ছ’টা কলম একসঙ্গে বাগিয়ে আমি নৌকোয় চড়লাম। ঝাঁটু লগি তুলে নৌকো ছাড়ল।
-হ্যাঁরে প্যালা, তোদের রবি ঠাকুর গুল দেয়নি তো? নৌকোয় বসে সত্যিই কখনও লেখা যায় নাকি? এই দুলছে তো সেই দুলছে। কলম একবার ঘ্যাঁচ করে এদিকে যাচ্ছে, আর একবার ওদিকে। খানিক বাদেই দেখি, এক লাইনও লেখা হয়নি–একরাশ ছবি আঁকা হয়ে গেছে খাতার ওপর।
বললাম, ওরে ঝাঁটু, নৌকো থামা। যে জন্য এত খেদমদ, তাই যে হচ্ছে না! এক লাইনও লিখতে পারছি না!
ঝাঁটু শেয়ালের মতো খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসল।
–লৌকোয় বসে কেউ লেখাপড়া করে নাকি! আপনি কর্তা এক-লম্বরের
ভোম্বল বলার আগেই আমি একটা বোম্বাই ধমক দিলাম ওকে–একেবারে খাম্বাজ রাগিণীতে। বললাম, তুই চুপ কর বলছি। নৌকো বাঁধ।
ঝাঁটু ম্রিয়মাণ হয়ে বললে, আপনার পাঁঠা আপনি ল্যাজেই কাটুন আর মুড়োতেই কাটুন, আমার কী।–এই বলে লগি ডুবিয়ে মাঝনদীতে সে নৌকো থামাল। তারপরেই সোজা তালগোল পাকিয়ে শুয়ে পড়ল গলুইয়ের ওপর। আর কী আশ্চর্য, জানিস প্যালা, দুমিনিটের মধ্যে তার নাক ডাকতে লাগল। আমার কবিতা শোনবার আগেই ওর নাক ডাকতে লাগল!
ওর নাক ডাকুক দুনিয়াসুদ্ধু লোকের নাক ডাকতে থাকুক, আমার কিছু আর আসে যায় না। আমি লিখতে লেগে গেলাম। ধানখেত, মাঠ, নদী, আকাশ, বাতাস–এর ভেতর থেকে কবিতা যেন দলে-দলে মারমার করে বেরিয়ে আসতে লাগল। আমাকে মারে আর-কি?
দিস্তে-ছয়েক কাগজ যখন শেষ করেছি, তখন খেয়াল হল, আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে অন্ধকার নেমেছে। রাত ঘনিয়েছে নির্জন নদীর ওপর।
আচমকা নাক-ডাকা বন্ধ হল ঝাঁটুর–তড়াক করে উঠে পড়ল।
–এই সেরেছে! রাত হয়ে গেল যে! আমাকে জানাননি কেন? কর্তা, আপনি এক লম্বরের
–থাম তো তুই। চল, এবার ঘরে ফিরি। রাত হয়ে গেছে। বড্ড খিদেও পেয়েছে।
–ঘরে ফিরবেন? ঝাঁটু খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে উঠল : আজ রেতে লয় আজ্ঞে। আর খিদে পেয়েছে? পেটে কিল মেরে পড়ে থাকুন।
বলে কী! শুনে কবিতা মাথায় উঠল।
–মস্করা করিসনি, ফিরে চল শিগগির! খিদেয় প্রাণ যায় ব্যাটা ইয়ার্কি জুড়েছে!
-ইয়ার্কি লয় আজ্ঞে! ঝাঁটু জলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললে, আপনি কর্তা বসে বসে ভ্যারাণ্ডা ভেজেছেন, আর এই ফাঁকে কচুরির ঝাঁক ভেসে এসে চারদিক ছেয়ে ফেলেছে! পেল্লায় ঝাঁক-সারা রাতেও ফুরুবে না। আর এই ঝাঁক ঠেলে লৌকো নিয়ে যাওয়া–আমি তো আমি, গোটা বাগদীপাড়ার সাধ্যি লয়, কর্তা!
খেয়াল করে দেখি, সত্যিই তাই! নদীর আর চিহ্নমাত্র নেই। অন্ধকারে যদ্দুর চোখ যায় তিন হাত প্রমাণ উঁচু কচুরির ঝাঁক মাথা নাড়ছে।
খিদের জ্বালায় আমার কান্না পেল : কী হবে ঝাঁটু?
ঝাঁটু একটা বিড়ি ধরাল।
–বিশেষ কিছু লয় আজ্ঞে। সারারাত এখন এখানে বসে মশার ফলার হবেন। মাঝরাতে আবার ডাকাতও পড়তে পারেন।
–অ্যাঁ–ডাকাত! আমার হৃৎপিণ্ড ততক্ষণে বরফ হয়ে গেছে।
–আজ্ঞে।
কাটে-টাটে না তো?
–তা কাটেন। ঝাঁটু নিশ্চিন্তে বিড়িতে টান দিল : প্রায়ই কাটেন। কিন্তু আমার আর কী লেবে–এই ভাঙা লৌকোই সম্বল; ভয়টা আপনারই কর্তা–জায়গাটাও ডাকাতে-হাতিপুর।
আমি কেঁদে ফেললাম।
–হ্যাঁরে ঝাঁটু, এখান থেকে পালাবার কোনও উপায় নেই?
আজ্ঞে না। শান্ত গলায় জবাব দিয়ে সে আবার শোয়ার উদ্যোগ করল।
ইচ্ছে করছিল, ডাকাতের হাতে সাবাড় হওয়ার আগে ঝাঁটুকেই সাবাড় করি আমি। কিন্তু পৈতৃক প্রাণের মায়া কাটানো অত সহজ নয়! আমি ঝাঁটুকে জাপটে ধরলাম : দশ টাকা দেব, পনেরো টাকা দেব, পঁচিশ টাকা দেব ঝাঁটু–আমাকে অপঘাত মৃত্যু থেকে বাঁচা, বাপধন!
পঁচিশ টাকা দেবেন? ঝাঁটু উঠে বসল–চোখ মিটমিট করতে লাগল তার।
কালীর দিব্যি! তোর গা ছুঁয়ে বলছি!
শুনেই নৌকো থেকে গুণের দড়ি গুছিয়ে নিয়ে ঝাঁটু ঝপাং করে সেই কচুরি বনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল।
–এই, পালাচ্ছিস নাকি?–আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
–পালাব কেন? আপনি কর্তা একলম্বরের ভোম্বল! আমি ডাঙায় চড়ে গুণ টানি–আপনি লগি ঠেলুন। লৌকো ঠিক বার করে নিয়ে যাব।
লগি ঠেলব? আচ্ছা! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি লগি তুললাম।
কখনও লগি ঠেলেছিস, প্যালা? আমি বলছি, ঠেলিসনি। লগির মতো বিশ্বাসঘাতক কিছু নেই! হেঁইয়ো করে যেই ঠেলা দিয়েছি, পায়ের তলা থেকে নৌকোটা সাঁৎ করে বেরিয়ে গেল। আর আমি? লগির ওপর শূন্যে সেকেন্ড-দুই ঝুলে থেকেই ঝপাং করে একেবরে কচুরিবনের মধ্যে। তারপর একবুক জলে। ডাঙা থেকে ঝাঁটুর খ্যাঁক-খ্যাঁক হাসি শোনা গেল।
-আপনি কর্তা–কী আর বলব। নিন–উঠে পড়ুন ঝটপট।
নৌকোর একটা মজা দেখেছিস, প্যালা? ডাঙা থেকে পা বাড়ালেই চড়া যায় কিন্তু জল থেকে উঠতে গেলেই দেখবি, সেটাই মাথার ওপরে চড়তে চায়। সেই বিচ্ছিরি কচুরিবনের মধ্যে ভিজে ভূত হয়ে গেছি, নাকে-মুখে পিরপির করে মশা আর পোকা ঢুকছে, কিন্তু যেই চড়তে যাই–নৌকোটা কাত হয়ে আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।
ঝাঁটু পাড় থেকে চিৎকার ছাড়ল; আপনার জন্যে কি সারা রাত দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাব? উঠুন উঠে পড়ুন
মরিয়া হয়ে নৌকোয় ভর দিয়ে চড়তে গেছি ব্যস, আর কথা নেই। সঙ্গে সঙ্গে নৌকো কাত হয়ে আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে ফস করে সেই কচুরিবনের মধ্যে ডুবে গেল।
হায় হায় ডুবিয়ে দিলেন লৌকোটা? ঝাঁটু গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল : আপনি দেখছি একলম্বরের গম্বোল! (গম্বোল মানে কী রে, প্যালা?)।
