একমুখ হাসি নিয়ে সামনে পাইকার দেখা দিলে। একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে লোকটার। হাজার গালিগালাজ করলেও তার সে-হাসির কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় না, ভেতরের কী-একটা অনুপ্রেরণায় সে যেন সবসময়েই চরিতার্থ হয়ে আছে। ধৈর্যের প্রতিমূর্তি পাইকার।
রহমতুল্লা কিংবা করমতুল্লা-জাতীয় কী-একটা নাম তার আছে, কিন্তু পাইকার নামেই তার প্রসিদ্ধি এবং পরিচিতি। ধানের সময় সে দালালি করতে আসে, পাটের মরসুমে তাকে ঘুরতে দেখা যায়, এমনকী সাগর দিঘির মেলায় খোপরাপটি বা গণিকাপল্লির বিলিবন্দোবস্ত করতেও সে হাঁটাহাঁটি করে বেড়ায়। এককথায় তাকে বলা যায় সর্ববিশারদ। কোথায় তার বাড়ি কেউ জানে না। জিজ্ঞাসা করলে অত্যন্ত হাসির সঙ্গে উড়িয়ে দেয় প্রশ্নটা। এদিককার ইতর-ভদ্র সম্প্রদায় তাকে শ্রদ্ধা করে, ভয়ও করে খানিকটা। তার কাছ থেকে শহরের নানারকম সংবাদ মেলে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নূতন পরওয়ানার সন্ধান সে রাখে। যুদ্ধের সব খবর সে মুখে মুখে শুনিয়ে দিতে পারে। আর জানে সিনেমার গান–মেরে ঝুলা ক্যায়সে ঝুলে।
পাইকার বললে, কী বসির ভাই, খবর সব ভালো তো!
দাওয়ার ওপর বসে পড়ে বসির বললে, আল্লা যেমন রেখেছেন।
পাইকার ভ্রুকুটি করে বললে, আল্লা! আল্লা কী করবেন? মানুষের বদমায়েশি সব। চাল ডাল-তেল-নুন-রেজগি আল্লা নিয়ে লুকিয়ে রেখেছেন, তাই না?
ক্লান্ত নির্বোধ দৃষ্টিতে বসির তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পাইকারের কথাগুলো শুনতে ভালো লাগে না, কিন্তু মনের মধ্যে গিয়ে তলোয়ারের আগার মতো খোঁচা মারে। শিরায় শিরায় মাঝে মাঝে আগুন ধরে যায় যেন। মানুষ! মানুষের চাইতে বড়ো শত্ৰু মানুষের আর কে আছে!
পাইকার বললে, ইবলিশের বাচ্ছা সব। কথা নেই বার্তা নেই অতবড়ো মাছটা তুলে নিয়ে গেল! আর হালিম শাহু হরদম মদে ডুবে থেকে রাতারাতি পির হয়ে উঠেছে আজকে। ওর বাড়িতে বসে মৌলানাসাহেব ওয়াজ করবেন! মরি মরি!
বসির চমকে উঠল।
ওসব কথা বোলো না পাইকার! জমিদারের গাঁয়ে থাকি! যদি শোনে তাহলে…
ওই জন্যেই তো জাহান্নামে গেলে।
বসির চুপ করে রইল। পাইকার সত্যিই তার হিতাকাঙ্ক্ষী। দুঃসময়ে কত যে সাহায্য করে বলবার নয়। এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে যাওয়ার পথে যখন-তখন তার আতিথ্য নেয়, আর সেইসঙ্গে আনে চাল-ডাল-তেল, প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি। এমনকী রোসেনার জন্যে রঙিন শাড়ি পর্যন্ত। বসিরের ঘরে আসবার পরে রোসেনা যে দু-একখানা শাড়ি পড়েছে সে কেবল পাইকারের অনুগ্রহে। তা ছাড়া ছিন্ন মলিন দু-টুকরা ফতাই তার সম্বল।
কিন্তু ঠিক এই জিনিসটাই বসির যেন কেমন বরদাস্ত করতে পারে না। রোসেনা তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। রূপ এবং যৌবনের ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ এমন একটি মেয়ে ধাওয়া পাড়ায় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর বসির নিজে কুৎসিত, অত্যন্ত কুৎসিত। বয়স তার যৌবনের সীমা ডিঙিয়ে গেছে অনেক দিন। সর্বাঙ্গে পড়েছে দারিদ্র আর ম্যালেরিয়ার দন্তচিহ্ন। কিন্তু তার সঙ্গে রোসেনার মন মরে যায়নি। চুলের কাঁটার প্রতি লোভ আছে, বন্দরের সরকারি ডাক্তারবাবুর কলেজে-পড়া মেয়ে মাঝে মাঝে যখন গ্রামে বেড়াতে আসে, তখন তার রংবেরঙের শাড়ির দিকে তাকিয়ে লোলুপ হয়ে ওঠে রোসেনার চোখ। তার গা থেকে আসা পাউডারের গন্ধ রোসেনাকে কোন একটা অনাস্বাদিত অপরিচিত জগতের সন্ধান এনে দেয়। ইউনিয়ন বোর্ডের ইদারায় জল আনতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রোসেনা। সারাদিন মাছ ধরে বসির যে এখন ঘরে ফিরবে সেকথা তার মনেও থাকে না।
এসব কথা বসির জানে, ভালো করেই জানে। রোসেনাকে সে খুশি করতে পারেনি। সেইজন্যেই পাইকারের প্রতি একটা তীব্র বিদ্বেষ এবং সন্দেহে মনটা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তার। কেন সে এত অনুগ্রহ করে তাকে, কী এত স্বার্থ তার? বসিরের ভাঙা ঘরে রাত কাটাবার জন্যেই-বা তার এ-জাতীয় আগ্রহ কেন? তা ছাড়া পাইকারের চেহারা দেখতে সত্যিই ভালো, ফর্সা রং, ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি পরে, সিল্কের লুঙ্গি। মিহি আর মিষ্টি গানের গলা, কখনো কখনো একটা বাঁশি বের করে তাতে ফু দেয়। দরজার পাশে ঠুন ঠুন করে ওঠে রোসেনার হাতের কাচের চুড়ি।
কালো মুখখানা আরও কালো করে এক বার জিজ্ঞেস করেছিল রোসেনাকে, যখন-তখন দরজার পাশে অমন করে দাঁড়াস কেন বল দেখি?
রোসেনা জবাব দিয়েছিল, কোথায় যাব শুনি? তোমার সাতমহলা বাড়ির কোন মহলে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাকব?
বসির আর কিছু বলতে পারেনি। সাতমহলা বাড়ি—তা বটে। খোঁচা দিতে পারে বই কী রোসেনা। একটা ভাঙা ঘর, এক টুকরো দাওয়া। ছয়টি ঋতু, আলো বাতাস আর বৃষ্টির অধিকার। বর্ষার রাত্রিতে ময়লা চটের বিছানা নিয়ে খুঁজে বেড়াতে হয় কোন দিকটাতে জল পড়ে কম। ঝুলধরা ঘরের চালে কাচপোকা উড়ে বেড়ায় মাকড়সা শিকারের সন্ধানে। এখানে ওখানে ছোটো-বড়ো গর্ত, এক দিক বুজিয়ে দিলে উঁকি মারে আরেক দিক থেকে। সাপ কিংবা ইঁদুরের আস্তানা কে বলবে।
তারপর থেকে সে রোসেনাকে কোনো কথা বলেনি। নিজের দীনতায়—নিজের সর্বাঙ্গীণ দীনতায় বসির নীরব হয়ে গেছে। ঘোমটা টেনে রোসেনা পাইকারের সামনে ভাত বেড়ে দেয়, এগিয়ে দেয় পান। পাইকারের অপাঙ্গ দৃষ্টিতে কিছু-একটা প্রকট হয়ে ওঠে! দাঁতের উপর দাঁত কঠিন হয়ে চেপে বসে বসিরের।
