নৌকার ভেতরে কোলাহলের বিরাম নেই। সুমতি কাঁদছে, সরলার ছেলেটা চিৎকার করছে। এক-গা দগদগে ঘা নিয়ে ছেলেটা বাঁচবে না, কবে যে চোখ উলটে শেষ হয়ে যাবে তাও ঠিক নেই। তবু অসীম মমতায় সরলা ওই বিকৃত শিশুটাকে বুকে আঁকড়ে ধরে আছে। বিরক্তিতে নরোত্তমের সমস্ত মনটা বিস্বাদ আর বর্ণহীন হয়ে যায়। ওদিকে মালিনী সুর টেনে কৃষ্ণযাত্রার গান ধরেছে। দলের মধ্যে ওই মেয়েটা যা একটু হাসিখুশি—নিজের সম্বন্ধে ভাবনা নেই, দুশ্চিন্তাও নেই কিছু। অল্পবয়সে বিধবা হওয়ার পরে গাঁয়ের অনেকগুলো ছেলের সে মাথা খেয়েছে এইরকম জনশ্রুতি শুনতে পাওয়া যায়। তাকে আনবার জন্যে নরোত্তমের বেশি কিছু কাঠখড় পোড়াতে হয়নি, এককথাতেই সে প্রসন্নমুখে নৌকায় উঠে এসেছে।
কালো রূপে মোর মজিল যে মন, ঝাঁপ দেব কালো যমুনায়…
মালিনী বেরিয়ে এসে বসেছে ঠিক নরোত্তমের পাশটিতে।
জলের রংটি দেখেছ ঠাকুর? ঠিক যেন কালো যমুনা।
হ্যাঁ।
আমি রাধা হলে ঠিক ওই জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়তাম। অপূর্ব একটা ভঙ্গি করে হাসল মালিনী, তারপর, ঠাকুরের যে বাক্যি হরে গেল! আমার মুখের দিকে এক বার তাকালেও দোষ নাকি?
না না, অমন কথা কে বলে? জোর করেই হাসবার চেষ্টা করলে নরোত্তম, কিন্তু মতলবটা কী।
একটা পান খাওয়াতে পারো না? সকাল থেকে পান না খেয়ে মাথা ধরে গেল যে।
এখন কোথায় পাবে পান? একটা ঘাট আসুক, তারপরে যা হয় ব্যবস্থা করা যাবে।
তুমি বড়ো বেরসিক ঠাকুর। আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না। চটুল একটা কটাক্ষপাত করে লীলায়িত ভঙ্গিতে ভেতরে চলে গেল মালিনী।
নরোত্তম একটার পর একটা বিড়ি টেনে চলেছে বিষণ্ণ মুখে। সুখীর জন্যেই ভাবনা। মেয়েটা চুপ করে বসে নির্নিমেষ চোখ মেলে চেয়ে থাকে জলের দিকে। সরলা, সুমতি কিংবা অন্যান্য মেয়েদের জন্যে চিন্তার কিছু নেই। যতই হট্টগোল করুক, শেষপর্যন্ত নির্বিঘ্নেই ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া চলবে। কিন্তু সুখীকে বিশ্বাস নেই, ওর চোখের জলকে বিশ্বাস নেই। যখন-তখন ঝাঁপ দিয়ে পড়তে পারে মেঘনার কালো জলের মধ্যে, ঘটাতে পারে একটা কেলেঙ্কারি কান্ড।
তাই নরোত্তম আগে থেকেই সুখীর জন্যে একটা ব্যবস্থা করে ফেলেছে। গোলাম মহম্মদের সঙ্গে কথা হয়েছে তার।
আরও দুটো বাঁক পেরোলেই কাশীপাড়ার চক। সেখানে ঘন কাশবনের ওপারে কী আছে দেখা যায় না। আর সেইখানেই খালের মাথায় মিলিটারি কলোনির ঠিকাদারের নৌকা থাকবার
কিন্তু মনের দিক থেকে কেমন যেন জোর পায় না সে। সুখীর কথা ভাবলেই একটা অন্যায়, একটা বিচিত্র অপরাধবোধ এসে যেন তাকে আচ্ছন্ন করে দেয়। মেয়েটার মুখোনা সত্যিই ভারি সুন্দর, নরোত্তমের মাঝে মাঝে লোভ হয়, এক-একটা দুর্বল মুহূর্তে ভাবে…
হঠাৎ নৌকোর মধ্যে সরলার তুমুল চিৎকার। কলহের কলরোল নয়, বুকফাটা ডুকরে কান্না।
কী হয়েছে, হল কী ওখানে? ডাকাত পড়ল নাকি?
না। মালিনীর গলা ভেসে এসেছে, না! সরলার ছেলে মরে গেছে।
কান্না আর হট্টগোল। তবু নরোত্তমের মনটা খুশি হয়ে উঠেছে, যেন একটা ভার নেমে গেছে চেতনার ওপর থেকে। ছেলেটা মরে গেছে, বোঝা কমেছে একটা। একে একে সবগুলো ছেলেপিলে অমনি করে মরে শেষ হয়ে যেতে পারে না? নৌকার ভার কমে, শান্তি ফিরে আসে অনেকখানি। তা ছাড়া চিরযৌবনের রাজ্যে সবৎসার চাইতে অবৎসার কদর বেশি।
মরা ছেলেটাকে সরলা বুক থেকে নামাতে চাচ্ছে না। আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদছে। কাঁদুক। শহরের আলোয় ওই কান্না মিলিয়ে যেতে কতক্ষণ লাগবে? সেখানে চিরবসন্তের দেশ। রাত্রির অপ্সরাদের চোখে কখনো জল দেখতে পায় না কেউ।
আর ফরিদ তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তুফানের কোনো সংকেত নেই সেখানে, কিন্তু তার মনের প্রান্তে কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। একটা-কিছু ভাবছে, কিন্তু স্পষ্ট কোনো রূপ দিতে পারছে না।
তীর্থযাত্রীদের নৌকো চলেছে কালীঘাটে দেবতা দর্শনে। কুবেরের পূজামন্ডপে নতুন কালের নতুন বলি। কনট্রাক্টের টাকায় কেঁপে উঠেছে নারীমাংসের কসাইখানা। নরোত্তমের মতো পরহিতব্রতীর সান্ত্বনা দালালির কয়েকটা টাকা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মাথার ওপরে শরতের নির্মল নীলিমা। দূরে বোধনের বাজনা। অকালবোধন নয়, আকাল বোধন। কিন্তু কে জাগবে এই বোধনমন্ত্রে? চৌরঙ্গির হোটেলে সে আজ রং-মাখানো মুখে মদের গেলাসে চুমুক দিয়েছে।
বাঁকের পর বাঁক ঘুরে চলেছে নৌকো। দূরে যেখানে ঘূর্ণি হাওয়ায় লালবালি উড়ছে, ওইখানে কাশীপাড়ার কাশবন। আস্তে আস্তে নৌকো এসে ভিড়ল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখলে নরোত্তম, দূরে মিলিটারি কলোনির ঠিকাদারের নৌকোর মাস্তুল ঠিক আছে।
সুখী, সুখী!
প্রত্যাশায় সমুজ্জ্বল মুখে সুখী এসে দাঁড়াল। গালের দু-পাশে শুকিয়ে-যাওয়া অশ্রুর চিহ্ন। নরোত্তম কানে কানে বললে, এখানে তোকে নামিয়ে দিলে চলে যেতে পারবি? নদীর পাড় দিয়েই সোজা রাস্তা।
অগ্র-পশ্চাৎ ভাববার মতো মনের অবস্থা নয় সুখীর। সমস্ত প্রাণ তার চিৎকার করে কাঁদছে। বাবাকে ছেড়ে সে থাকতে পারে না, থাকতে পারে না তার ছোটোভাইটিকে ছেড়ে। না-খেয়ে যদি মরতে হয় সবাই একসঙ্গেই মরবে, তবু সে যাবে না কলকাতায়। মা কালী দর্শন করে তার কোনো লাভ নেই।
ঘন জঙ্গল আর কাশবন, ওপারে দৃষ্টি চলে। নরোত্তম বললে, চল, তোকে পথ দেখিয়ে দিয়ে আসি। নদীর ধারে উঠলেই সোজা সড়ক।
