বড় হওয়ার পরে এক বন্ধু বুঝিয়ে দিলেন, ওর নাম হিপনোটিজম। ওই পাখি, পাকা আঙুর…সব মায়া।
কিন্তু হিপনোটিজম? নানা দুঃখে ভরা আজকের এই বিড়ম্বিত জীবনে সেকথা মানতে আমার ইচ্ছে হয় না। রূপকথার জগৎটা হয়তো মিথ্যা নয়–শুধু সেখানে পৌঁছাবার চাবিকাঠিটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এক-আধজন হয়তো আজও সেই স্বপ্নলোকের সন্ধান জানে…হয়তো তাদেরই একজনের দুর্লভ আবির্ভাব সেদিন ঘটেছিল।
কিন্তু একথা সেদিন কেউই বিশ্বাস করতেন না। বাবা, ঠাকুরমা, ছোটকাকা…কেউই নয়।
আজকের এই এত বাস্তব দুঃখ-বেদনার ভেতরে একাহিনী তোমরাই কি বিশ্বাস করবে?
দুরন্ত নৌকা-ভ্রমণ
কতগুলো কসাই মরলে একটা মাসিকপত্রের সম্পাদক হয়ে জন্মায় কে জানে!
আমি–পটলডাঙার প্যালারাম–আমার জানা তো দূরে থাকা, আমাদের দুরন্ত দুর্বার ইরম্মদ কবি হারাধন হাওলাদার অবধি জানেন না। দেশে অস্ত্র-আইন না থাকলে তিনি একটা পিস্তল কিনতেন এবং তাই দিয়ে দিনে একটা করে সম্পাদক সাবাড় করতেন–এই তাঁর বাসনা। এবং সে বাসনাটা তিনি প্রকাশ করেছেন আমারই ঘরের তক্তপোশে বসে–উত্তেজনায় একটা প্রচণ্ড চাঁটি হাঁকড়েছেন এক পেয়ালা গরম চায়ের ওপর এবং হাত পুড়িয়ে গেছিগেছি রবে আর্তনাদ তুলে লাফাতে লাফাতে নেমে গেছেন সদর রাস্তায়।
একে প্রাণের জ্বালা, তার ওপর হাতের জ্বালা! হারাধন হাওলাদার মরিয়া হয়ে গেলেন।
দৈনিক গোটা দশেক করে কবিতা লেখেন। ভাবের আবেগ যেদিন দুর্বার বেগে বেরিয়ে আসে, সেদিন পঁচিশ-তিরিশটা পর্যন্ত লিখে ফেলেন। যেদিন প্রথম স্বাধীনতা এল, সেদিন মারাত্মক প্রেরণায় সাড়ে-পঁয়তাল্লিশটা কবিতার জন্ম দিয়েছিলেন। বাকি আধখানা আর লেখা হয়নি তাঁর ছোট ছেলে মন্টু হামাগুড়ি দিয়ে এসে সেটাকে চিবিয়ে ফেলেছিল। ওই সাড়ে পঁয়তাল্লিশ তাঁর রেকর্ড।
কিন্তু কৃতঘ্ন নরাধম সম্পাদকেরা কি একটা কবিতাও ছাপল। ছাপল না। না ছাপুক, বন্ধু বান্ধবেরা! তাদের ওপরেও ঘেন্না ধরে গেছে তাঁর। বিস্তর চপকাটলেটের লোভ দেখিয়ে যদিবা কবিতা শোনাতে ডেকে আনলেন–ভরপেট খাওয়ার পরে তাদেরই নাক ডাকতে লাগল। তাদের নাক কাকে ডাকতে লাগল কে জানে, কিন্তু হারাধনের কবিতাকে যে নয়–এব্যাপারে সন্দেহমাত্র নেই।
সুতরাং মরিয়া হয়ে হারাধন দেশত্যাগ করলেন।
যাওয়ার আগে শুধু আমার সঙ্গে দেখা করে গেলেন : সংসারে আমার ব্যথা একমাত্র তুই-ই বুঝলি, প্যালা। একমাত্র তোকেই আমার সাত হাজার সাতষট্টিটা কবিতা শোনাতে পেরেছি। মাঝে-মাঝে তুইও ঝিমিয়েছিস বটে, কিন্তু কখনও নাক ডাকাসনি। তাই তোকেই দেখা দিয়ে গেলাম।
কিন্তু কেন যে হারাধনের ওই সাত হাজার সাতষট্টিটা কবিতাকে হজম করে গেছি, সে তো আমি জানি! অনুরোধে লোকে একটা ঢেঁকি গিলতে পারে কিন্তু কবি হারাধনের প্রতিটি কবিতাই এক-একটি ঢেঁকি–কেরোসিন কাঠের নয়–রেগুলার শালকাঠের চেঁকি। কতবার শুনতে শুনতে কান বোঁ-বোঁ করে উঠেছে, মাথা ঝিমঝিম করেছে, বুক ধড়ফড় করে হার্ট বন্ধ হবার জো হয়েছে–তবু তাঁর কবিতা শুনেছি আমি। কেন আর? একবার ওঁর কাছ থেকে পঁচিশ টাকা ধার করেছিলাম–পাছে ফস করে সে টাকাটা চেয়ে বসেন–সেই ভয়ে।
আজ শুধু উনি দেশ ছাড়ছেন তাই নয়। মনকে ডেকে বললাম : হে আত্মারাম, এতদিনে তোমারও ভূত ছাড়ল। আরও কিছুদিন তা হলে বেঁচে রইলে। ফস করে হার্ট-ফেল হবার ভয় রইল না।
মুখখানাকে যতদূর সম্ভব করুণ করে, করুণতর স্বরে বললাম : আর ফিরবেন না, হারাধনদা?
ফিরব না মানে? হারাধনদার চোখ দপদপ করে উঠল। আমার বুকভরা আশা ধুক করে নিবিয়ে দিয়ে বললেন, ফিরব–এই বাঙলা দেশেই ফিরব-প্রতিভার লেলিহান আগুন জ্বেলে ফিরব! কবিতার অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে পুড়িয়ে মারব হতচ্ছাড়া সম্পাদক আর বিশ্বাসঘাতক বন্ধুদের। শুধু তুই বেঁচে যাবি, প্যালা। বলতে বলতে হারাধনদার সর্বাঙ্গ ম্যালেরিয়ার রোগীর মতো কাঁপতে লাগল, গলার স্বর সরস্বতী পূজার অ্যামপ্লিফায়ারের মতো গগনভেদী হয়ে উঠল : ফিরব সুর্যের মতো, উল্কার মতো, ধূমকেতুর মতো
বলতে বলতে উড়নতুবড়ির মতো মিলিয়ে যেতে চাইলেন তিনি। কিন্তু তার আগে ফুটপাথে একটা পচা আমে পা দিয়ে ধপাস করে আছাড় খেলেন, তারপর লোকে আহা-আহা করে ওঠার আগেই ট্রামে চড়ে দিগন্তে-মানে, শিয়ালদা স্টেশনের দিকে বিলীন হয়ে গেলেন।
ফিরেছেন মাস-দুই পরে।
প্রলয়ের আগুন হয়ে নয়, সূর্য ধূমকেতু উল্কা–নিদেনপক্ষে একটা তুবড়ি হয়েও নয়। তুবড়ে একটা নেংটি ইঁদুর হয়ে ফিরেছেন হারাধন হাওলাদার সাতদিন কলে আটকে থাকা নেংটি ইঁদুর।
ব্যাপার কী, হারাধনদা?–আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
ব্যাঁপার? ব্যাঁপার সাংঘাতিক হারাধনদা চিঁচিঁ করে বললেন, সঁব খুঁলে বঁলছি। তাঁর আঁগে এঁক কাঁপ চা–আর দুঁটো মাঁপাক্রিন!
-ম্যাপাক্রিন!
–হ্যাঁ হ্যাঁ–ম্যাঁপাক্রিন। আঁর বাঁকাসনি প্যাঁলা। আঁগে নিয়ে আঁয়–তাঁরপরে বঁলছি।
চা আর ম্যাপাক্রিন আনলাম। চায়ে একটা চুমুক দিয়ে কোঁত-কোঁত করে দুটো ম্যাপাক্রিন গিললেন হারাধনদা। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন বুঁদ হয়ে। তারপর শুরু করলেন এক মর্মভেদী করুণ কাহিনী। সে কাহিনী হারাধনদার ভাষাতেই আমি তুলে দিলাম। (শুধু প্রেসের সুবিধের জন্যে অতিরিক্ত চন্দ্রবিন্দুগুলো বাদ দিয়ে দিলাম–তোমরা ইচ্ছেমতো বসিয়ে নিতে পারো।)
