কাশবনের মধ্যে অদৃশ্য হল দুজনে। নরোত্তম বললে, একটু দাঁড়াও মাঝি ভাই, আমি আসছি।
কিন্তু ফরিদ নিদারুণ ভয়ে চমকে উঠেছে। সমস্ত মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। এ কী? কী করছে সে? যে-অস্ত্রে শান দিচ্ছে এতদিন, সে-অস্ত্র কি ওর নিজের গলাতেই এসে লাগতে পারে না? গ্রামে তারও স্ত্রী আছে, মেয়ে আছে, ছেলের বউ আছে। আজ যদি সে মরে যায়, কাল টাকায় লোভে আর একজন যে এমনি করে তাদের নিয়ে মেঘনা পারি দেবে না, কে বলতে পারে? ফরিদের সমস্ত শিরা-স্নায়ুর মধ্যে আগুন জ্বলে গেল। নরোত্তম ঠাকুরের মতো লোকের অভাব হয় না কোথাও কোনোদিন।
ভয়ংকর মুখোনাকে আরও ভয়ংকর করে ফরিদ হাঁক দিলে মাল্লাদের।
রহিম, কামাল, এদিকে আয় দেখি। তামাক সাজ তো এক ছিলিম।
কাশবনের ওপারে রহস্যময় নীরবতা। হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে সুখীর আর্ত চিৎকার, ছাড়ো ছাড়ো, বাঁচাও আমাকে…
চমকে ফরিদের হাত থেকে আগুনসুদ্ধ কলকেটা পড়ে গেল মেঘনার জলের মধ্যে। এ কার কান্না? মনে হল তার মেয়েই যেন চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে। তার মেয়ে, তার স্ত্রী, আরও কত জন।
কিন্তু পরক্ষণেই সব নিস্তব্ধ। আর কাশবন ঠেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে আসছে নরোত্তম।
মাঝি, মাঝি, শিগগির নৌকো ছেড়ে দাও। মস্ত কুমির। কাশবন থেকে বেরিয়ে সুখীকে মুখে নিয়ে জলে নেমে গেল।
মেয়েরা একসঙ্গে আতঙ্কে কিলবিল করে উঠেছে। এমনকী সরলার কান্না পর্যন্ত গিয়েছে থেমে।
কুমির?
হ্যাঁ হ্যাঁ, মস্ত কুমির। গোলাম মহম্মদের দেওয়া নোটগুলো ট্যাঁকে খুঁজতে খুঁজতে নরোত্তম লাফিয়ে উঠে পড়ল নৌকাতে, আর এখানে দাঁড়িয়ে কাজ নেই। হায় হায়, সুখীর কপালে এই ছিল!
ছইয়ের উপর থেকে লম্বা একখানা লগি টেনে নিল ফরিদ। কুৎসিত মুখে একটা অমানুষিক হাসি হাসল, কত বড়ো কুমির ঠাকুরমশাই? কী নাম?
নরোত্তম কিছু-একটা জবাব দেওয়ার আগেই প্রচন্ড বেগে লগির ধারালো খোঁচা তার চোখে এসে লাগল। উলটে নৌকো থেকে কাদা আর বালির মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল নরোত্তম। একটা চোখ কেটে দরদর করে রক্ত পড়ছে, আর একটা অন্ধ হয়ে গেছে কচকচে বালিতে।
ভাউলি নৌকো ততক্ষণে অথই জলে। দূর থেকে ফরিদের করকরে গলা কানে ভেসে এল, এতখানি সহ্য হয় না ঠাকুরমশাই। না-খেয়ে মরে তো মরুক, তবু গাঁয়ের মেয়ে গাঁয়েই ফিরিয়ে নিয়ে যাব।
মূৰ্ছিতের মতো একরাশ জল-কাদার মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল নরোত্তম। ওঠবার চেষ্টা করছে, কিন্তু উঠতে পারছে না। ওদিকে অদূরে জলের মধ্যে ভেসে উঠেছে পোড়া কাঠের মতো একখানা প্রকান্ড মুখ, তার দুটো চোখে জ্বলন্ত ক্ষুধা নিয়ে নরোত্তমকে লক্ষ করছে। অন্ধ না-হলে নরোত্তম দেখতে পেত ওটা সত্যি সত্যিই কুমির।
তৃণ
পর পর তিনখানা নৌকা সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘাটে এসে ভিড়ল। ঘস-স-স। কাদার পাড় ঠেকেছে আর তার সঙ্গে মাথা তুলে বাধা দিয়েছে ডুবে-যাওয়া ঘাসের বন।
ধাওয়াদের ডিঙি। সারাদিন বিলে মাছ ধরে এই সন্ধ্যায় ফিরল ঘরে। নৌকার খোলের ভেতর বন্দি চিতলের লেজের ঝাপট শোনা যাচ্ছে, জলের মধ্যে খলখল করছে বোয়ালের ছানা। জালের গায়ে গায়ে কাঁটাওয়ালা চাঁদা মাছগুলো রুপোর চাকতির মতো আটকে রয়েছে।
কাদার মধ্যে লগি পুঁততে পুঁততে সৈফুদ্দিন বললে, দিনের পর দিন হল কী বিলের! সারাদিন জাল ফেলেও পাঁচ সের মাছ পাওয়া যায় না, এবার যে না খেয়ে মরতে হবে রে।
হাঁটুজলে নেমে জয়নাল ডিঙিটাকে পাড়ে আনবার চেষ্টা করছিল। রুদ্ধশ্বাসে এবং রুদ্ধ আক্রোশে চাপা একটা গর্জন করলে সে। বললে ওই শালা বিনের দল। বারোমাস ভেসাল নামিয়ে চুনোপুঁটিগুলো অবধি সব সাবড়ে নিলে মাছ কি আশমান থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়বে না কি?
খোলের ভেতর হাতড়াতে হাতড়াতে সৈফুদ্দিন বললে, সত্যি। পশ্চিম থেকে এসে এই বিন আর মালারাই আমাদের রুজি মারবার মতলব করছে। ওদের না তাড়ালে আর…
কী করে তাড়াবে? কতগুলো করে টাকা জমা দেয় ওরা, ওরা হালিম শাহুর ধর্মপুকুর যে।
তৃতীয় নৌকার মাঝি বসির ধাওয়া কোনো কথা বললে না। বলবার কিছুই নেই। অভাব অভিযোগ প্রত্যেক দিনের দুঃখ দুর্গতি, এরজন্যে কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই কিছু। টাকায় এক সের চাল, লুঙ্গির দাম পাঁচ টাকা, আট গন্ডা পয়সা দিয়েও এক লাটিম জালের সুতো পাওয়া যায় না। বিলের মাছগুলো দিনের পর দিন ফুরিয়ে আসছে বিস্ময়করভাবে, সেও এই দুর্ভাগ্যেরই অংশমাত্র। আল্লা মালেক ছাড়া এরজন্যে দায়ী নয় কেউ। বিনেরা নয়, মালারা নয়, হাসানপুরের শাহুরাও নয়।
সামনে বিলের কালো জল। আকাশ-ভরা তারায় সে-জল ঝলমল করছে। অন্ধকারে উড়ছে ঘরে-ফেরা গাংশালিক। একটু দূরেই বানের জলে একটা মড়া ঘোড়া ভেসে এসেছে, দুর্গন্ধে বাতাস বিষাক্ত। সেটাকে নিয়ে কুকুরের কোলাহল।
ধাওয়ারা জাতিতে মুসলমান আর পেশায় জেলে। আদি নিবাস ছিল রাজশাহির চলন বিলের ধারে, কিন্তু জমিদার আর মহাজনের অত্যাচারে দিনাজপুর জেলার এই দক্ষিণাঞ্চলে এসে ঘর বেঁধেছে ওরা। মুসলমান সমাজে নাকি জাতিভেদ নেই, কিন্তু ধাওয়ারা প্রায় অস্পৃশ্যদের শামিল। নিষ্ঠাবান মুসলমানেরা ওদের জলপান করতে দ্বিধা বোধ করেন, অন্য সম্পর্ক তো দূরের কথা। মৃত্যুর পরেও সেই জাতিভেদের হাত থেকে নিস্তার নেই, সাধারণ কবরখানায় ওদের প্রবেশ নিষেধ। বিলের ধারে গ্রামের শেষপ্রান্তে ওদের গোরস্থান।
