পাইকার বললে, আমার কথা শোনো। লাহিড়িবাবুদের জমিদারিতে চলে যাও। ওখানেও এমনি বিল। বড়ো বিল, কৃষ্ণকালীর বিল। ওই বিন শালারা ওদেশে গিয়ে হানা দেয়নি এখনও। তা ছাড়া বাবুরাও লোক ভালো, কোনোরকম জোরজুলুম…
দীর্ঘ প্রসারিত দৃষ্টিতে বসির তাকিয়ে রইল পাইকারের মুখের দিকে। এমন প্রস্তাব আরও অনেক বার করেছে পাইকার। কিন্তু বিশ্বাস হয় না লোকটাকে। ভুলিয়ে নিয়ে কোন আঘাটায় ভিড়িয়ে দেবে কে জানে। হয়তো নাম লিখিয়ে দেবে পল্টনের দলে। লোকে বলে পাইকারের অসাধ্য কাজ নেই।
ওসব বলে লাভ নেই পাইকার। ভিটে ছেড়ে আমি নড়ব না কোথাও। না খেয়ে মরলেও নয়।
পাইকারের চোখে দেখা দিল নীরব অনুকম্পা, মুখের ওপর ফুটল সূক্ষ একটা হাসির রেখা। বেশ, তাই থাকো। কিন্তু আল্লাকে দোষ দিয়ো না।
পরদিন সকালে পাইকারই বসিরকে টেনে নিয়ে গেল মৌলানাসাহেবের দরবারে। তিন তিন বার হজ করে এসেছেন তিনি, সাতটা জেলা ঘুরেও এত বড়ো আলেম তোক আর পাওয়া যাবে না। হালিম শাহুর বাড়ির সামনেই বসেছে দরবার। কাঠের একখানা ছোটো জলচৌকিতে আসন নিয়েছে মৌলানাসাহেব। টকটকে ফর্সা রং, গোল মুখখানা থেকে রক্ত যেন ফেটে বেরিয়ে পড়ছে। সমবেত জনতার দিকে মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ আর রূঢ় দৃষ্টিক্ষেপণ করে একনিষ্ঠভাবে মালা জপ করে চলেছেন তিনি। তাঁর পাশেই বসেছে হালিম শাহু ধাওয়া পাড়ার অধীশ্বর, এখানকার জমিদার। মৌলানাসাহেবের সহচর্যে নিজেকে যতটা সম্ভব ধর্মপ্রাণ আর সৌম্যদর্শন করবার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু তার আরক্ত চোখ আর জড়ানো কথার ভঙ্গি থেকে অনায়াসে বোঝা যায় যে, এই সাতসকালেই অন্তত একটি বোতল সে পান করে এসেছে।
হালিম শাহুই অভ্যর্থনা জানায় তার স্বভাবসিদ্ধ মধুর ভাষায়।
কী রে ব্যাটা, তুই কী মনে করে?
তীক্ষ্ণআর রুক্ষদৃষ্টি রুক্ষতর করে মৌলানাসাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, কে এ?
ধাওয়া। বসির ধাওয়া। বিলে মাছ ধরে।
ধাওয়া? ঘৃণায় মৌলানাসাহেবের ফর্সা টুকটুকে মুখখানা বেগুনি হয়ে গেল। মোছলমানের ব্যাটা হয়ে জেলের কাজ করিস? মরে যে তুই দোজখে যাবি।
বসির মাথানত করে রইল। লজ্জায় এবং আতঙ্কে মৌলানাসাহেবের কড়া মুখের দিকে সে তাকাতে পারল না। বললে, কী করব জনাব, পেটের দায়ে…
পেটের দায়ে! তাই বলে কাফের হয়ে যাবি? কাচ্ছু ধরিস?
জালে পড়ে মাঝে মাঝে। কিন্তু বেচি না জনাব, বিলিয়ে দিই।
হুঁঃ, বিলিয়ে দিস না আরও কিছু! তোবা তোবা। মুখ দেখলেও গুনাহ হয় তাদের। বাইশ বাজারে নিয়ে গিয়ে তোকে পয়জার মারা উচিত।
বড়ো বোয়ালটার কথা বসিরের মনে এল, কিন্তু বলবার সাহস হল না।
ফিরে এসে সারাদিন চুপ করে বসে রইল বসির। সমাজ তাদের চায় না, ধর্ম তাদের অস্বীকার করে, দুঃখ আর দুর্গতির কালো অন্ধকারে আচ্ছন্ন প্রত্যেক দিনের জীবন। কোনোখানে কিছুমাত্র মর্যাদা নেই, মূল্য নেই এতটুকুও। কাফেরের কাজ করে, মাছ ধরে বিক্রি করে বাজারে। সেই অপরাধে জমায়েতের নামাজের সময় সকলের পেছনে চোরের মতো গিয়ে দাঁড়ায়, মসজেদে ঢুকতে গেলে ইমামসাহেবের চোখ-মুখ ঘৃণায় কুঞ্চিত আর কুটিল হয়ে ওঠে।
রোসেনা জিজ্ঞাসা করলে, মাছ মারতে যাবে না?
বসির ক্লিষ্টকণ্ঠে বললে, আজ আর বেরোতে পারব না। বড়ো খারাপ লাগছে শরীরটা।
রোসেনা এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু কাল চলবে কী করে?
চলবে না। মাদুরটা এনে পেতে দে তুই, আমি শুয়ে থাকব একটু।
পাইকার নীরবে লক্ষ করতে লাগল সমস্ত ব্যাপারটা। তারপর একসময় অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে কাছে এসে বসল।
সেইজন্যই বলছিলুম, চলে যাও-না এখান থেকে। মোছলমান যেখানে মোছলমানের ওপর এত জুলুম করে, সেখানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে কীসের জন্যে?
বসির তেমনি দীর্ঘায়ত নির্বোধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
এর চাইতে হিন্দুর গাঁও ভালো। তারা যাই করুক, ধর্মের ওপরে জুলুম করে না। মোছলমানের বাচ্ছা হয়ে এই বেইজ্জত সহ্য করে পড়ে থাকবে তুমি?
মোছলমানের বাচ্ছা! টগবগ করে উঠল রক্ত! চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল, ধক ধক করে জ্বলে উঠল চোখ। পাইকারের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বসির বললে, তাই যাব, আজই চলে যাব।
অত্যন্ত স্নেহভরে পাইকার তার হাত চেপে ধরলে। বললে, না না, অত ব্যস্ত হতে কে বলেছে। ভেবে দ্যাখোনা দু-চার দিন।
কিন্তু দু-চার-দিন ভেবে দেখবার আর দরকার হল না।
সন্ধ্যার দিকে আবির্ভাব ঘটল পিরু মিয়ার। অসুস্থ মলিন রাত্রি দারিদ্র্যজীর্ণ পাড়াটার ওপরে ছায়া বিছিয়েছে। অন্ধকারে এখানে-ওখানে ঝুলছে ছেঁড়া জাল, মাছের আঁশটে গন্ধ। ভিজে কাঠ আর পোড়া পাতার ধোঁয়ায় অন্ধকারটা যেন কঠিন আর শরীরময় হয়ে উঠেছে। ধাওয়া পাড়ায় সন্ধ্যায় হাঁড়ি চড়েছে। হোগলার বেড়ার ফাঁকে দেখা দিচ্ছে রেড়ির তেলের টিমটিমে আলো।
পিরু হাঁক দিলে, বসির আছিস?
বসির উঠে বসল। ভারী আর আড়ষ্ট শরীরের ভেতর স্তিমিত হৃৎপিন্ড দুটো চমকে উঠল তার। বললে, কী মতলবে? তোলা নিতে এসেছ? কিন্তু জাল আজকে ফাঁকা, বলে দিয়ো তোমার শাহুকে।
পিরু মিয়া থমকে দাঁড়াল। যতটা না অপমান বোধ করলে, বিস্ময় বোধ করলে তার চাইতে অনেক বেশি।
খুব যে হাঁকডাক দেখছি। রাতারাতি নবাবি পেলি নাকি! কিন্তু মাছের কথা নয়, জরুরি ব্যাপার আছে।
