বিরিঞ্চি বলে, আয়, এই প্ল্যাটফর্মে কিছুক্ষণ হাওয়া খেয়ে নিই, তারপর ভাবা যাবে ওসব।
ন্যাদা বললে, বেজায় খিদে পেয়েছে যে! হাওয়ায় পেট ভরবে না।
বলতে বলতেই পিসেমশাই এসে হাজির। পায়ে চটি, গায়ে গেঞ্জি, কাঁধে গামছা। হাঁপাচ্ছেন।
বিরিঞ্চি দেখেই চিনল। তাদের কলকাতার বাড়িতে সে আগেও দু-তিনবার পিসেমশাইকে দেখেছে। ধাঁ করে তখুনি তাঁকে একটা প্রণাম ঠুকে ফেলল, সঙ্গে সঙ্গে ন্যাদাও।
পিসেমশাই বললেন, আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। রাস্তায় ভালো মাছ দেখলাম, তাতেই–আরে–আরে–পিসেমশাইয়ের হাতের ন্যাকড়ার পুঁটলিতে কী যেন দাপাদাপি করছিল। হঠাৎ তা থেকে কালো লম্বা-মতন একটা জিনিস ছিটকে পড়ল ন্যাদার পায়ের কাছে। ন্যাদা সঙ্গে সঙ্গে তিন হাত এক হাইজাম্প মারল : সাপ-সাপ!
সঙ্গে সঙ্গে বিরিঞ্চি একটা আছাড় খেতে খেতে সামলে গেল : আঁঃ-সাপ! কোথায় সাপ? কী সাপ?
কাঁচা-পাকা গোঁফের তলায় পিসেমশাইয়ের হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল : সাপ নয়–মাগুর মাছ। বলেই পিসেমশাই উবু হয়ে সেই কালো লম্বা জিনিসটাকে কপাৎ করে পাকড়াও করলেন; তারপর বললেন, তোমাদের জন্য এগুলো কিনতেই তো দেরি হয়ে গেল। নাও–এবার বাড়ি চলো
বাড়ি কাছেই। কাঁচা রাস্তা দিয়ে মিনিট-দশেক হেঁটে, একটা আমবাগান পেরুতেই।
পিসিমা দোরগোড়াতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভারি খুশি হয়ে বললেন, আয়–আয়! এতদিন পরে বুঝি গরিব পিসিকে মনে পড়ল? আর এটি বুঝি তোর বন্ধু। কী নাম–ন্যাদা। বাঃ, বেশ নাম। তা এসো বাবা–ভেতরে এসো।
তারপর চিড়ে মুড়ি নারকোলের নাড়ুর এলাহি কাণ্ড।
খেতে খেতে বিরিঞ্চি বললে, বেশ লাগছে–না রে?
ন্যাদা চোখ বুজে নারকোলের নাড়ু চিবুতে চিবুতে বললে, লা গ্র্যান্ডি।
দুপুরেও সেই ব্যাপার। মাগুর মাছের কালিয়া, পোনা মাছের ঝাল, মুড়িঘন্ট, বাটি-চচ্চড়ি, পোস্তর বড়া, সোনামুগের ডাল। বাটির পর বাটি। ন্যাদা বললে, আমার আর পাড়াগাঁ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না রে! মনে হচ্ছে এখানেই থেকে যাই চিরকালের মতো!
বিরিঞ্চি সুরুৎ করে মুড়িঘন্টের একটা কাঁটা চুষে নিয়ে আবেগভরা গলায় বললে, যা বলেছিস!
ন্যাদা হাত চাটতে-চাটতে জিজ্ঞেস করলে, পাড়াগাঁয়ে এমন সব পিসিমা থাকতে লোকে পুঁইডাটা আর কুচো চিংড়ি খাবার জন্যে কলকাতায় কেন থাকে র্যা?
মাগুর মাছের কালিয়াটাকে প্রবল বেগে আক্রমণ করতে করতে বিরিঞ্চি বললে, গোমুখ্যু বলে।
খাওয়ার পর দু’জনে একেবারে অজগর। মানে, হরিণ-টরিণ গিলে অজগরের যে দশা হয় তাই আর কি! নড়াচড়াই মুশকিল।
পিসিমা দোতলার বারান্দায় শীতলপাটি বিছিয়ে দিলেন। বললেন, এখানে একটু গড়িয়ে নাও। ঘরে গরম লাগবে–দিব্যি হাওয়া আছে এখানটায়।
দিব্যি হাওয়াই বটে! শরীর জুড়িয়ে গেল। তায় আবার ঝিরঝির করে গাছের পাতা কাঁপছে, তাতে পাখি বসে আছে।
ন্যাদা বললে, ওটা কী গাছ রে?
বিরিঞ্চি ভেবে-চিন্তে বললে, পাড়াগাঁয়ে সব ভালো ভালো গাছ থাকে। খুব সম্ভব ওটা তমাল গাছ। কিংশুকও হতে পারে।
ন্যাদা আরও খানিক ভেবে বললে, কুরুবকও হতে পারে। আচ্ছা–শাল্মলি নয় তো?
–নাঃ, বোধহয় শাল্মলি নয়। তা হলে তো ফুলের মালা দিয়েই কাটা যেত। কেন–পণ্ডিতমশাই সেই যে পড়ায়নি?
ফুলদল দিয়া, কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলি তরুবরে? শাল্মলি নিশ্চয়ই খুব রোগা আর ছোট গাছ হবে।
ন্যাদা বললে, ঠিক। তাহলে ওটা তমাল কিংবা কুরুবক। কিংশুকটা শুনতে আরও ভালো। আচ্ছা, ওতে একটা পাখি বসে আছে, দেখেছিস? ওটা কী পাখি বল দিকি?
বিরিঞ্চি বললে, পাখিটা দেখতে কিন্তু বেশ। দোয়েল-শ্যামা-পাপিয়া কিছু একটা হবে। নীলকণ্ঠও হতে পারে।
ন্যাদা বললে, নীলকণ্ঠ নামটা বেশ জুতসই। বাঃ কী সুন্দর। আমার ভাই কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে। ওই যে কিংশুক বৃক্ষের শাখায় বসিয়া আছে নীলকণ্ঠ বিহঙ্গ
আমি মিলিয়ে দিচ্ছি, দাঁড়া-বিরিঞ্চি বললে, তাই দেখে মোর মনে নাচিতেছে পুলক-তরঙ্গ।
হঠাৎ পিসেমশায়ের হাসিতে ওরা চমকে উঠল। হুঁকো হাতে কখন তিনি এসে হাজির।
–কিংশুক বটে? পিসেমশাই হুঁকোয় টান দিয়ে বললেন, ওই গাছের নাম হচ্ছে ঘোড়ানিম। আর ও পাখিটা নীলকণ্ঠ নয়–ওর নাম হাঁড়িচাঁচা, ব্যাঙ আর কেঁচো ধরে খায়
দুত্তোর! এমন কবিতাটা মাঠে মারা গেল! ভারি ব্যাজার হল ন্যাদা। বিরিঞ্চিরও মন খারাপ হয়ে গেল।
খানিকক্ষণ কুড়ক কুড়ক করে হুঁকো টেনে পিসেমশাই এলোমেলো গল্প জুড়ে দিলেন। ধান চালের দর, গাঁয়ের গোমড়ক, কলকাতায় খাঁটি দুধ পাওয়া যায় কি না, রাইটার্স বিলডিঙের নতুন বাড়িটা কী প্রকাণ্ড–এই সব। কিন্তু ওদের তখন বিরক্তি ধরে গেছে। দুজনে হুঁ হুঁ করতে করতে কোন ফাঁকে টুপ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
বিকেলে লুচি হালুয়া আর চা খেয়ে দুজনে বেড়াতে বেরুল।
পাড়াগাঁয়ের রাস্তা। মাঝে মাঝে দু-একখানা বাড়ি। তা ছাড়া গাছগাছড়া, পুকুর, ঝোপজঙ্গল। বেশ লাগছিল।
হঠাৎ দেখা গেল জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় একটা লোক কী যেন খুঁড়ছে কোদাল দিয়ে। একেবারে নিবিষ্ট মনে।
বিরিঞ্চি ফিসফিস করে ন্যাদাকে বললে, গুপ্তধন খুঁজছে নাকি রে?
ন্যাদা বললে, অসম্ভব কী! পাড়াগাঁয়েই তো এখানে-ওখানে ঘড়া-ঘড়া মোহর লুকোনো থাকে শুনেছি।
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দুজনে দেখতে লাগল। হিঁসসো হিঁসসো করে লোকটা সমানে মাটি কাটছে। টপটপিয়ে ঘাম পড়ছে গা দিয়ে।
