হারাধনদা বললেন :
ভাবলাম, কলকাতায় থেকে আমার কিচ্ছু হবে না। রবি ঠাকুরেরও হয়নি। এখানে জ্বালাতন হয়ে তিনি নৌকো করে পদ্মায় চলে গেলেন–আর বোটে বসে এনতার কবিতা লিখলেন। তাইতেই অত নাম আর নোবেল প্রাইজ।
সঙ্গে সঙ্গে পটাং করে জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন হল। আমিও যদি ওইরকম চড়ে নদীতে বেড়াতে পারি, তাহলে আমাকে পায় কে! এমন দুরন্ত দুর্ধর্ষ বেগে কবিতা বেরুতে থাকবে যে পড়ে হৃদকম্প হবে লোকের! একেবারে লম্ফ দিয়ে উঠবে দেশটা!
কিন্তু সেকম্প আর লম্ফ যে আমারই কপালে লেখা ছিল তা কি আমিই জানতাম!
জানিস তো-সাতপুরুষ কলকাতায় থাকি। কলকাতা থেকে মাইল-তিরিশেক দূরে আমাদের পৈতৃক বাড়ি। আমি তো আমি–ম্যালেরিয়ার ভয়ে আমার ঠাকুর্দা-ইস্তক কেউ কোনওদিন ও-তল্লাট মাড়ায়নি।
এতদিনে বুঝলাম, কী ভুলটাই করেছি! দেশে নদী-নালা-খানা-খন্দ বিস্তর–ওখানে গেলেই কবিতা মগজের ভেতরে বিজবিজ করে গজাতে থাকবে। আহা-হা, দেশের মতো কি আর জিনিস আছে? খাল-বিল বনবাদাড়–ও-ই তো কবিতার ডিপো। সাধে কি কবি লিখেছেন, ও আমার দেশের মাটি, তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা? কার লাইন রে? রবি ঠাকুরের? বিদ্যাসাগরের লেখা নাকি? না ‘মেঘনাদ বধ’-এ আছে?
যার লাইনই হোক–সে এক নম্বরের ধাপ্পাবাজ। নির্ঘাত ধাপ্পাবাজ। তোকে একটা কথা বলে রাখি প্যালা, দেশের মাটিতে কখনও মাথা নোয়াতে যাসনি। নুইয়েছিস কি শুইয়ে ছাড়বে–মাটি নেওয়াবে একদম!
ছ’রিম কাগজ, ছ’টা ফাউন্টেন পেন আর ছ’বোতল কালি নিয়ে আমি দেশে গেলাম।
গিয়ে দেখি–সারা গাঁ ভোঁ-ভোঁ। জন-মনিষ্যির বালাই নেই বললেই চলে। চারিদিকে ভাঙাচুরো বাড়ি আর কোমর-ভর আসামলতার জঙ্গল। যে-দু-চারজন আছে, তারা তো হাঁটে না–যেন বাদাড়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায়। ভাবলাম–খাসা! কানের কাছে ভ্যাঁপ ভ্যাঁপ করে মোটরের হর্ন বাজবে না, পাশের বাড়ির লোক্যাল সেট রেডিওটা পেত্নীর কান্না জুড়বে না, পথে-ঘাটে পকেট কাটা যাবে না। নিশ্চিন্ত মনে, নির্লিপ্ত হয়ে কবিতার নিরঙ্কুশ স্রোতে ভেসে যাব।
কিন্তু রাত্রেই টের পেলাম–আরও কিছু আছে।
মশারি ফুটো করে সারারাত মশারা আনন্দে বিউগল বাজাতে লাগল। গায়ের থেকে এক পর্দা চামড়াই খুবলে নিল বলতে গেলে। কোত্থেকে গোটা দুই আরশোলা এসে নাকে সুড়সুড়ি দিতে লাগল, আর রাত জেগে শুনতে লাগলাম বাড়ির উঠনে সাপে ব্যাং ধরেছে।
প্রথম রাতেই দমে গেলাম খানিকটা। কিন্তু জানিস তো–দশ হাজার সাড়ে বাহান্নটা কবিতা লিখেছি–এত সহজেই হটবার বান্দা নই আমি। ঠিক করলাম– না, ঘর আমার জন্যে নয়। কালই নৌকো নিয়ে নদীতে ভেসে পড়ব। তারপর রবি ঠাকুরের একদিন কি আমারই একদিন!
সকালেই বেরুলাম নদী আর নৌকোর সন্ধানে।
নদী? হ্যাঁ–পাওয়া গেল বইকি। হাত-বিশেক চওড়া। হাঁটুসমান কাদার ভেতরে আঁজলা-আঁজলা জল। নৌকো চড়ে পার পাওয়া যায় না, নৌকোকে কাঁধে চড়িয়ে পার করতে হয়।
দুত্তোর ছাই–এর জন্যে কাল সারারাত মশার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করলাম! চুলোয় যাক–কালই কলকাতায় ফিরব।
প্যালা রে, তাই যদি ফিরতাম!
পরদিন সকাল বাগদীদের এক ছোকরা বাগিয়ে ফেলল আমাকে। সকালে ঘর থেকে বেরুতেই দেখি, একমুখ দন্তবিকাশ করে দোরগোড়ায় সে দাঁড়িয়ে। রোগা ডিগডিগে, পেটভরা পিলে, একমাথা ধামার মতো চুল।
সম্ভাষণটা সে-ই করল।
কর্তার বুঝি লৌকোয় বেড়াবার সাধ হয়েছে?
সাধ! হতভাগা বলে কী! জ্বলন্ত কাব্য লেখবার দুরন্ত আবেগে আমি ফুটন্ত কেটলির মতো টগবগ করছি, আর বলে কিনা সাধ!
কিন্তু মূর্খটাকে সেকথা বোঝানো যাবে না। সংক্ষেপে বললাম, হুঁ। তোর নৌকো আছে?
–আজ্ঞে।
–সেটার চাকা আছে তো?
–আজ্ঞে কী যে বলেন!–ছোকরা জিভ কাটল : আপনি দেখছি একলম্বরের ভোম্বল। রেলগাড়ির চাকা থাকেন আজ্ঞে, লৌকোর নয়।
সাহস কত–আমাকে বলে ভোম্বল। আমি চটে গেলাম : রেলগাড়ির যে চাকা থাকেন, তা আমিও জানি। কিন্তু তোমাদের দেশের নদীতে তো জল নেই–নৌকো ডাঙা দিয়ে চলেন। চাকা নইলে যাবেন কী করে?
–আজ্ঞে, এ তো মরা নদী। উদিকে বড় লদী রয়েছে।
–তাই নাকি? কত বড় নদী?
-খুব বড়। চলুন না একবার। গেলেই বুঝতে পারবেন।
মনে-মনে খুশি হয়ে উঠলাম। বললাম, তোর নদী যদি পছন্দ হয়, তাহলে একদিন-দুদিন নয়, একদম তিন মাস নৌকোয় থেকে যাব, বুঝলি? যা ভাড়া চাস, তাই পাবি।
শুনে ছোকরা হাঁ করল : তিন মাস লৌকোয় থাকবেন?
হুঁ।
ছোকরা শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল : তিন মাস খামকা লৌকোয় থাকবেন! আপনি কর্তা এক নম্বরের ভোম্বল!
–চুপ কর, বকবক করিসনি। চল দেখি তোর নদী।
ছ’রিম কাগজ, ছ’টা ফাউন্টেন পেন আর ছ’বোতল কালি নিয়ে আমি ছোকরার পেছনে পেছনে বেরুলাম।
ছোকরার নাম ঝাঁটু। ঝাঁটার অপভ্রংশ বোধহয়। পরে বুঝেছিলাম, আমাকে ঝাঁটানোর জন্যেই তার আবির্ভাব!
সেই সাত-সকালে পাক্কা সাতটি মাইল হাঁটাল। কচুবন আর বিছুটির জঙ্গল মাড়িয়ে সারা গা চিড়বিড়িয়ে জ্বলতে লাগল, জুতোর ফোস্কা পড়ল, পায়ের জুতো হাতে চড়ল। খালি বলে : উই দেখা যাচ্ছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, উই আমি বিস্তর দেখেছি, তোর নদী গেল কোথায়?
–উই তো লদী।
সাত মাইল পরে উই লদী’ পাওয়া গেল। ততক্ষণে আমার আধ হাত জিভ বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু নদী দেখে মনটা আশ্বাস পেল। বেশ বড়ই হবে। স্রোত আছে কি নেই বোঝা যায় না দিব্যি টলটলে জল। এক ধারে আসশ্যাওড়ার বন, আর একদিকে ধানের খেত। ঝাঁটুর ছোট নৌকোটা পারেই বাঁধা। ঝাঁটু কোঁচড় থেকে এক খাবলা মুড়ি নিয়ে চিবোতে-চিবোতে নৌকোয় উঠল। বললে, উঠুন কর্তা। কত বেড়াতে পারেন, দেখব।
