো তুললাম ভোরবেলায়। সে-সুখের তুলনা নেই! মশা, ঠাণ্ডা জল আর কাদার মধ্যে এক রাত ডুবে থাকতে কী আরাম–সে শুধু আমিই জানি। আর জানতে ইচ্ছে করছে সেই লোকটাকে-যে লিখেছিল : ও আমার দেশের মাটি–
সকালে ডাঙায় উঠে বেহুঁশ হয়ে শুয়ে পড়লাম। আর সঙ্গে সঙ্গে কম্প দিয়ে জ্বর এল। একশো পাঁচ ডিগ্রি জ্বর! দেশের ম্যালেরিয়া–একসঙ্গে লম্ব আর কম্প দুই-ই।
আজ দেড়মাস পরে জ্বর থেকে উঠে কলকাতায় ফিরেছি, প্যালা। না, আর কবিতা নয়। যে কবিতা লেখে সে শুধু ভোম্বল নয়–এক নম্বরের ডম্বোল!
হারাধনদা থামলেন। তারপর চেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে চিঁ-চিঁ করে বললেন : আঁর এক কাঁপ চা, প্যাঁলা–আর দুটো ম্যাঁপাক্রিন!
দুর্ধর্ষ মোটরসাইকেল
খিচুড়ি খেতে আমার ভালোই লাগে, কিন্তু খিচুড়ি জাতের জিনিস একদম পছন্দ করি না আমি।
যেমন, আলুবখরা। সেটা আলুও নয়-দাম না দিয়ে বখরাও তাতে পাওয়া যায় না। ওদিকে রাঁধতে গেলে বিস্তর বখেরা–চিনি চাই, কিসমিস চাই–এ চাই ও চাই। আর কাঁচা খেলে বোখার হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। কিংবা ধরো কাঠবেড়ালি। সে কাঠ নয় যে তাকে দিয়ে রান্না হবে, আবার বেড়ালিও নয় যে ভাঁড়ার ঘরের ইঁদুরকে একটু শায়েস্তা রাখবে।
সেইজন্যেই মোটরসাইকেল দেখলেই আমার কেমন খটকা লাগে। মোটরের তলায় চাপা পড়া যায়, আর সাইকেল চাপা দেওয়া যায়। কিন্তু যা এ-ও নয়–ও-ও নয়, তা যে কখন কী করে বসবে, সে সম্বন্ধে আমার মনে একটা গভীর দুশ্চিন্তা আছে। তাই মোটর-সাইকেলের কাছ থেকে সব সময় আমি দূরে থাকতে চেষ্টা করি। কিন্তু ভূমিকা বাদ দিয়ে কাহিনীটা বলি এইবার।
তোমরা আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদাকে দ্যাখোনি। অমন ভয়ঙ্কর লোক যে সংসারে একজনের বেশি জন্মায় না–পৃথিবীর পক্ষে একটা বাঁচোয়া বলতে হয় সেটাকে।
বছর তিনেক এক নাগাড়ে ম্যালেরিয়ায় ভুগে ফুচুদার পিলেটা হয়ে উঠেছিল জয়ঢাকের মতো। চুলগুলো দেখলে মনে হত, ঠিক ব্ৰহ্মতালু বরাবর কেউ একখানা মুড়ো ঝাঁটা বসিয়ে রেখেছে।
মিকশ্চার আর কুইনিন খেয়ে-খেয়ে ফুচুদার পেটের মধ্যে যখন দস্তুরমতো একটা ডিসপেনসারি তৈরি হয়ে গেল, তখন একদিন একশো চার জ্বর গায়ে নিয়েই ফুচুদা দুত্তোর ম্যালেরিয়ার নিকুচি করেছে বলে লাফিয়ে উঠলেন। তারপর সোজা ভাঁড়ারে গিয়ে কড়মড় করে খানিক ছোলা চিবিয়ে খেয়ে উঠনে নেমে ডন দিতে শুরু করলেন।
ওগো, আমার ফুচু যে পাগল হয়ে গেল বলে কান্না জুড়লেন পিসিমা। কিন্তু সে কান্নায় ফুচুদার হৃদয় আর গলল না। ব্যারামবীর ফুচুদা ব্যায়ামবীর হওয়ার জন্যে আদানুন খেয়ে লেগে গেলেন।
বললে বিশ্বাস করবে না–ম্যালেরিয়া তাড়িয়ে তবে তিনি থামলেন। শুধু তাড়ালেন তাই নয়–চেহারাখানা যা বাগালেন সে দশজনকে ডেকে দেখাবার মতো। তখন শুরু হল আমার ওপর দিনরাত উপদেশ বর্ষণ : কী ছাগলের মতো দিনরাত পালাজ্বরে ভুগিস প্যালা–ছাঃ ছ্যাঃ!
-ছাগলে বুঝি খুব পালাজ্বরে ভোগে ফুচুদা?–আমি জানতে চাইলাম।
–তোর সঙ্গে কথা বলাই ধাষ্টামো! বিরক্তিতে ফুচুদা নাক কুঁচকোলেন।–শোন প্যালা–যদি রোজ সকালে তিনশো ডন আর তিনশো বৈঠক দিতে পারিস, তোর পালাজ্বর পালাতে পথ পাবে না।
তিনশো ডন আর তিনশো বৈঠক!–শুনেই আমার দম আটকে এল : পালাজ্বর পালাবার আগেই যে তবে আমাকে পালাতে হবে ফুচুদা! মানে, আমার দেহ ছেড়ে চম্পট দিতে হবে আত্মারামকে।
ফুচুদা আর কিছু বললেন না। দুমদাম করে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলাম। তিনশো ডন আর তিনশো বৈঠক। তার চেয়ে তিনশো বছর জ্বরে ভোগা ভালো।
কিন্তু ফুচুদা আমায় ছাড়লেন না।
রবিবারের সকালে অঙ্ক নিয়ে বসেছি।
এমন সময় দোরগোড়ায় ভটভট করে একটা সন্দেহজনক আওয়াজ পাওয়া গেল। আঁতকে লাফিয়ে উঠতেই দেখি–মোটরবাইকই বটে। আর তার ওপর ফুচুদা বসে আছেন চেঙ্গিস খাঁর ভঙ্গিতে। চেঙ্গিস খাঁকে আমি দেখিনি কিন্তু ফুচুদার মুখের চেহারা দেখেই মনে হল চেঙ্গিস খাঁ নিশ্চয়ই এই ভঙ্গিতে ঘোড়ায় চাপতেন।
ফুচুদা বললেন, প্যালা–চলে আয়।
আমি বললাম, কোথায়?
–নতুন বাইক কিনেছি, তোকে একটা রাইড দেব।
আমার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। সভয়ে বললাম, অঙ্কটা মিলছে না ফুচুদা, আজ থাক।
ফুচুদা ভ্রূকুটি করলেন : জ্বরে ভুগে-ভুগে আর ঘরে বসে বসে থেকে তোর মগজে মরচে পড়ে গেছে। অঙ্ক মিলবে কোত্থেকে? দরকার হল ফ্রেশ এয়ার। চল, তোকে হাওয়া খাইয়ে আনি।
