চেয়ে দেখলুম, কেউ কোথাও নেই। শুধু কালো-মতন একটা ষণ্ডা লোক ময়লা একটা গামছা পেতে গাছতলায় ভোঁস ভোঁস করে ঘুমুচ্ছে আর ফর ফর করে নাক ডাকাচ্ছে।
তা ডাকাকগে–আমার কী! আমিও একটা ঝুপসি-মতন গাছের নীচে বসে পড়লুম, তারপর বার কয়েক তারা-তারা-ব্রহ্মময়ী বলে জলে বঁড়শি ফেললুম।
ফেলেছি তো ফেলেইছি–ফাতনা নট নড়নচড়ন। আরে মাছ থাকলে তো খাবে! বসে বসে মাজা ধরে গেল, ফাতনার দিকে চেয়ে চেয়ে চোখ টনটন করতে লাগল, রেগেমেগে ভাবতে লাগলুম, খামকা এমন ধাষ্টামোও করে।
তা হলে দুসেরী মাছ উঠল কোত্থেকে?
ধেত্তেরি, দাঁড়া না একটু। অত বকর বকর করলে চলে? আমি তো বসেই আছি। ইদিকে আবার কোত্থেকে দুটো ফড়িং এসে হাজির হয়েছে, বসবার আর জায়গা পেলে না, খালি ফাতনার দিকেই তাক!
বসে থাকতে থাকতে ফড়িংগুলোর ওপরেই রাগ হতে লাগল। রাগ হতে হতে পিত্তি জ্বালা করতে লাগল। তখন ওগুলোকে তাড়াবার জন্যেই ঘ্যাঁচ করে বঁড়শিতে এক টান।
–তারপর? মাছ উঠে এল?
না–মাছ নামল।
–নামল। সে কী? কোত্থেকে নামল? হি-হি-হি
খুব হাসছিস যে। আচ্ছা, আর একটু শোন।
-যেই টান মেরেছি, বুঝলি–বঁড়শি সোজা গিয়ে গাছের ঝাঁকড়া ডাল-পাতার মধ্যে আটকে গেল! যতই টানি কিছুতেই আর নামে না। শেষে মরিয়া হয়ে দাঁত মুখ সিঁটকে যেই আর একখানা পেল্লায় টান মেরেছি–অমনি ঝ-র-র–আমার পিঠের ওপর ঝপাং।
কী ঝপাং?
–শূন্য থেকে একটা বিরাশী সিক্কার কিল। ব্যস, আমি চিতপটাং।
–তাপ্পর? কে কিল মারল? ভূতে?
না রে, না–একটা দুসেরী রুই মাছ। গাছ থেকে ধপাং করে আমার পিঠে নেমে পড়েছে।
–গাছ থেকে দুসেরী রুই মাছ! হা-হা-হা-হো-হো-হো, আর হাসাসনি প্যালা, খিল ধরে মরে যাব। তুই নিশ্চয়ই গাঁ
খবরদার, যা-তা বলিসনি! চুপ করে শুনে যা! মাছটা পড়ল–আমি উঠে বসলুম, আর হাঁ করে রামছাগলের মতো চেয়ে রইলুম সেদিকে। আর তখন
–কখন?
–সেই ষণ্ডা লোকটা–যে ময়লা গামছা পেতে ঘুমুচ্ছিল, সে উঠে পড়ল তড়াক করে। চোখ মিটমিট করে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর ফিসফিসিয়ে বললে, গাছে মাছের ঝুড়িটা লুকিয়ে একটু ঘুমুচ্ছিলুম, সেখান থেকেও মাছ টেনে নাবালে! তোমারই বরাত জোর। যা হোক–ওটা তোমায় দিলুম–বাড়ি গিয়ে খেয়ো, কিন্তু কারুকে বোলো না–কোনও পুলিশ-টুলিশকেও না।
বলেই তড়বড় করে গাছে উঠে, কোত্থেকে মস্ত একটা মাছের চুবড়ি নামিয়ে, সেটায় চট ঢাকা দিয়ে চট করে যে কোনদিকে হাওয়া দিলে, আর আমি দেখতেই পেলুম না।
তীর্থযাত্রা
মেঘনার জল কালীদহের মতো কালো। কালো কালো ঘূর্ণি যেন সাপের মতো কুন্ডলী পাকাচ্ছে। টলমল করে উঠেছে এত বড়ো ভাউলে নৌকাখানা। নরোত্তম বললে, হুশিয়ার ভাই হুঁশিয়ার।
কঠিন মুঠোতে হালের আগা আঁকড়ে ফরিদ মাঝি তাকালে আকাশের দিকে। উত্তরে যেখানে তীরতটের কাছে গাংশালিকের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে আর নিরবচ্ছিন্ন খানিকটা সবুজ অরণ্যকে দেখা যাচ্ছে ঝাপসাভাবে, ঠিক ওইখানে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের রাশ জমে উঠেছে। ফরিদ মাঝি জানে লক্ষণটা ভালো নয়। কালো কালিন্দীর মতো মেঘনার জল থেকে কালীয়নাগের বিষনিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যেকোনো মুহূর্তে ওই হাঁসের পাখার মতো মেঘ কষ্টিপাথরের রং ধরে দিগদিগন্তকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। তারপর মাতাল মেঘনা তো রইলই।
ঘূর্ণির আকর্ষণে ভাউলে নৌকা থরথর করে কাঁপছে। নিজের অজ্ঞাতেই নরোত্তমের একখানা হাত চলে গেছে মলিন পৈতার গুচ্ছের ভেতরে। না, নিজের প্রাণের ভয় করে না নরোত্তম। জীবন তো পদ্মপত্রে শিশিরবিন্দুর মতো, একদিন টপ করে ঝরে যেতে পারে। দেহতত্ত্বের গানে বলেছে–ধুলোর দেহ একদিন ধুলো হয়ে যাবেই। কালের অনিবার্য করাল স্পর্শকে কেউ অতিক্রম করতে পারবে না কোনোদিন। ধুলো না-হয়ে দেহটা জলে জলাঞ্জলি হয়ে গেলেও নরোত্তমের দিক থেকে আক্ষেপ নেই কিছু। কিন্তু এতগুলো প্রাণীকে জলে ডুবিয়ে মারলে যে মহাপাতক এসে তার ওপরে অর্শাবে, তারজন্যেই নরোত্তম খুব বেশি পরিমাণে চিত্তচাঞ্চল্য বোধ করছে।
ও মাঝি ভাই হুঁশিয়ার। দেখো, সবসুদ্ধ জলে ডুবিয়ে মেরো না যেন।
ক্যাঁ…চ। নৌকাটাকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হাল ঘুরে গেল। বিন্দু বিন্দু ঘামে ফরিদের দু হাতে কঠিন মাংসপেশি দুটো জ্বলছে—শক্তি আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। করকরে ভাঙা গলায় ফরিদ বললে, তুমি চুপ করে বসো-না ঠাকুর। পাঁচ পিরের নাম নিয়ে পাড়ি ধরেছি, যা করবার আল্লা করবেন।
ফরিদের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল নরোত্তম। লোকটা দেখতে কুৎসিত। শুধু কুৎসিত নয়—ভয়ংকর। পুরু পুরু প্রকান্ড ঠোঁট দুটো কাতলা মাছের মতো বাইরের দিকে ঝুলে পড়েছে। অসংখ্য লাল লাল শিরায় রেখাঙ্কিত চোখে যেন একটা ক্ষুধার্ত বন্যজন্তুর পিঙ্গল হিংস্রতা। গালে আর কপালে রাশি রাশি ব্রণের ক্ষতচিহ্ন। নিষ্ঠুর উদ্দাম মেঘনার সঙ্গে যেন কোথায় ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য আছে লোকটার।
কিন্তু পাঁচ পির! বিশাল মেঘনার দিকে তাকিয়ে যেন আশ্বাস পায় না নরোত্তম। শুধু পাঁচ পিরেই কুলোবে না। এই নদী পাড়ি দিতে তেত্রিশ কোটি দেবতার দরকার, নইলে উনপঞ্চাশ পবনকে ঠেকাবে কে? একটা বরুণমন্ত্র জানা থাকলে সুবিধে হত, জপ করা যেত এই সময়ে। ময়লা পৈতার ভেতরে নরোত্তমের আঙুলগুলো চঞ্চল হয়ে উঠল।
