নৌকোয় অনেকগুলো প্রাণী। সবাই মিলে তারস্বরে কোলাহল জুড়ে দিয়েছে। নরোত্তমের মেজাজ আরও বেশি করে বিগড়ে গেল। একা কত দিক সামলানো যায়?
ভাদ্রের ভরা গাং। আকাশে শরতের নীলাঞ্চল মায়া ছড়িয়েছে। দূরে আধডুবো চরের উপরে চিকচিক করছে সোনা-মাখানো বালি, স্তবকে স্তবকে ফুটে উঠেছে কাশের ফুল। পাড়ের কাছে গাংশালিকের ঝাঁক উড়ছে। আশ্বিন আসন্ন।
পূর্ববাংলার নদী দিয়ে এই সময়ে চলাচল করে অসংখ্য ভাউলি নৌকা, নরোত্তমের এই নৌকাখানার মতো। ঘরে ঘরে দুর্গা পূজা, আনন্দমুখরিত শারদীয়ার আয়োজন। দেশ-বিদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা বড়ো বড়ো নৌকায় বোঝাই দিয়ে পাঁঠা বিক্রি করতে আনে—মহিষমর্দিনী চন্ডিকার মহাপ্রসাদ।
কিন্তু তেরোশো পঞ্চাশ সালের আশ্বিন মাস। বাংলার সীমান্তে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়েছে মেঘনার উত্তর দিগন্তে মহানাগের বিষনিশ্বাসের মতো। এসেছে সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষ। ভাঙা চন্ডীমন্ডপে সাপ আর শেয়াল এসে বাসা বেঁধেছে। বোধনতলায় ছড়িয়ে আছে নরমুন্ড। দেবী এবার আদৌ মর্তে আসবেন কি না পঞ্জিকায় উল্লেখ নেই। কিন্তু তাঁর দোলা-চৌদোলা যে আগে থেকেই পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, সে-সম্পর্কে সন্দেহ করবে কে? শাস্ত্র বলেছে, ফল মড়কং।
তাই পাঁঠার নৌকায় এবার পাঁঠা নেই। এবার নতুন পদ্ধতিতে দেবীপূজার ব্যবস্থা। শহরের পূজামন্ডপে ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত স্বর্ণযজ্ঞের আহুতি। বাংলার ঘরে ঘরে মঙ্গলপ্রদীপের শিখা নিবে গেছে, ছায়াকুঞ্জের নীচে সোনার পল্লিতে কল্যাণী গৃহবধূর কাঁকন আজ আর ছলভরে বেজে উঠছে না। ব্ল্যাক-আউটের দিনেও নিবে যাওয়া তুলসীতলায় প্রদীপ সহস্র ছটায় বিচ্ছুরিত হচ্ছে মহানগরীর গণিকাপল্লিতে। সন্ধ্যাশঙ্খের শেষ পরিণতি হয়েছে ঘুঙুরের শব্দে, হারমোনিয়ামের বেতালা মত্ততায়, মাতালের জড়িত চিৎকারে। যুদ্ধের কনট্রাক্ট যাদের রাতারাতি গৌরীসেনের ভান্ডার খুলে দিয়েছে, আজ সোনার বাংলা তাদের কাছে প্রতিফলিত হয়েছে সোনালি মদের ফেনিল পাত্রের ভেতরে।
নতুন পুজোর নতুন ব্যবস্থা। দেবী আর ভোলা মহেশ্বরের ভিখারিনি গৃহিণী নন, কুলত্যাগ করে তিনি কুবেরের অঙ্কলক্ষ্মী হয়েছেন। বাংলার নারীত্বও তাই আজ বিশ্বমাতার দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করেছে। যাজন-যজন নরোত্তমের পৈতৃক ব্যাবসা, নতুন কালের হাওয়ায় তার রূপান্তর ঘটেছে। পাঁঠার নৌকায় একদল নারী বোঝাই দিয়ে নরোত্তম বিক্রি করতে চলেছে শহরে। শ্মশান বাংলার গ্রামে গ্রামে রিক্ত মহেশের দীর্ঘনিশ্বাস ঘূর্ণি হাওয়ায় কেঁদে বেড়াচ্ছে।
নৌকার ভেতরে কলহ, কোলাহল আর দাপাদাপি। ভাউলেখানা বাঁ-দিকে কাত হয়ে পড়ল। বলিষ্ঠ মুঠিতে নৌকার হালে মোচড় দিয়ে ফরিদ বললে, তোমার সওয়ারিদের একটু থামাও-না ঠাকুর। যে-হট্টগোল বাঁধিয়েছে, ঝড় আসবার আগেই ওরা ডুবিয়ে দেবে দেখছি।
ছইয়ের ভেতর মুখ বাড়িয়ে দিলে নরোত্তম।
এই, কী হচ্ছে ওখানে? একটু ক্ষান্ত হয়ে বসো-না সবাই।
কিন্তু ক্ষান্ত হবার মতো মনের অবস্থা নয় কারোর। তেরো থেকে ত্রিশ পর্যন্ত নানা বয়সের এক দঙ্গল মেয়ে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে বাদুড়ের ছানার মতো ঝুলে রয়েছে তিন-চারটি শিশু। নরোত্তমের মতে এরা নিতান্তই অনাবশ্যক বোঝা, কিন্তু বর্জন করবার উপায় নেই। কালো কালো জীর্ণদেহ কতগুলো মানবের সমষ্টি। দেখলে বাৎসল্য জাগে না, পা ধরে টেনে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে মেঘনার অথই জলের মধ্যে। আরও যত বিড়ম্বনা ওই অপোগন্ডগুলোকে নিয়েই।
ছোটো ছেলেটাকে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে চিৎকার করছে সরলা। ছেলেটার অঙ্গসংস্থান দেখলে মনে হয় কারোর অসতর্ক খেয়াল কালো চামড়ায় ঢাকা অসংলগ্ন কতগুলো অপরিণত অবয়বকে জুড়ে দিয়েছে একসঙ্গে। ঘাড়ে-পিঠে দগদগ করছে ঘায়ের চিহ্ন, চোখ মেলে সেদিকে তাকিয়ে থাকলে ঠেলে যেন বমি আসতে চায়। কিন্তু ওই বিকৃত জীবনটাকেই ঐকান্তিক ক্ষমতায় আঁকড়ে রেখেছে সরলা—বাইরের এতটুকু কাঁটার আঁচড় অবধি যেন সইতে দেবে না।
তুমিই এর বিচার করো ঠাকুর। অমন ভালোমানুষ সেজে বাইরে বসে থাকলে চলবে না।
কী বিচার করব আবার? খেকিয়ে উঠল নরোত্তম। জোড়হাত করে বলছি, জিবে শান দেওয়াটা একটু বন্ধ রাখো সকলে। শুকনো ডাঙায় উঠে যত খুশি চেঁচিয়ে, কিন্তু এখন…
সরলা কিন্তু থামতে চায় না। অদ্ভুত গলা, কানের মধ্যে শানিত হয়ে বিঁধে যায় এসে। মাথার রুক্ষ চুলগুলো ঘাড়ের দু-পাশে গোছায় গোছায় ভেঙে পড়েছে, যেন রক্ষাচন্ডীর মূর্তি। দেখে নরোত্তমের ভয় করে।
জানি জানি, সুখীর ওপরেই তোমার যত নেকনজর। ওকে একটা কথা বলতে গেলেই তোমার বুক চড়চড় করে ফেটে যায়। অতই যদি একচোখোমি তাহলে ওকে নিয়ে মনের সাধে নৌকাবিলাস করলেই তো পারো, সবগুলোকে এক নৌকোয় ঠেলে তুলেছ কেন?
আহা-হা থামো-না। কেন এমন করে চিৎকার করছ, থামো-না। গলার স্বর শান্ত আর কোমল করবার চেষ্টা করলে নরোত্তম, ববাঝোই তো সব, একসঙ্গে চলাফেরা করতে গেলে…
আড়চোখে নরোত্তম তাকাল সুখীর দিকে। আঠারো-উনিশ বছরের সুশ্রী মেয়ে। জাতে জেলে, কিন্তু মুখের শ্রী-ছাঁদ দেখলে সেকথা মনে হয় না কারও। বাইরে নৌকোর গায়ে কালো জল খেলা করছে, তার নির্নিমেষ চোখ দুটো নিবদ্ধ হয়ে আছে সেই জলের ওপর। নিজের ভেতরেই যেন একান্তভাবে নিমগ্ন হয়ে আছে সে। তাকে কেন্দ্র করে এত কলহ আর কোলাহল কিছুই যেন তার কানে যাচ্ছে না।
