গুনগুন করে সুমতি কাঁদছে। নরোত্তমের দু-হাতে কান চেপে ধরতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে গলার ভেতর একটা গামছা ঠেসে দিয়ে সে-কান্না বন্ধ করে দেয় সুমতির। তাদের পাশের গাঁয়ে একবার একটা খুন দেখেছিল নরোত্তম। সম্পত্তির লোভে বিধবা বড়োভাজের গলার ভেতর একখানা আস্ত থানকাপড় ঠেসে দিয়েছিল ছটোদেবর। মেয়েটার অস্বাভাবিক হাঁয়ের চেহারা দেখে তাকে মানুষ বলে মনে করবার উপায় ছিল না, চিরে-যাওয়া গালের দু পাশ দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত নেমে তার গলা পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছিল। উঃ, কতরকম বীভৎসভাবেই যে মরতে পারে মানুষ! এই দুর্ভিক্ষের সময় পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে যে তার রংবেরঙের ছবি দেখেছে।
ঝপ ঝপ ঝপাস। পাশ দিয়ে বারো দাঁড়ের একখানা ছিপ বেরিয়ে যাচ্ছে। মেঘনার জল থেকে উঠে আসা প্রেতমূর্তির মতো একদল অস্থিসার মানুষ দুর্বল হাতে দাঁড় টেনে চলেছে। বড়ো ভাউলখানা দেখে বারো জোড়া কালি-মাখানো চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
সমস্বরে প্রশ্ন এল, চাল আছে নৌকায়?
না।
ধান আছে?
না।
বারো জোড়া হাতের দাঁড়ের টানে ছিপ এসে ভিড়ল ভাউলির গায়ে। পাটাতনের ভেতর থেকে দু-তিনটে ল্যাজার ফলা ঝিকিয়ে উঠল একসঙ্গে।
ধান-চাল থাকে তো না দিয়ে এক-পা এগুতে পারবে না।
হালের মুখে ফরিদ মাঝির পেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। হুশিয়ার। নৌকায় সব জেনানা। ধান-চালের দরকার থাকে অন্য তল্লাটে যাও, একটা দানাও মিলবে না এখানে।
পৈতে আঁকড়ে ধরে নরোত্তম দুর্গানাম জপছে, নৌকার ভেতর থেকে উঠেছে মেয়েদের কান্না। কিন্তু একটি বার ভেতরে উঁকি দিয়েই বারো জোড়া চোখের আগুন নিবে গেল মুহূর্তের মধ্যে।
জাহান্নামে যাও। বারোটি কণ্ঠে চাপা অভিসম্পাত। ঝপ ঝপ ঝপাস। বারো দাঁড়ের ছিপ স্রোতের টানে দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
নরোত্তমের ঠোঁট তখনও থরথর করে কাঁপছে। বড়ো রক্ষা পাওয়া গেছে এ যাত্রা। প্রাণে আর বল ছিল না, বুকের রক্ত শুকিয়ে গিয়েছিল একেবারে। ল্যাজা দিয়ে ফুড়ে নদীর জলে ভাসিয়ে দিলে মা বলতেও নেই, বাপ বলতেও নেই।
ব্যাটারা ডাকাত নিশ্চয়।
কুশ্রী কুৎসিত মুখে ফরিদ ভয়ংকর একটা হাসি হাসল।
হ্যাঁ ঠাকুর, ওরা ডাকাত। তোমার মতো সাধু-ফকির নয়।
সাধু-ফকির কথাটা কানে গিয়ে লাগে। সন্দিগ্ধ চোখে ফরিদের দিকে তাকাল নরোত্তম। হ্যাঁ, ঠাট্টাই করছে। কিন্তু যা বলে বলেই যাক, উত্তর দেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
পালে জোর বাতাস লেগেছে, তরতর করে ঢেউ কেটে বেরিয়ে চলেছে নৌকো। চরের ওপর সাদা কাশবনে চখাচিখ উড়ছে। বহু দূরে কোথা থেকে ভেসে আসছে ঢাকের অস্পষ্ট শব্দ। আজ থেকে কি মহাপুজোর বোধন লাগল?
ওপরে নির্মেঘ নীল আকাশ। বাংলাদেশের শরৎ যেন তার স্নিগ্ধ নীলাঞ্জন আঁখি মেলে দিয়েছে। সোনার শরৎ। ঘরে ঘরে নতুন ধান, নবান্নের শুভ সম্ভাবনা। ফুলে আর পাতায় পদ্মদিঘির জল দেখা যায় না। শিশির আর শেফালি ফুলের গন্ধ মেখে বাংলার মাটি যেন শারদীয়া পূজামন্ডপ।
কিন্তু সে কোন বাংলা? কবেকার বাংলা, কত শতাব্দী আগেকার? এখানে মেঘনার জল কালীয়নাগের নিশ্বাসে কালো হয়ে গেছে। এখানে মড়কে জর্জরিত বাংলার বুক থেকে গৃহচ্যুত গৃহলক্ষীরা পণ্য হতে চলেছে শহরের গণিকাপল্লিতে। অভিশপ্ত শরৎ, দুঃস্বপ্নের শরৎ। ভিখারি মহেশ্বরের গৃহিণী আজ কুলত্যাগিনী।
নৌকোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সুখী দাঁড়িয়েছে নরোত্তমের পাশে। তার দু-গাল বেয়ে টপ টপ করে চোখের জল পড়ছে।
কী রে সুখী, হল কী তোর?
ঠাকুরমশাই, ছেড়ে দাও আমাকে। দোহাই তোমার, আমাকে ছেড়ে দাও। দু-হাতে নরোত্তমের পা জড়িয়ে ধরেছে সুখী। আমি তীর্থ দর্শন করতে চাই না, আমি কলকাতায় যেতে চাই না। আমাকে বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এসো।
আহা-হা, কেন পাগলামি করিস? সন্ত্রস্ত হয়ে টেনে পা সরিয়ে নিলে নরোত্তম।
বাপের কাছে ফিরে যাবি? কী করবি সেখানে গিয়ে? না-খেয়ে শুকিয়ে মরবি যে।
মরি মরব, আমার সেই ভালো ঠাকুরমশাই। আমি কলকাতায় যাব না, আমাকে ছেড়ে দাও আমি চলে যাই।
ছেড়ে দেব! সুখীর অসংগত আবদারে বিস্ফারিত চোখে নরোত্তম তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। দেড়শো টাকা বাপকে গুনে দিয়ে তবে মেয়েটিকে আনতে হয়েছে। সেই দেড়শো টাকা সুদে-আসলে একেবারে বরবাদ হয়ে যাবে। যতই ধর্মে মতি থাকুক-না, নরোত্তম দাতাকর্ণের পোষ্যপুত্র নয়।
সুখীর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল পড়ল নরোত্তমের পায়ের উপর। কী উষ্ণ জলটা, সমস্ত শরীর তার স্পর্শে যেন চমকে উঠেছে। অপূর্ব সুন্দর সুখীর মুখোনা। নরোত্তমের মনটা হঠাৎ যেন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
অনেক দূরে নদীর ওপারে গ্রামের আভাস। কত আশা, কত স্বপ্ন দিয়ে গড়া মানুষের আশ্রয়। কিন্তু কী আছে ওখানে? রিক্ত ধানের মরাই ভেঙে মাটিতে পড়েছে। উড়ছে শকুন। ওইখানে ফিরে যেতে চায় সুখী। কী করবে গিয়ে? আরও দশজনের মতো না-খেয়ে ছটফট করে মরে যাবে নয়তো মেঘনার জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে সমস্ত দুঃখের অবসান করবে। তার চাইতে…
আচ্ছা, এখন চুপ করে বোস তো গিয়ে। ঘাটে নৌকো লাগুক তারপর দেখা যাবে।
কিন্তু ঘাট কোথায়! নদী চলেছে তো চলেইছে! বাঁকের পর বাঁক ঘুরছে, পেছনে ফেলে যাচ্ছে খাড়া পাড়ি, ভেঙেপড়া গ্রাম। সন্ধ্যার আগে আর কোনো বাজার বা গঞ্জ পাওয়া যাবে না।
