খানিক পরেই কী যেন টেনে তুলল আঁকপাঁক করে। বেশ পেল্লায় জিনিস একটা।
কী ওটা? ন্যাদা ফিসফিস করে বললে।
–বোধহয় মোহরের ঘড়া বলেই উত্তেজিত হয়ে বিরিঞ্চি যেই গলা বাড়িয়ে দেখতে গেছে, অমনি শুকনো পাতায় খচর-মচর আওয়াজ শুনে লোকটা ফিরে তাকাল। দেখতেও পেল ওদের।
এক মুখ দাঁত বের করে হেসে বললে, কী দেখছ খোকারা?
বিরিঞ্চি আর কৌতূহল সামলাতে পারল না; বলল, মাটি থেকে ওটা কী তুললে তুমি? গুপ্তধন নাকি?
লোকটা হি হি করে হেসে বললে, গুপ্তধনই বটে! জব্বর ওল একখানা। দেব একটুখানি কেটে? নিয়ে যাও না–তোফা ডালনা খাবে।
ধুৎ; ডালনার নিকুচি করেছে। গুপ্তধনের বদলে শেষকালে কিনা ওল! ছ্যাঃ–ছ্যা। বিরিঞ্চি বললে, ন্যাদা,–যাই এখান থেকে।
দুজনে হনহন করে এগিয়ে যেতে যেতে শুনল, পেছনে লোকটা খিকখিক করে হাসছে।
আরও খানিকটা হাঁটতেই একটা পুরনো পোড়া বাড়ি।
দরজা-জানলা কোথাও কিছু নেই। ভেতরে জন-মানুষ আছে বলে মনে হয় না। ওই গুপ্তধন কথাটা তখন বিরিঞ্চিকে পেয়ে বসেছে। এই বাড়িটা দেখে কেমন সন্দেহ হল তার। হঠাৎ মনে হল–এমনি পোড়ো বাড়িতে তো গুপ্তধন লুকোনো থাকে! কে জানে হয়তো এই বাড়িতেই আছে?
বিরিঞ্চি দাঁড়িয়ে পড়ল।
ন্যাদা!
–কী রে?
–এই বাড়িতে গুপ্তধন আছে!
শুনে ন্যাদার রোমাঞ্চ হল; বললে, সত্যি? কী করে জানলি?
আমার মনে হল। বাড়িটার কেমন রহস্যময় চেহারা দেখেছিস? পাড়াগাঁয়ের এসব বাড়িতেই মোহরের ঘড়া লুকোনো থাকে। যাবি খুঁজতে?
ন্যাদার কান কুটকুট করতে লাগল। রোমাঞ্চ হলেই তার কান চুলকোয়।
-মন্দ কী? চল না। বেশ অ্যাডভেঞ্চার হবে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দু’জনে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
অনেককালের পুরনো বাড়ি। ঠাণ্ডা সব শ্যাওলা-পড়া ঘর। ইট-বেরুনো দেওয়ালগুলো আবছা অন্ধকারে যেন হা-হা করে হাসছে।
ন্যাদার ভারি ভয় করতে লাগল।
–চল ভাই, এখানে আর নয়। এসব পোড়া বাড়িতে ভূত থাকে।
–ভূত! বিরিঞ্চি ভ্রূকুটি করে বললে, এ-যুগের ছেলে হয়ে তুই ভূতে বিশ্বাস করিস?
ন্যাদা বললে, ইয়ে–ভূত ঠিক নয়, তবে সাপ-টাপ
বিরিঞ্চি বললে, সাপ-টাপ দু-একটা না থাকলে আর অ্যাডভেঞ্চার কিসের রে? আরে, দেখিই না এ-ঘর ও-ঘর একটু খুঁজে। মনে কর ফস করে একটা সুড়ঙ্গ পেয়ে গেলাম।
বলতে বলতেই ন্যাদা হঠাৎ বিরিঞ্চির কাঁধে জোর থাবড়া দিলে একটা। বিরিঞ্চি আঁতকে উঠল।
–ওখানে ওগুলো কী রে?
–কোথায়?
–ওই ছাদের গায়ে! পাঁচ-সাতটা থলে ঝুলছে না?
–আঁ–তাই তো! থলেই তো! আবছা অন্ধকারেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
বিরিঞ্চি কাঁপতে কাঁপতে বললে, ন্যাদা রে–পেয়ে গেলাম।
কী পেয়ে গেলি?
–গুপ্তধন। ওগুলো মোহরের থলে বুঝতে পারছিস না।
ন্যাদার তখন আনন্দে গলা ধরে এসেছে। কথা বলার আগে খানিকক্ষণ বু-বু করে নিলে।
–কিন্তু ভাই, গুপ্তধন তো মাটির তলায় থাকে শুনেছি। ছাদে ঝুলিয়ে রাখে বলে তো কোনও বইয়ে পড়িনি!
–যারা বই লেখে–তারা কি সব খবর জানে? চোখের সামনেই তো দেখছিস, কেউ কেউ গুপ্তধন থলেতে করে ছাদেও ঝুলিয়ে রাখে।
-এখন কী করা যায় বল তো? ন্যাদা কথা কইতে পারছিল না।
বিরিঞ্চি বললে, কী আর করা যায়? আয় এখুনি ওগুলো চটপট পেড়ে ফেলি। গুপ্তধন দেখলে কি আর দেরি করতে আছে? হয়তো কাল আর কারও চোখে পড়ে যাবে ব্যস, গেল!
ন্যাদা বললে, তা ঠিক। কিন্তু ঘরটায় ভাই ভারি বিচ্ছিরি গন্ধ। আর পায়ের নীচে ময়লা কী-সব চটচট করছে।
বিরিঞ্চি বললে, রেখে দে তোর গন্ধ! গুপ্তধন যেখানে থাকে সেখানে ওরকম অনেক ময়লা আর গন্ধও থাকে। ওতে কি ঘাবড়ালে চলে? নে এখন কাজে লেগে যা—
ন্যাদা বললে, আমি?
বিরিঞ্চি বললে, তুই বইকি। একখানা ঘুড়ির জন্যে তুই পাড়ার হেন ছাদ নেই যাতে উঠিসনি। আর গুপ্তধনের জন্যে ইটে পা দিয়ে এই ছাদে উঠতে পারবিনে? এই দরজার এখান দিয়ে উঠে যা–বেশ সোজা হবে।
বলতে বলতে বিরিঞ্চির মাথায় কালো কী খানিকটা পড়ল। ইস–কী যাচ্ছেতাই গন্ধ!
বিরিঞ্চি রুমাল দিয়ে মাথা ঘষতে ঘষতে বললে, নাঃ–আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। এই ন্যাদা, উঠে পড় না। আরে আটটা থলেতে কম করেও হাজারখানেক মোহর তো নির্ঘাত। হীরে-টিরেও থাকতে পারে। আধাআধি ভাগ করে নেব। ওভারনাইট বড়লোক বুঝলি না?
ন্যাদা বললে, নিয়ে যাবি কী করে? লোকে দেখবে যে?
বিরিঞ্চি বিরক্ত হয়ে বললে, কোঁচড়ে করে নিয়ে যাব। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলব–ওল নিয়ে যাচ্ছি। পাড়াগাঁয়ে পথেঘাটে কত ওল থাকে নিজের চোখেই তো দেখলি।
–তা দেখলাম বটে। ন্যাদা মাথা নেড়ে বললে, তবে উঠি।
ওঠ! আমি নীচে কোঁচা পেতে রাখছি। থলে পাড়বি–আর কোঁচার ভেতরে টুপটাপ করে ফেলে দিবি।
–তা হলে জয়গুরু বলেই ন্যাদা দেওয়াল বাইতে শুরু করল। আর কী আশ্চর্য–উঠেও গেল ঠিক।
বিরিঞ্চি কোঁচা পেতে এদিকে রেডি হয়েই আছে। এখুনি বড়লোক হয়ে যাবে। কোঁচার ভেতর পড়বে মোহর-হীরে–উঃ!
–শিগগির দে, ফেলে দে ওপর থেকে! একেবারে দুটো করে।–ওয়ান-টু
থ্রি বলবার আগেই ন্যাদা দুটো থলে ধরে টান দিয়েছিল এক হাতেই। কিন্তু তক্ষুনি হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠল বাপরে! গেছি
কী হল?
আর্তনাদ করে ন্যাদা বললে, থলে আমায় কামড়াচ্ছে।
-আঁ!
–মোক্ষম কামড় মেরেছে। ন্যাদা সমানে হাউহাউ করতে লাগল। ইস–থলের কী দাঁত রে। রক্ত বের করে দিলে! এমন দাঁতাল থলে তো কখনও দেখিনি।
