সম্প্রদায়টা যেমন নির্বিরোধ, তেমনি শান্তিপ্রিয়। সমাজ আর দারিদ্র্যের পেষণে প্রতিবাদের ক্ষীণতম ভাষাটুকুও কণ্ঠ থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। হাসানপুরের শাহু জমিদারেরা এই মধ্যবিংশ শতাব্দীতেও অষ্টাদশ শতকীয় ভঙ্গিতে জমিদারি করে চলেছে। ঘরে আগুন-দেওয়া কিংবা জোর করে মেয়ে টেনে নিয়ে যাওয়াটা আজকাল বন্ধ হয়েছে বটে, কিন্তু তাই বলে ধরে ধরে বেগার খাটানোটা এখনও আছে অব্যাহতভাবে। যখন-তখন ঝুড়ি ভরে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে মাছ তুলে নিয়ে যাওয়াটা এখন তারা জমিদারির অধিকার বলে মনে করে।
কিছু বলবার জো নেই। জবাব আসে, বাইরে থেকে ব্যাবসা করতে এসে শালারা লাল হয়ে গেলি, দুটো মাছ নজর দিতে গা এমন করকর করে কেন?
লাল। লাল হওয়ার অর্থ যে কী, শাহুরা নিজেরাও যে তা না-জানে এমন নয়। বিন্নার ছাউনি-দেওয়া ঘর, বর্ষার জল আটকায় না। লজ্জা নিবারণের জন্যে দু-টুকরো ফতা জোটে
ঘরের মেয়েদের। মাছের সের এই যুদ্ধের বাজারের কল্যাণে দু-আনা থেকে আট-আনায় উঠেছে বটে, কিন্তু তা-ও বেশিরভাগ চলে যায় দেবতা এবং উপদেবতার উপচারে। ওদের অত্যাচারজর্জর কালো মুখের দিকে তাকিয়ে বরেন্দ্রভূমির মাটি ঘৃণায় আর অপমানে সত্যি লাল হয়ে যায়।
সৈফুদ্দিন তাড়া দিয়ে বললে, বসিরভাই চুপ করে বসে আছ যে! ঘরে যেতে হবে না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসির উঠে দাঁড়াল। মাছ সেও বেশি পায়নি, বরং সবচাইতে কম পেয়েছে। ছেঁড়া জালটা সারানো যাচ্ছে না ক-দিন থেকেই, অথচ এক লাটিম সুতোর দাম কমসে কম আট গন্ডা পয়সা।
জালের সঙ্গে মাছগুলোকে জড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়ল বসির। দু-চারজন খরিদ্দার খালুই নিয়ে বসে আছে বিকেল থেকেই। একটু পরেই আসবে থানার কনস্টেবল-দারোগার জন্যে দৈনন্দিন তোল নিয়ে যাবে। তারপর সকালে বন্দরের বাজার।
বিলের থেকে কয়েক পা উঠে এসেই লালু চৌকিদারের তরমুজের বাগান। অন্ধকারে ফণীমনসার বেড়াগুলো যেন কালো কালো গোখরো সাপের মতো ফণা তুলে রয়েছে। কিন্তু লালু চৌকিদারের বাগানে তরমুজ নেই। শুধু তরমুজ কেন, লালু চৌকিদারও নেই। গত বছর বর্ষার সময় দিগদিগন্ত-ছাওয়া বিলে মাছের সন্ধানে গিয়ে সে আর ফিরে আসেনি। কোথায় কোন অতলে দামঘাসের লতা বন্ধনে জড়িয়ে সে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে সে-খবর কারও জানা নেই।
বসিরের মনটা ভারাতুর হয়ে উঠল। বিশ্বাস নেই বিলকে। মেঘ ওঠে না, অথচ খেপা হাওয়ায় বিল নাচতে শুরু করে দেয় আপন খেয়ালে। আধড়োবা শ্যাওড়া গাছের মাথায় আলাদ গোখুর কুন্ডলী পাকিয়ে থাকে, বিন্নার শিষ দেখে যেখানে আধ হাত জল মনে হয়, সেখানে দশ হাত লগি থই পায় না। ভাসমান পোড়া কাঠের গুঁড়িটা কোন মুহূর্তে যে কুমির হয়ে উঠবে, আগে থেকে কেউ তা অনুমান করতে পারে না। বসিরের অত্যন্ত ভয় হয় মাঝে মাঝে। হয়তো এই বিল একদিন তাকেও…
অন্যমনস্ক চিন্তা চকিত হয়ে উঠল মুহূর্তে। ওরা ধাওয়া পাড়ার মাঝখানে এসে পড়েছে। একটা কেরোসিনের ডিবা হাতে করে রোসেনা সামনে এসে দাঁড়াল। বললে, পাইকার এসেছে।
পাইকার! বসিরের ভারাতুর মনটা বিরক্তিতে বিস্বাদ হয়ে গেল। মাছ কিনবার খরিদ্দার যারা ছিল তারা পছন্দমতো মাছ নিয়ে চলে গেল। নগদ দাম মিলল নামমাত্র। ধাওয়াদের কাছ থেকে নগদ পয়সা দিয়ে মাছ কিনতে গেলে ভদ্রলোকের চলে না। সাত দিন সতেরো বার হাঁটাহাঁটি করলে যে-যা-খুশি তুলে দেবে এই এখানকার রেওয়াজ। প্রতিবাদ নিষ্ফল, সে ঔদ্ধত্য হাসানপুরের শাহুরা ক্ষমা করবে না। বিদেশ থেকে এসে মাছের ব্যাবসা করে যারা লাল হয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে এটুকু উপকারও পাবে না দেশের লোক? বাড়াবাড়ি করে যদি, চালা উপড়ে বিদায় করতে কতক্ষণ?
হালিম শাহুর খাস বরকন্দাজ পিরু মিয়া। বেঁটেখাটো চেহারা। ধমক ছাড়া কথা বলে না। ডেকে আনতে বললে বেঁধে আনাটাই তার রীতি, বিশেষ করে ধাওয়াদের সম্পর্কে। সবচাইতে বড়ো বোয়ালটা জমিদারের নজরানা বলে সে কাঁধে তুলে নিলে।
নিরুপায় নৈরাশ্যে বসিরের বুকের মধ্যে জ্বালা করে উঠল। মাছটার ওপর অনেকখানি আশা ছিল তার—অন্তত দশ আনায় বিক্রি হত বাজারে। এক লাটিম জালের সুতো…
ওটাই নিয়ে যাবে পিরুভাই? ছোটো দেখে একটা…
পিরু থেমে দাঁড়াল। চোখ পাকিয়ে বললে, ছোটো দেখে কেন?
মাছ তো বেশি পড়েনি, তাই…
তাই বলে হুজুরের মান ইজ্জত সব যাবে না কি? শহর থেকে মৌলানাসাহেব এসেছেন তার খবর রাখিস?
কে মৌলানাসাহেব?
পিরু মিয়া বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত করে বললে, কে মৌলানাসাহেব! কোথাকার বেকুব লোক রে তুই? মস্তবড়ো আলেম, তিন-তিন বার হজ করে এসেছেন। কাল সকালে ওয়াজ হবে।
পিরু আর দাঁড়াল না।
চোখ ফেটে কান্না আসতে লাগল। সারাদিন মাথার উপরে ঝাঁঝাঁ করে জ্বলেছে ভাদ্রের রোদ। সেই কোন সকালে এক ছটাক পানতা ভাত আর তিন সের জল খেয়ে বেরিয়েছিল, খিদেয় সমস্ত শরীরটা এলিয়ে পড়তে চাইছে। হাতে-পায়ে কাঁটার আঁচড়গুলো জ্বলছে বিছুটির জ্বালার মতো; যেসব জায়গায় জোঁকে ধরেছিল, সেসব জায়গা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত গড়াচ্ছে এখনও। অথচ সে প্রাণান্তিক পরিশ্রমের এই পারিশ্রমিক। মাঝে মাঝে মনে হয়, এসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে দূরে রোহণপুর ইষ্টিশনে চলে যায় কুলি খাটতে, রোজগার যা-ই হোক, তার ওপরে কেউ তোলা বসাতে আসবে না।
