–আঁ!
বলতেই আবার সেই কালোকালো বিচ্ছিরি জিনিস বিরিঞ্চির একেবারে নাকেমুখে পড়ল। কী গন্ধ রে—ওয়াক–ওয়াক।
বিরিঞ্চির গলায় পিসিমার সব মুড়িঘন্ট আর লুচি-হালুয়া উলটে এল।
আর ন্যাদা চেঁচিয়ে উঠল, থলেরা আমায় কামড়াচ্ছে। আমায় খেয়ে ফেললে! থলে যে কখনও কামড়ায় সে তো জানতাম না!
তাড়াতাড়ি করে দেওয়াল বেয়ে নামতে গিয়ে ন্যাদা একেবারে বিরিঞ্চির ঘাড়ে এসে পড়ল। তারপর দুজনে ময়লা দুর্গন্ধ মেঝেতে গড়াগড়ি।
গুপ্তধনের থলেরা তখন ডানা মেলে উড়তে শুরু করেছে। ওরা উঠে দাঁড়াতেই ওদের নাক-মুখ খিমচে দিয়ে কিচিরমিচির করতে করতে বাইরের বিকেলের ছায়ায় তারা মিলিয়ে গেল।
ওরা যখন পোড়ো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল তখন আর কেউ কারও দিকে তাকাতে পারছে। ময়লায় পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভর্তি। আর গায়ের গন্ধ! যেন গন্ধমাদন পর্বত একজোড়া।
বিরিঞ্চি বাজার মুখে বললে, বুঝেছি। ওগুলো মোহরের থলে নয়।
ন্যাদা বললে,–থলে কখনও কামড়ায় না।
বিরিঞ্চি বললে, বোধহয় বাদুড়।
ন্যাদা মাথা নেড়ে বললে, আমারও তাই মনে হচ্ছে! বইয়ে পড়েছিলাম, অন্ধকার জায়গাতে বাদুড় ঝুলে থাকে।
গায়ের খোশবু ছড়িয়ে দুজনে কিছুক্ষণ চুপচাপ হেঁটে চলল। গিয়েই সাবান মেখে চান করতে হবে। তাতেও গন্ধ ছাড়লে হয় গা থেকে!
বিরিঞ্চি খানিক পরে বললে, পাড়াগাঁ একদম বাজে জায়গা না রে?
ন্যাদা বললে, ঠিক তাই। চল না কাল চলে যাই কলকাতায়। আমার হাতে কী জোর কামড়ে দিয়েছে রে! রক্ত পড়ছে–উফ!
আমার নাকও আঁচড়ে দিয়েছে–ভীষণ জ্বালা করছে! বাবার ওষুধের বাকসোটা এবারে সত্যিই কাজে লাগবে–
বিরিঞ্চির বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
দাদা হওয়ার দাম
যদি কোনও অচেনা পাড়ায়, কেউ হঠাৎ এসে, তোমার সামনে হাতটাত কচলে দাদা-টাদা বলে খুব ভক্তি করতে থাকে আর তোমাকে দুটো সিঙাড়া আর একটা ডাবের জল খাওয়াতে চায়, তা হলে তুমি কী করবে? কিছুই করবে না, শুধু প্রাণপণে ছুট লাগাবে সেখান থেকে। যত জোরে পারো।
কারণ, দাদা হওয়ার দাম অনেক। অন্তত বারো টাকা।
সেদিন একটা কাজে বেরিয়ে কাজটাজ সেরে, বাসস্টপে এসে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় হঠাৎ–আরে দাদা যে!
চেয়ে দেখি, এক ভদ্রলোক! বয়সে আমার চেয়ে বড়ই হবেন, মাথায় আমার চাইতেও বড় টাক, মুখে সরু গোঁফ। ছিটের হাফ শার্ট আমার দিকে তাকিয়ে খুব মিঠে হাসছেন।
দাদা হঠাৎ এ-পাড়ায়?
আশ্চর্য হয়ে বললাম, একটু কাজে এসেছিলাম। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
আমাকে চেনবার কী আছে? আমি অত্যন্ত সামান্য লোক–চুনোপুঁটি। দাদাকে কে না চেনে? বাপরে কত বড় লোক।-বলেই ঢিপ করে আমাকে প্রণাম। আমি, করেন কী, করেন কী-বলেও সামলাতে পারলাম না।
আপনাকে দেখলাম, পেন্নাম করলাম, আহা-দিনটা আমার সার্থক হয়ে গেল। দাদা, আপনারাই তো দেশের গৌরব, আমাদের মাথার মণি।
সত্যি কথা বলতে কী, কেমন ভ্যাবাচ্যাকা লেগে গেল। তোমাদের জন্যে দুটো একটা গল্প আমি লিখে থাকি বটে, কিন্তু আমি যে এমন একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার, এত বড় দিকপাল, এ-খবরটা তো আগে জানা ছিল না। বরং পত্রিকার সম্পাদকেরা প্রায়ই নাক-টাক কুঁচকে আমাকে বলেন, কী যে আজেবাজে গপ্পো লেখেন মশাই, কোনও মানে হয় না। তাই একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, বোধহয় ভুল করছেন। আর কাউকে ভেবে
ভুল করব? আপনাকে? হেঁঃ, কী যে বলেন। লম্বা নাক, ওই খাড়া খাড়া কান, ওই একটা কালচে দাঁত, চাঁদি আর কপাল জুড়ে এই টাক, ভুল করব? এরকম মার্কামারা চেহারা দুজনের আছে নাকি দুনিয়ায়?
ভক্তি করেই বলছেন লোকটি, কিন্তু খাড়া কান, কালচে দাঁত, মাথায় টাক নিজের সম্বন্ধে এসব বর্ণনা শুনতে ভালো লাগল না, কারই বা লাগে? আমি তাড়াতাড়ি বললাম, আচ্ছা–আচ্ছা, ঠিক আছে, বড় খুশি হলাম। কিন্তু ওই যে আমার বাস আসছে, আমি যাই।
সে কী কথা!–ভদ্রলোক খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন–বাস অনেক আসবে, অনেক যাবে। কিন্তু আপনি তো আর বার বার আসবেন না আমাদের পাড়ায়। আর এলেও কোন্ ফাঁকে সুট করে চলে যাবেন, টেরও পাব না। আসুন–আসুন, একটু বসবেন আমাদের ক্লাবঘরে বাচ্চাদের একটু দর্শন দেবেন।
বাচ্চাদের দর্শন দেব–আমি কে? আমি কি তারাশঙ্কর বাঁড়ুজ্জে, প্রেমেন মিত্তির, না শিবরাম চক্রবর্তী? না মৌমাছি, না স্বপনবুড়ো? আমার লেখা বাচ্চারা কখনও পড়ে কি না, তাতেই সন্দেহ আছে। তবু মনে মনে লোভ হল। হঠাৎ খামকা এরকম একটা খাতির পেয়ে গেলে আর কার খারাপ লাগে, তাই বল?
কিন্তু আমার খেয়াল ছিল না, লোভে পাপ এবং পাপে—
পাপে নিদেনপক্ষে বারো টাকা খেসারত।
ছুটির দিন, খুব একটা তাড়া ছিল না বলে চলে গেলাম লোকটির সঙ্গে। কাছেই কাঁচা ড্রেনের পাশে টালির চাল-দেওয়া একটা ঘর, বাইরে তোবড়ানো সাইনবোর্ডে লেখা : তরুণ সভা।
দাদা, ভেতরে পা দিন। আহা, আজ আমাদের ক্লাব ধন্য হল।
ঢুকে গেলাম তরুণ সভায়। কোথায় বাচ্চা? ঘরের ভেতরে আট-দশটি তরুণ মুখে বেশ দাড়ি-গোঁফ গজিয়েছে মাদুর পেতে বসে জন-চারেক তাস খেলছিল, কজন আড্ডা দিচ্ছিল, দুজন আবার সিগারেটও খাচ্ছিল। দুটো কাঁচ-ভাঙা আলমারি রয়েছে তাতে কয়েকটা থিয়েটারের নাটকও দেখতে পেলাম।
ভদ্রলোক ধমক দিলেন, কাকে ধরে এনেছি–দেখছিস না তোরা? এর মতো মানী লোকের সামনে সিগারেট খাচ্ছিস? ফেলে দে–ফেলে দে। বন্ধ কর তাস শিগগির।
