কী জরুরি ব্যাপার? ভিটেয় লাঙল দিয়ে সরষে বুনবার মতলব আছে? পিরু মিয়া বিস্ফারিত চোখে বললে, দরকার হলে তা তো করতেই হবে। কিন্তু না শুনেই যে ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাচ্ছিস, হয়েছে কী তোর? ভয় নেই, খুব সুখবর! হুজুর মেহেরবানি করেছেন তাকে।
আমাকে?
হ্যাঁ তোকেই। গলার স্বর নামিয়ে আনল পিরু মিয়া, তীক্ষ্ণদৃষ্টিটা এক বার চালিয়ে দিলে হোগলার বেড়ার ফাঁকে, রোসেনাকে চকিতের জন্যে চোখে পড়ে কি না। তারপর এক নিশ্বাসে বলে গেল, তোর বিবি তো খুব খুবসুরত। খেতে-পরতে দিতে পারিসনে, ছেড়ে দে ওটাকে। হুজুরের নজর পড়েছে, তিনি বলেছেন…
শা–লা! বসিরের গলা বিদীর্ণ করে বেরিয়ে এল একটা অমানুষিক চিৎকার।
চমকে তিন-পা সরে গেল পিরু মিয়া। এঃ, মেজাজ দ্যাখো-না। ইজ্জতে ঘা লেগেছে নাকি সাহেবের? অমন কত গন্ডা… কানের ওপর দিয়ে সাঁ করে বিদ্যুতের মতো একটা দা বেরিয়ে গেল, একটু হলেই সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যেত পিরুর মাথাটাকেও। আতঙ্কে আর্তনাদ করে পিরু মিয়া পাশের বাড়ির দাওয়ায় গিয়ে উঠে দাঁড়াল। মুহূর্তে সমস্ত ধাওয়া পাড়াটা এসে জড়ো হয়ে গেল বসিরের ঘরের সামনে। ভয়ালমূর্তিতে দাঁড়িয়ে গর্জন করছে সে। তার চোখ দুটোর দৃষ্টি উন্মাদের মতে, তার কালো শীর্ণ দেহটা জিঘাংসার প্রতিরূপ যেন। শয়তান, হারামির বাচ্ছা…
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে রাত নেমে এল। প্রগাঢ় শান্তির মধ্যে সমস্ত ধাওয়া পাড়াটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল নিবিড়তম সুপ্তির স্নেহচ্ছায়ায়। সারাদিন পরিশ্রম, বেঁচে থাকার দুঃসাধ্য সাধনা, তার ভেতরে যা-কিছু সান্ত্বনা এইটুকুই। ভোরের রঙে আকাশ ফিকে হয়ে উঠবার আগেই খানিকটা নুন-পানতা গিলে বেরিয়ে পড়তে হবে জীবিকার সন্ধানে।
বিলের দিক থেকে হু-হু করে আসছে রাত্রির বাতাস। সেই বাতাসে ভেসে-আসা মরা ঘোড়াটার গন্ধ। লালু চৌকিদারের তরমুজ খেতে মনসা কাঁটাগুলো খরখর করে শব্দ করছে। বিলের তলায় দামঘাসের স্নেহালিঙ্গন থেকে এই রাতে লালু চৌকিদার মাঝে মাঝে উঠে আসে কি? ঠিক ঘরের পেছনেই কি তার ডাক শোনা যায়–ঘুমের মানুষ, হো ঘুমের মানুষ, জা–গো…
বিলের ওপারে উঠল কৃষ্ণা পঞ্চমীর চাঁদ। কুঞ্চিত কালো জলে কলমির ফুলগুলো হাওয়ায় দুলছে। মাথার ওপরে বুনোহাঁসের পাখা জ্যোৎস্নার রং মেখে ভেসে চলে গেল।
বসির, রোসেনা আর পাইকার এসে দাঁড়াল বিলের ঘাটে। সঙ্গে করে নেওয়ার মতো বিশেষ কিছু নেই। একটা ছিন্ন মলিন বিছানা, একটা বদনা, দুটো কলসি, একটা কড়াই আর এক ছড়া জাল। পাইকারের কথাই সত্যি। সন্ধ্যার ব্যাপারের পরে এ-গ্রামে থাকবার আর অধিকার নেই ওদের। হালিম সাহুর ঊনবিংশ শতকীয় রাজ্যে এ অপরাধ চূড়ান্ত। হয়তো জেল খাটতে হবে, হয়তো সর্বগ্রাসী দাবানলের সহস্র শিখার মাঝখানে শুকনো তৃণখন্ড…
রোসেনা কাঁদছিল। কিন্তু বসির একটা কথাও বললে না, একটি দীর্ঘশ্বাসও নেমে এল না তার। মোছলমানের বাচ্ছা। শিরায় শিরায় হিংস্র রক্ত তখনও ফেনিয়ে উঠছিল। একটুর জন্য ফসকে গেল হাঁসুয়াটা। পিরু মিয়ার মাথাটাকে নামিয়ে দিতে পারলে কিছুমাত্র ক্ষোভ থাকত না আর।
এক বার পিছন ফিরে তাকাল বসির। দুই পুরুষ আগে চলন বিলের পাড় থেকে জমিদারের অত্যাচারে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল এখানে। আজ আবার তারই পুনরাভিনয় চলছে। সমাজ ওদের আশ্রয় দেয় না, ধর্মের ছত্রছায়া ওদের জন্যে নয়। ঢেউয়ের মুখে মুখে দ্বীপহীন কুলহীন ওরা জীবনের অতল সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়, চারদিক থেকে হিংস্র জন্তুর করাল মুখ জেগে ওঠে ওদের গ্রাস করবার জন্যে। মহামানবের মহাসাগরে ওরা ক্ষণবুদবুদ।
ধাওয়া পাড়া ঘুমিয়ে আছে শান্তিতে। শান্তি নয়, নেশার আচ্ছন্নতা। এ স্বপ্ন কতক্ষণ থাকবে? আজ যে-দুর্ভাগ্যের দন্ড ওদের মাথার ওপরে নেমে এসেছিল, কাল আবার সেটা কাকে অনুগ্রহ করবে কে জানে। হয়তো ঘুমের ঘোরে ওরা স্বপ্ন দেখছে যুদ্ধ গেছে থেমে, খেতে দুলছে সোনার শিষ, মাছের ভারে জাল ছিঁড়ে পড়বার উপক্রম করছে, রোসেনার গায়ে উঠেছে রুপোর গয়না, পরনে রঙিন ডুবেশাড়ি। হাঁড়িতে জিইয়ে রাখা কই মাছগুলো হয়তো এমনি করেই সমুদ্রের স্বপ্ন দেখে।
বসির ঠেলে নৌকাটাকে বেশি জলে নামিয়ে নিলে, তারপর কালো জল ঠেলে এগিয়ে চলল ডিঙি। ছল-ছল-ছলাৎ। দাঁড়ের মুখে সাদা সাদা ফেনার ফুল জ্যোৎস্নায় জ্বলে উঠছে। দূরে মিলিয়ে এল হাসানপুরের বন্দর, ধাওয়া পাড়া আর লালু চৌকিদারের কাঁটাওয়ালা ফণীমনসার খেত। এখানে-ওখানে বিনেদের ভেসাল মাথা উঁচু করে রয়েছে, দূর থেকে মনে হয় চাঁদের আলোয় লম্বা লম্বা ঠ্যাং ডুবিয়ে অতিকায় কতগুলো বক দাঁড়িয়ে আছে যেন। এই বিন—এরাই ওদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। বসির নিরুদ্ধ আক্রোশে দাঁতে দাঁত নিষ্পেষণ করলে এক বার।
রোসেনা চুপ করে বসে আছে কাপড়ের একটা ছোটো পুঁটলির মতো। সেদিকে এক বার অপাঙ্গে তাকিয়ে নিয়ে পাইকার বললে, মন খুব খারাপ করছে, না বসির ভাই?
মন খারাপ? নাঃ। দাঁড় টানতে টানতে চাপা স্বরে জবাব দিলে বসির, কার জন্যে খারাপ করবে মন, কীসের জন্যে? মাটিতে যাদের শিকড় নেই, হাওয়ায় উড়ে-যাওয়া শিমুল তুলোর মতো যাদের জীবন, কীসের মোহ তাদের? চলন বিল, হাসানপুর, সেখান থেকে লাহিড়িবাবুদের জমিদারি; কিন্তু সেখানেও আসবে দমকা হাওয়া, আবার এমনি করেই…
