দেখে অদ্ভুত একটা মায়া হল নরোত্তমের। মেয়েটার ভেতরে এমন একটা কিছু আছে যা সমস্ত মনকে অকস্মাৎ যেমন ব্যথিত, তেমনি পীড়িত করে তোলে। কিন্তু কী করতে পারে নরোত্তম? ব্যাবসা ব্যাবসাই, তার ওপরে কারও কোনো কথা চলে না।
সরলার চিৎকারের কিন্তু বিরাম নেই।
খামোকা? খামোক আমি চেঁচিয়ে মরছি, না? জিজ্ঞেস করো-না তোমার ওই আদরের সুখীকে। আমার ছেলের গায়ে ঘা, আমার ছেলে মরে যাবে। তোর গায়ে ঘা হোক হারামজাদি, তুই মর—মর—মর–
মট মট করে আঙুল মটকাবার শব্দ কানে এল। সরলার চোখ রাক্ষসীর মতো জ্বলছে। চমকে ছইয়ের বাইরে গলা টেনে নিলে নরোত্তম। যেন সরলার অভিশাপটা সাপের ফণার মতো উদ্যত হয়ে উঠে ফোঁস করে তারই বুকে একটা ছোবল মারবে।
দুর্বল গলায় নরোত্তম বললে, যাচ্ছ একটা ভালো কাজে, কালীঘাটে মা কালীর দরবারে। কিন্তু যা আরম্ভ করেছ তাতে মাঝগাঙে নাও ডুবিয়ে তবে তোমরা ছাড়বে।
হালের মাচায় ফরিদ মাঝি পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে নিশ্চল হয়ে। উত্তরের আকাশে পেঁজা তুলোর মতো যে মেঘের টুকরোটা দেখা দিয়েছিল, হাওয়ার মুখে আবার যেন তা দিকচিহ্নহীন নীলিমার বুক বেয়ে মিলিয়ে গিয়েছে। গাংশালিকের ঝাঁক চক্রাকারে ঘুরছে মাথার ওপর। গলুয়ের সামনে বসে যে-দুজন মাল্লা দাঁড় টানছে, তাদের পিঠে শুকনো ঘামের ওপর চিকচিক করছে সাদা সাদা লবণের বিন্দু।
কাতলা মাছের মতো প্রকান্ড মুখোনায় খানিকটা ভয়ংকর হাসি ফুটিয়ে তুলেছে ফরিদ।
আর ভয় নেই ঠাকুর। ঝগড়ার চোটেই তুফান পালিয়েছে। যা সওয়ারি তুমি নিয়েছ, মেঘনার সাধ্য নেই যে এদের গিলে হজম করতে পারে।
তা ঠিক। অন্যমনস্কভাবে হেসে বিড়ি ধরাল নরোত্তম।
সত্যি এ এক মহা ঝকমারির কাজ। পরোপকার করতে গেলেও বিঘ্ন অনেক, অনেক বিড়ম্বনা। গাঁটের কড়ি খরচ করে সে এদের কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছে, কালীঘাটে কালী দর্শনও করাবে তাতেও তো মিথ্যে নেই কিছু। তারপরে? তারপরে যা হবে তার জন্যে তো আর দায়ী করা চলে না নরোত্তমকে। দেশ-গাঁয়ে পড়ে থেকে ভিটে কামড়ে মরে যাচ্ছিল সমস্ত, তার চাইতে এ সহস্র গুণে ভালো। তাসের গড়া সংসার তো দুর্ভিক্ষের একটা দমকাতেই ভেঙে পড়েছে। ঠুনকো আত্মসম্মান; পেটে ভাত না পড়লে যে তার এতটুকুও দাম নেই এ সত্য নরোত্তম ভালো করেই জানে।
তা ছাড়া এমন দোষই-বা আছে কোনখানে। কলকাতায় যারা এই জীবনকে মেনে নিয়েছে সহজভাবে, কেমন সুখে আছে তারা। শহরের সমস্ত বড়োলোক তাদের পায়ের তলায় মাথা বাঁধা দিয়ে বসে আছে। রাত্রির আলোয় তাদের রংমাখা মুখগুলো দেখে অপ্সরা বলে মনে হয়, ঋষি-মুনিরও বিভ্রম জাগে তাতে। গায়ে জড়োয়ার গয়না, দামি দামি শাড়ির চটক। ওদের একটি হাসির জন্যে মানুষ ভিটেমাটি বন্ধক দেয়, ওদের অবজ্ঞার অপমানে লাখপতি আত্মহত্যা করে। খুঁটেকুড়ানি থেকে রাজরানি হতে পারে সবাই, নরোত্তমের সান্ত্বনা শুধু যৎকিঞ্চিৎ দালালি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিঃস্বার্থ সেবাব্রত ছাড়া আর কোন আখ্যা দেওয়া চলে একে?
ফরিদ হাসে।
ভালো ব্যাবসা তোমার ঠাকুর। ধান-চাল-পাটের চাইতে ঝক্কি ঢের কম, কাঁচা পয়সা অনেক বেশি। আগে জানলে কে এমন করে নৌকো ঠেলে মরত?
নৌকোর ভেতরদিকে আড়চোখে তাকাল নরোত্তম। সন্ত্রস্ত গলায় বললে, চুপ চুপ। ফরিদ তবুও হাসছে। কিন্তু সত্যিই কি হাসছে! ওর চোখ দুটো দেখে নরোত্তমের সন্দেহ হল।
তুমি তো বামুন। সমাজের ইজ্জত বজায় রাখা তোমার কাজ। ঘরের পর ঘর উজাড় করে মেয়েদের বিক্রি করে দিচ্ছ পেশাকরদের কাছে। সমাজের মুখে হাজার বাতির রোশনাই জ্বলে উঠছে নিশ্চয়!
নরোত্তম জবাব দিল না, কথাটা সে যেন শুনতেই পায়নি। নীরবে চিন্তাকুল মুখে সে শুধু বিড়িটা টেনে চলল। ফরিদের কথায় মাথার মধ্যে হিন্দুত্বের রক্ত চনচন করে উঠল একবার। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিবাদ বাঁধাবার মতো সময় এ নয়, মনের অবস্থাও নয়। এই হিংস্র উন্মত্ত নদীর কান্ডারি ওই লোকটা ইচ্ছে করলেই পাকের মধ্যে নৌকো ফেলে দিয়ে সবসুদ্ধ একসঙ্গে পাতালপুরীতে পৌঁছে দিতে পারে।
ফরিদ আবার বললে, ঠাকুরমশাই, মরে তুমি বেহেস্তে যাবে। নরোত্তম তবু জবাব দিল না। বলছে বলুক, ওসব ছোটো কথায় কান দিতে গেলে অনেক কাল আগেই সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে হত। বিপন্ন নারীর একটা সুবন্দোবস্ত করে দিলে পাপ হবে এমন কথা শাস্ত্রে লেখা নেই কোথাও। কিন্তু ফরিদের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। শাস্ত্রের গভীর রহস্য যবনে কেমন করে বুঝবে?
মেঘনার মেঘবরণ জল প্রশান্ত মন্থরগতিতে চলেছে সমুদ্রের দিকে। অজস্র হাওয়ায় রাশি রাশি ছোটো ছোটো ঢেউ উঠছে, নদীর বুকে ফুটছে ফেনার ফুল যেন কালীয়নাগের হাজার ফণা ছোবল তুলছে একসঙ্গে। মহানাগের কুন্ডলীর মতো এখানে-ওখানে চক্রাকারে উলাস দিচ্ছে শুশুকের দল। নৌকার পচা কাঠ আর জলের একটা মিষ্টি গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে বাতাস।
নৌকার ভেতর থেকে গুনগুন করে একটা গানের আওয়াজের মতো কানে আসছে। সরলার চিৎকার থেমে গেছে, কিন্তু গান গাইছে কে? সাগ্রহে কান পাতল নরোত্তম। না, গান নয়। সুমতি কাঁদছে। তারই চোখের সামনে তার স্বামী একরাশ বুনো লতা চিবিয়ে ভেদবমি হয়ে মরেছে, সেই শোকেই কাঁদছে।
কাঁদছে–কাঁদছে! নরোত্তমের মেজাজ যেন সপ্তমে চড়ে যায়। কেন কাঁদে, কার কাছে কাঁদে? কে আছে কান্না শোনবার জন্যে? অথচ সবাই কাঁদছে। মরবার আগে সপ্তমে চেঁচিয়ে কাঁদছে, মরবার সময় অব্যক্ত যন্ত্রণায় গুমরে গুমরে কাঁদছে। তবু ভালো, মরবার পরে মানুষের কান্না শোনা যায় না। তাহলে সে-কান্নার শব্দে আকাশ ফেটে চৌচির হয়ে যেত।
