বিলের এখানে-ওখানে ছোটো-বড়ো চর, কর্দমাক্ত মাটি আর শণের জঙ্গল সেখানে মাথা তুলে রয়েছে। দিনের বেলা ঘুরে বেড়ায় কাদাখোঁচা আর গাংশালিক। সেইসব চরের পাশ দিয়ে ছোটো-বড়ো নালার মতো রন্ধ্রপথে জল বেরিয়ে গেছে। পথ সংক্ষেপ করবার জন্যে লগির খোঁচা দিয়ে বসির নৌকাটাকে তারই একটা নালার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে।
ঘ্যাস করে আটকে গেল ডিঙি। তলায় কী-একটা বাধা দিয়েছে। জ্যোৎস্নায় দেখা গেল একটা মাছ ধরবার খাঁচা, এদেশি ভাষায় ডারকিনা। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শোনা গেল ডারকিনার ভেতরে প্রচন্ড একটা ছপছপ আওয়াজ, নিশ্চয় কোনো বড়ো মাছ আটকে পড়েছে। বিলের বড়ো বড়ো বোয়াল আর কালবোস এসময়ে প্রায়ই ধরা পরে ডারকিনায়। বসির বললে, মস্ত মাছ আছে।
পাইকার জিজ্ঞেস করলে, তুলে নেবে না কি?
এক মুহূর্ত চিন্তা করলে বসির। পরের জিনিস তুলে নেওয়ার অর্থই চুরি করা। কিন্তু কী হবে চুরি করলে? যারা তার মুখের ভাত থেকে ঘরের ইজ্জত পর্যন্ত চুরি করতে চায়, তাদের জন্যে কী অত ভালো-মন্দের বিচার করা? রক্ত আবার গরম হয়ে উঠল।
তুমি নৌকাটা একটু হটিয়ে নাও পাইকার। আমি তুলে আনি মাছটাকে।
পাইকারের চোখ চকচক করে উঠল। অবগুণ্ঠিতা রোসেনা চুপ করে বসে আছে, তার মুখ দেখা যায় না। সুডোল হাতের ওপর কাচের চুড়িগুলোতে জ্যোৎস্না জ্বলছে। পাইকারের চিন্তায় যেন ঝোড়ো হাওয়ার তান্ডব চলছিল।
বসির ঝুপ করে নেমে পড়ল জলে। আর সেই মুহূর্তেই লগির একটা খোঁচ দিয়ে পাইকার নৌকাটাকে নালা ছাড়িয়ে প্রায় বিলের মুখে সরিয়ে নিয়ে এল।
হঠাৎ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল বসির। মাছ নয় পাইকার, মস্তবড় সাপ। আমাকে কামড়ে দিয়েছে। সব জ্বলে গেল পাইকার, নিশ্চয় আলাদ গোখুর।
নিরুত্তরে পাইকার নৌকাটাকে আরও দূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
বসির চিৎকার করতে লাগল, পাইকার, শরীর জ্বলে গেল পাইকার, তুলে নাও আমাকে। আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না পাইকার।
রোসেনা কেঁদে উঠল, পাইকার, পাইকার।
নৌকাটা তখন বিলের অথই জলের মধ্যে এসে পড়েছে। দামঘাসের আগাগুলো মাথা তুলে আছে, হাওয়ায় দুলছে গোখরো সাপের কিলবিলে একরাশ ছানার মতো। বিলের জল ঝলমল করছে—যেন বাঘের চোখ। পাইকার শান্তস্বরে বললে, কেঁদে আর কী করবে বিবিজান, মানুষ তো আর চিরকাল বাঁচে না।
থলে রহস্য
পটলডাঙার বিরিঞ্চি কখনও পাড়াগাঁ দেখেনি। তার বন্ধু নীরদ ওরফে ন্যাদারও সেই দশা। তাই ক্লাসের হারু যখন গ্রাম থেকে ঘুরে এসে বললে,–পাড়াগাঁ কী সুন্দর, তার মাঠে মাঠে ধান, গাছে গাছে ফল-ফুল, আকাশে কেবল কোকিল আর হংসবলাকা–তখন বিরিঞ্চির মন ভারি খারাপ হল। এত খারাপ হল যে নাকের ডগা সুড়সুড় করতে লাগল; আর টিফিন পিরিয়ডে বসে বসে একাই দু-আনার চীনেবাদাম খেয়ে ফেললে, কাউকে একটুও ভাগ দিলে না।
বিরিঞ্চির এক পিসিমা থাকেন হুগলির এক পাড়াগাঁয়ে। কলকাতা থেকে তিন ঘন্টা লাগে সেখানে যেতে। কিন্তু বিরিঞ্চির বাবা কখনও সেখানে যাননি কাউকে যেতেও দেননি। তাঁর ধারণা, হাওড়া স্টেশনের চৌহদ্দি পেরুলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মাছিমশা আর বীজাণু এসে আক্রমণ করবে, তারপর কালাজ্বর, ডেঙ্গুজ্বর, ম্যালেরিয়া, প্লেগ, বাত, টাকপড়া-সব একসঙ্গে চেপে ধরবে।
–পাড়াগাঁ! উরে ব্বাস! সাক্ষাৎ যমপুরী! বলেই বিরিঞ্চির বাবা টপাৎ করে একটা প্যালড্রিন খেয়ে ফেলেন–পাড়াগাঁয়ে যাওয়ার আগেই।
কিন্তু এ-যাত্ৰা বিরিঞ্চিকে তিনি আর ঠেকাতে পারলেন না। বিরিঞ্চি আসছে বারে স্কুল-ফাইন্যাল দেবে, সে বিদ্রোহ করে বসল : পিসিমার বাড়ি আমায় যেতে দেবে না?
বিরিঞ্চির বাবা বললেন, উফ, অসম্ভব!
–দেবে না তো? ঠিক আছে। তাহলে রাস্তায় বেরিয়ে আমি তেলেভাজা খাব।
–আঁ! শুনে বিরিঞ্চির বাবা বিষম খেলেন : ওতে যে কলেরা হবে।
তারপর পথের ধার থেকে ফিরিওলার শরবত
বিরিঞ্চির বাবা আর্তনাদ করে বললেন, ডবল নিমোনিয়া।
–আইসক্রিমও কিনে খেতে পারি
বিরিঞ্চির বাবার প্রায় ফিট হওয়ার উপক্রম। ধরা গলায় বললেন, যক্ষ্মা!
–তাহলে পিসিমার বাড়ি যেতে দাও!
বিরিঞ্চির বাবা প্রায় অথই জলে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, এমন সময় বিরিঞ্চির মা এসে হাজির। তিনি স্বামীকে একটা ধমক দিয়ে বললেন, তোমার না হয় মাথা খারাপ হয়েছে, তাই বলে ছেলেটাকেও পাগল করবে নাকি? যা বীরু, তোর তো এখন ছুটি আছে–দিনকয়েক ঘুরেই আয় পিসির বাড়ি থেকে। ঠাকুরঝি কত খুশি হবে। এই বলে সব মিটিয়ে দিয়ে বিরিঞ্চির মা ঝিকে বকতে গেলেন। ঝি দুটো কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলেছিল।
বিরিঞ্চির বাবার ভুঁড়ি কাঁপিয়ে সাইক্লোনের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরুল। চিঁ-চিঁ করে বললেন, তবে ঘুরে আয়। কিন্তু যাওয়ার সময় একবাক্স ওষুধ দিয়ে দেব-ক্লোরোডাইন, প্যালুড্রিন, চ্যবনপ্রাশ, সিনা থার্টি, বেলেডোনা টু হানড্রেড আর ভাস্কর লবণ। সব চার্ট করে দেব–দরকার পড়লেই খেয়ে নিবি। হ্যাঁ—হ্যাঁ–সেই সঙ্গে বেনজিন আর তুলোও দিতে হবে।
বিরিঞ্চি বলতে যাচ্ছিল, মেডিক্যাল কলেজটাও সঙ্গে দিয়ে দিয়ো– আর কোনও ভাবনা থাকবে না। কিন্তু বাবাকে কি আর সে কথা বলা যায়? আপাতত পার্মিশন পাওয়ার আনন্দে সে লাফাতে লাফাতে তার বন্ধু ন্যাদাকে খবর দিতে ছুটল।
.
ট্রেন থেকে নেমে দেখা গেল, পিসেমশাই আসেননি। এই রে–এখন কোন্ দিকে যাওয়া যায়?
