অতএব আধ মাইলখানেক ছোটবার পরে ছাগল যখন দিগন্তে বিলীন হল, তখন পেছন ফিরে হারুবাবু আবার হাহাকার করে উঠলেন।
গেল গেল প্যালারাম–সর্বস্ব গেল আমার।
কেন গেল, কোথায় গেল, কবে গেল?-ছাগল ধরবার আশায়, মাংসের লোভে আমি তখনও ছুটছি হাঁপাতে হাঁপাতেই জানতে চাইলুম : কোন্ ট্রেনেই বা গেল?
ধুত্তোরি!-হারুবাবু আমার ঘাড় চেপে ধরলেন : চুলোয় যাক তোমার ট্রেন। ফেরো–ফেরো! গোরু–গোরু এসে পড়েছে।
–কোত্থেকে পড়ল?
–তোমার মুণ্ডু থেকে। হারুবাবু আমাকে টানতে টানতে আবার বাগানের দিকে ছুটলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন : পালা–পালা–হেট হেট। গেল প্যালারাম-আমার সব গেল।
তখন আমি দেখতে পেলুম। আমরা যখন ছাগলের পেছনে ছুটেছি, সেই সময় গোরু এসে পড়েছে আমের গন্ধে। আর নিশ্চিন্তে ল্যাজ দিয়ে মাছি তাড়াতে-তাড়াতে সোজা এগোচ্ছে হারুবাবুর আমের ঝুড়ির দিকে।
হারুবাবু আবার গগনভেদী চিৎকার করলেন : হেট হেট-পালা–পালা
অতদূরের হাঁকে গোরুর কিছুমাত্র বিকার দেখা গেল না। পরিষ্কার দেখতে পেলুম, আমের ঝুড়ির ওপর তার মুখখানা গভীর মনোযোগের সঙ্গে নেমে গেল।
হারুবাবু একটা খাবি খেলেন।
–এক গ্রাসেই তো তিনটে খেয়ে নেবে–অ্যাঁ। হেট–হেট-ভাগ–ভাগ
বলেই মাটি থেকে কী কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিতে চাইলেন গোরুর দিকে। কিন্তু সেটা গোরুরই খানিকটা কাঁচা গোবর–ঘাস হারামি করতে রাজি হল না। উলটে হারুবাবুরই হাতে-টাতে লেগে গেল।
উঃ কী গন্ধ! ধরো প্যালারাম–ধরো। ওই ওই আবার খাচ্ছে। ওফ আরও তিনটে! পুরো এক টাকার আম খেয়ে নিলে যে!–হারুবাবু ডুকরে উঠলেন।
আমরা এসে পড়েছি দেখে গোরুও ছুট লাগাল।
ধরো, গোরু ধরো-প্যালারাম—কুইক!
গোরু ধরে কী হবে?–আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলুম : ওরও মাংস খাবেন নাকি?
–ওয়াক থু রাম রাম। হিঁদুর ছেলে না আমি?–গোরুকে তাড়া করতে করতে হারুবাবু বলললেন, খোঁয়াড়ে দেব ওটাকে–খোঁয়াড়ে। অন্তত আটগণ্ডা পয়সা উশুল হবে। তা থেকে দু আনা তোমাকেও দেব। ছোটো ছোটো–
দু আনা! তাই বা মন্দ কী। খামকা দু আনা পয়সাই বা আমায় দিতে যাচ্ছে কে? আবার গোরুর পেছনে ছুট লাগালুম দুজনে।
কিন্তু ছুটন্ত ছাগলকে যদি উড়ন্ত পাগল ছাড়া কেউ ধরতে না পারে, তবে দৌড়বাজ গোরুকে কে ধরতে পারে ধড়িবাজ গোঁয়ার-গোবিন্দ ছাড়া? ছাগল ছুটেছিল মেল ট্রেনের মতো, গোরু ছুটল জেট প্লেনের মতো। পেছনের ল্যাজটা তার জয়ধ্বজার মতো উড়তে লাগল।
ধর—ধর—ধর–
ধরা গেল না। গোরুকে ধরে খোঁয়াড়ে দেবে–গোঁয়ার ছাড়া এমন গোঁ আর কার আছে?
অগত্যা গোঁ গোঁ করতে করতে ফিরে এলেন হারুবাবু। দু আনার আশা ছেড়ে আমাকেও ফিরতে হল। গোরুতে কটা আম খেয়েছে কে জানে। ঝুড়ির অনেকখানিই সাফ।
হারুবাবু সোজা চোখ বুজে আমগাছতলায় শুয়ে পড়লেন।
গেল প্যালারাম, কমসে কম দু টাকার আম আমার গেল।
কী আর করি। একটা ডাল কুড়িয়ে হারুবাবুর মাথায় হাওয়া দিতে লাগলুম।
আরও একটা জিনিস আমি দেখেছি। একটা কুকুর হারুবাবুর একপাটি নতুন চটি নিয়ে পালিয়েছে।
কিন্তু কুকুর ধরে লাভ কী? তার মাংস খাওয়া যায় না তাকে খোঁয়াড়েও দেওয়া যায় না বোধহয়। আর পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত জুতো নিয়ে পলাতক কুকুরকে কে-ই বা ধরতে পেরেছে? কোনও উড়ন্ত পাগলও নয়–কোনও ধড়িবাজ গোঁয়ারগোবিন্দও নয়।
তা ছাড়া শকটা একটু সামলে নিন হারুবাবু। এই মুহূর্তে দুঃসংবাদটা দিয়ে ওঁর অপঘাত ঘটিয়ে কী হবে?
তিন মিনিটের গল্প
বুঝলি, আজ একটা দুসেরী রুই ধরেছি।–আঃ–যা আরামে খেলুম, সে আর তোকে কী বলব।
–দুসেরী রুই? কোথায় পেলি রে? কোথাও বাইরে থেকে ধরে এনেছিলি বুঝি?
বাইরে যাব কোন্ দুঃখে। এখানেই পেয়ে গেলুম।
বলিস কী! কোন পুকুরে?
–ঘোষেদের পোড়ো বাড়িটার ভেতর একটা ডোবা আছে, দেখেছিস? যেখানে কটা ঝুপসি গাছ রয়েছে?
–কেন দেখব না? কালও তো ওখানে একটা ঘুড়ি গিয়ে পড়েছি, ঢুকে নিয়ে এলুম।
–ওই ডোবা থেকেই মাছটা পেয়েছি।
–আঁ, ওই ডোবায়? গুল দেবার আর জায়গা পাসনি? ওতে মাছ? একটা গুগলিও তো আছে বলে মনে হয় না। ঢিল-পাটকেল ছুঁড়লে এক-আধটা ব্যাঙ-ট্যাং লাফিয়ে ওঠে, দেখেছি। ওখানে মাছ? চালিয়াতি করতে হলে অন্য কোথাও যা–আমার কাছে সুবিধে হবে না।
আহা-হা, আগেই খেপছিস কেন? আগে শোন-ই না ব্যাপারটা।
কী আবার শুনব? যা খুশি তাই বলবি আর সে কথা আমায় বিশ্বাস করতে হবে? থাম-থাম।
–আচ্ছা, থামছি। কিন্তু তুই নিজেই জানিসনে, কী হারাচ্ছিস।
বলে যা তবে। দেখি গুলবাজি কতটা চালাতে পারিস।
গুলবাজি? আচ্ছা, কান পেতে আগে শুনে যা সবটা।
বুঝলি, সাত আট দিন মাছ খাইনি, মেজাজটা একেবারে সপ্তমে চড়ে গেল। এমন কি বাড়ির বেড়ালটা পর্যন্ত এত খেপে গেল যে, খামকা সকাল বেলায় এসে আমার পায়ে খাক করে কামড়ে দিলে। তখন ভাবলুম, এসপার কি ওসপার। ওই ঘোষেদের ডোবাতেই গিয়ে ছিপ ফেলব, আর কিছু না পাই, ব্যাঙই ধরে আনব গোটাকতক। ফরাসীরা তো ব্যাঙ খায়, আর বেশ ভালোই খায় বলে শুনেছি।
ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর, চারদিক খাঁ খাঁ করছে। যাকে বলে ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঢ্যালা। সেই সময়েই ছিপ নিয়ে বেরুলুম। যাতে লোকে দেখতে না পায়, ঠাট্টা-ফাট্টা না করতে পারে।
গিয়ে দেখি, বৃষ্টির জলে ডোবাটা খানিক ভরেছে, নীলচে নীলচে শ্যাওলা ভাসছে তাতে, ব্যাঙাচি ল্যাজ-ট্যাজ নিয়ে সাঁতার কাটছে, মাঝে মাঝে কিসে যেন আবার ভুড়ভুড়ি কাটছে। জলটায় থেকে থেকে আবার কী যেন বিচ্ছিরি গন্ধ উঠছে! দেখেই মন ব্যাজার হয়ে গেল। মাছ তো মাছ-তার একটা আঁশ পর্যন্ত এতে পাওয়া যাবে না।
